চলতি মার্চ মাসের ২৮ দিনে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ৩৩৩ কোটি ২০ লাখ ডলার সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন। যা আগের সব রেকর্ড ভেঙেছে। এর আগে গত বছরের মার্চ মাসে প্রায় ৩৩০ কোটি ডলার এসেছিল। যা একই সময়ের তুলনায় ৩.৮ শতাংশ বেশি। চলতি মাসে প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের প্রবাহে ধারাবাহিক বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক সংকেত দিয়েছে। রবিবার (২৯ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান এ তথ্য জানান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী মার্চ মাসের শেষ চার দিনে (২৫–২৮ মার্চ) দেশে এসেছে ২৪০ মিলিয়ন ডলার, যা প্রমাণ করছে প্রবাসী কর্মীরা এখনো দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের জন্য প্রধান উৎস হিসেবে কার্যকর।
দীর্ঘ মেয়াদে দেখা যায়, চলতি অর্থবছর জুলাই ২০২৫ থেকে ২৮ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৫.৭৮ বিলিয়ন ডলার। এর বিপরীতে, গত অর্থবছর একই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছে ২১.৬৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে প্রবাসী অর্থপ্রেরণে ১৮.৮ শতাংশের প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বৃদ্ধি শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করছে না, দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও বিনিয়োগ ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ব্যাংকিং খাত, ভোক্তা খরচ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবাহ দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রবাসী কর্মীদের এই অবদান দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক বাণিজ্যকে দীর্ঘ মেয়াদে শক্তিশালী করবে।
সার্বিকভাবে বিদেশি সহায়তা কমে যাওয়া এবং বিনিয়োগে মন্থরতার মধ্যেও রপ্তানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক অর্থনীতিকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই ধারা অব্যাহত রাখতে হলে বিনিয়োগবান্ধব নীতি, অবকাঠামো উন্নয়ন ও আমদানি–রপ্তানির ভারসাম্য রক্ষা জরুরি। বর্তমানে জনশক্তি রফতানি কম হলেও রেমিট্যান্স বৃদ্ধির আরও কিছু কারণ আছে বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন বিশ্লেষকরা। তাঁরা বলেন, রেমিট্যান্স বাড়ানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশ কিছু অ্যাপস তৈরি করেছে। এসব অ্যাপসের মাধ্যমে টাকা আনতে ওইসব দেশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। ওইসব প্রতিষ্ঠান থেকে বাংলাদেশে বিকাশ বা নগদের মতো প্রতিষ্ঠানের ওয়ালেট ব্যবহার করে রেমিট্যান্স আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ফলে বিদেশে থাকা কর্মীরা ব্যাংকিং চ্যানেল ছাড়াও ওয়ালেটের মাধ্যমে সরাসরি অর্থ পাঠাতে পারছেন দেশে। এসব কারণে হুন্ডির দৌরাত্ম্য কমেছে, আর হুন্ডির দৌরাত্ম্য কমার কারণেও রেমিট্যান্স বেড়েছে। বিদেশি কর্মীরা এখন বৈধ চ্যানেলে বেশি অর্থ পাঠাচ্ছে। এ ছাড়া রেমিট্যান্স হাউসগুলোর অনিয়মও বন্ধ হয়েছে। যেহেতু আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের ভূমিকা অপরিসীম, তাই এ আয় যেন কখনো না কমে, বরং কীভাবে তা বাড়ানো যায় সেদিকে আমাদের দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে জনসংখ্যা রফতানি নিশ্চিত বিনিয়োগ হিসাবে বিবেচিত। শুধু নিশ্চিত বিনিয়োগ নয়, নিরাপদ বিনিয়োগ হিসাবেও জনসংখ্যা রফতানিকে বিবেচনা করা যায়। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে জনসংখ্যা রফতানির যেমন প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে, তেমনি বিদেশে কর্মরত জনশক্তির পারিশ্রমিক যাতে কাজ ও দক্ষতা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়, সেজন্যেও সরকারকে উদ্যোগী ভূমিকা রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, জনসংখ্যা রফতানি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সরকার যদি কূটনীতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করে, তাহলে জনসংখ্যা রফতানির সুফল ও রেমিট্যান্স প্রবাহ আমাদের অর্থনীতির ইতিবাচক খাতের সঙ্গে একই ধারায় প্রবাহিত হবে।
অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, এই মুহূর্তে খাত বিশেষে বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত পদক্ষেপ নেওয়ার সময় নেই। এখন সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের সময়। এখন শুধু রেমিট্যান্স আয়ের বিষয় না, এখন সামগ্রিক চলতি হিসাবের ভারসাম্যের হিসাবের বিষয়। সুতরাং শুধু বাংলাদেশ ব্যাংক না, এখানে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ– এদের মিলে সমন্বিতভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে। মুদ্রানীতি এবং আর্থিক নীতির সমন্বিত পদক্ষেপ দরকার। প্রবাসী আয় যেভাবে বৃদ্ধি পেলো, তার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে।








