প্রধান শিক্ষক বজলুল করিম চৌধুরী স্মরণে

মোস্তাফিজুর রহমান | বৃহস্পতিবার , ৮ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৫:২৯ পূর্বাহ্ণ

সাতকানিয়া উপজেলার সফল ও শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসাবে পরিচিত মোঃ বজলুল করিম চৌধুরী। সুফী সাধক অলিকুল শিরোমনি গৌঁছে জামান হযরত শাহ জাহাঙ্গীর (রঃ) এর পুণ্যময় স্থান সাতকানিয়া থানার মির্জাখীল গ্রাম। উক্ত গ্রামে ঐতিহ্যবাহী মির্জাখীল উচ্চ বিদ্যালয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় এলাকার তৎকালীন কতেক শিক্ষানুরাগী, সমাজ সেবক, দানশীল, মেধা ও মননশীল ব্যক্তিগণের সমন্বয়ে ১৯৬৪ সনে প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎকালীন সময়ে বিদ্যালয়টি মাটির দেওয়াল ছনের ছাউনি যুক্ত কুটির ঘরে আত্মপ্রকাশ হয়। বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা লাভ করার পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও শিক্ষার মান ও বিদ্যালয়ের পারিপার্শ্বিক অবস্থার উন্নয়ন তেমন কিছুই হয়নি। তৎপরবর্তীতে তৎকালীন মির্জাখীল উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি বিদ্যালয়ের জন্য একজন উচ্চ শিক্ষিত, দক্ষ, মেধা ও মননশীল প্রধান শিক্ষক নিয়োগের কথা চিন্তা করে যাচাই বাছাইপূর্বক মির্জাখীল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসাবে শ্রদ্ধেয় মোঃ বজলুল করিম চৌধুরীকে নিয়োগ প্রদান করেন। তখন থেকে মির্জাখীল উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও বিদ্যালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন তরান্বিত হতে থাকে। তৎকালীন চট্টগ্রাম জেলার চকরিয়া থানার উজনটিয়া গ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯৪৭সনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব ও শিক্ষা জীবন কাটে তাঁর নানার বাড়ি সাতকানিয়া থানার মির্জাখীল গ্রামের শফি চৌধুরীর বাড়িতে।তিনি সাতকানিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র ছিলেন এবং ৬ষ্ঠ শ্রেণি হতে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রত্যেক শ্রেণিতে ফার্স্ট বয় ছিলেন। তিনি কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১৯৬৪ সনে এস.এস.সি.পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। তৎপরবর্তীতে ইংরেজী সাহিত্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৩ সনে এম.. ডিগ্রী লাভ করার পর নাজিরহাট ডিগ্রী কলেজে ইংরেজী সাহিত্যের প্রভাষক হিসাবে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দান করেন। পরবর্তীতে মির্জাখীল গ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তিগণের অনুরোধে কলেজের অধ্যাপনা ছেড়ে তৎকালীন প্রত্যন্ত গ্রাম মিজাখীল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসাবে সমাসীন হন। তিনি ১৯৮২ সনে মির্জাখীল উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ হওয়ার পর কঠোর পরিশ্রমে কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড হতে ছাত্রছাত্রীদের জন্য এস.এস.সি. পরীক্ষার অনুমতি লাভ করেন। তৎপর বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের নিয়মানুবার্তিতা সহ শিক্ষার মান উন্নয়ন, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা, বিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পারিপার্শ্বিক উন্নয়ন, তাছাড়া মির্জাখীল উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যার পরিধি বৃদ্ধি পেলে তিনি বিভিন্ন অফিসে এবং বিশিষ্ট দানশীল ব্যক্তিগণের নিকট দেন দরবার করিয়া ত্যাগ ও পরিশ্রমের বিনিময়ে মির্জাখীল উচ্চ বিদ্যালয়কে মাটির গৃহ হইতে পর্যায়ক্রমে দুইটি পাকা দ্বিতল ভবন, বিজ্ঞানাগার নির্মাণ, ছাত্রীদের কমন রুম, শিক্ষকদের মিলনয়াতন, শিক্ষক, ছাত্রছাত্রীদের জন্য স্বাস্থ্য সম্মত পাকা শৌচাগার, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং এলাকার মানুষের সুবিধার্থে ঈদের নামাজ এবং জানাযার নামাজের সুব্যবস্থা তাহার দীর্ঘ ৩০ বৎসর শিক্ষকতার কর্মজীবনে তিনি নিজ হাতে সম্পন্ন করে যান। তাঁর কর্মময় জীবনে সর্বদায় নিমগ্ন থাকতেন কীভাবে বিদ্যালয়ের উন্নয়ন করা যায় এবং ছাত্র ছাত্রীদেরকে সুশিক্ষায় কীভাবে শিক্ষিত করা যায়। তিনি ছাত্র ছাত্রীদেরকে খুবই আপন ভেবে নিজের ছেলে মেয়ের মত জেনে পাঠদান করতেন। তিনি ছিলেন একজন উদার মনের হিতৈষী প্রধান শিক্ষক যার কারণে প্রতিবৎসর মির্জাখীল উচ্চ বিদ্যালয়ের এস.এস.সি. পরীক্ষায় পাসের হার ছিল সাতকানিয়া থানার মধ্যে সর্বোত্তম ও সর্বোচ্চ। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর তাঁর কর্মদক্ষতা ও যোগ্যতার কারণে দুদুবার এক্সটেনশনপূর্বক মির্জাখীল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসাবে সমাসীন রাখেন। তাছাড়া তিনি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি ছিলেন এবং দুদুবার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হন। তিনি মির্জাখীল উচ্চ বিদ্যালয় হতে নিয়মানুযায়ী সম্মান ও কৃতিত্বের সাথে ২০১১ সনে অবসরে যান। কিন্তু তিনি অবসরে যাওয়ার পরও মির্জাখীল উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী অভিভাবক স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির বিশেষ অনুরোধে শুধুমাত্র ইংরেজী বিষয়ে পাঠ দান করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক বেতনে তাঁকে বিদ্যালয়ের প্রবীণ প্রাণবন্ত শিক্ষক হিসাবে শিক্ষকতায় আবদ্ধ করে রাখেন যার জন্য তিনি মির্জাখীল উচ্চ বিদ্যালয়কে স্কুল এন্ড কলেজে পরিণত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়া যান। তিনি গত ২৫ শে বৈশাখ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ মৃত্যুবরণ করেন।

লেখক : এডভোকেট, জজ কোর্ট, চট্টগ্রাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচারুলতা
পরবর্তী নিবন্ধমহাকাশে বিষ্ময়কর মহাকাণ্ড