জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে চট্টগ্রাম বন্দরে অচলাবস্থার উপক্রম হওয়ায় দেশের অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ভয়াবহ সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জরুরি ও সরাসরি হস্তক্ষেপ চেয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে যৌথ আবেদন জানিয়েছে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো। গতকাল শনিবার প্রধান উপদেষ্টার কাছে পাঠানো চিঠিতে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ), বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) বলেছে, আপনার সুদৃঢ় নেতৃত্বে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে যে সাফল্য প্রদর্শন করেছে তা সর্বমহলে সমাদৃত। বিশেষ করে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আপনার অঙ্গীকার আজ বাস্তবায়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে। আগামী ৪ দিন পর অনুষ্ঠাতব্য এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে যে গণতান্ত্রিক উৎসবের আমেজ ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, আমরা তার প্রতি পূর্ণ একাত্মতা ঘোষণা করছি।
তবে অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি, যখন সমগ্র জাতি একটি ঐতিহাসিক নির্বাচনের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে, ঠিক তখনই দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরে একটি গভীর অচলাবস্থার উপক্রম হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ ঘোষিত লাগাতার ধর্মঘট ও বহির্নোঙরে কার্যক্রম বন্ধের ডাক আমাদের শিল্প ও বাণিজ্যে গভীর শঙ্কার সৃষ্টি করেছে।
চিঠিতে বলা হয়, আমরা বিশ্বাস করি, বন্দরে কর্মরত প্রতিটি শ্রমিক–কর্মচারী আমাদের অর্থনীতির অগ্রযাত্রার সম্মুখসারির সহযোদ্ধা। তাই নির্বাচনের এই গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে শিল্প, বাণিজ্য এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার বৃহত্তর স্বার্থে আন্দোলনকারী ও বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সকল পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সহযোগিতার ভিত্তি নির্মাণ করা এখন সময়ের দাবি।
বিগত সাত দিন ধরে আমরা ব্যবসায়ী সংগঠনসমূহ উদ্ভূত সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন সংলাপ ও সমন্বয় সভা করেছি, যাতে করে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম অক্ষুণ্ন রাখা সম্ভব হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আস্থার সংকটের কারণে এখন পর্যন্ত কোনো ফলপ্রসূ সমাধান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে আন্দোলনকারীরা বন্দরের বহির্নোঙরে বার্থিং ও পণ্য খালাস বন্ধের ঘোষণা দেয়ায় পুরো বন্দর অচল হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
চিঠিতে অচলাবস্থার ফলে সৃষ্ট সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির একটি চিত্রও প্রধান উপদেষ্টা বরাবরে তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, দেশের ৯৯ শতাংশ কন্টেনার এবং ৭৮ শতাংশ সমুদ্রপথের বাণিজ্য এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হলে তৈরি পোশাকসহ সকল প্রধান রপ্তানি খাত অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামালবাহী জাহাজ খালাস না হলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে, যা দ্রব্যমূল্যকে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ঠেলে দেবে। বন্দরে জাহাজজট ও কার্যক্রম স্থগিতের ফলে প্রতিদিন আমদানিকারকদের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ডেমারেজ চার্জ হিসেবে পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি বিশাল বোঝা।
এনসিটি ইজারা–সংক্রান্ত বিরোধটি বর্তমানে কর্মচারী ও বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে একটি সাংঘর্ষিক অবস্থানে পৌঁছেছে। বিশেষ করে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা ও তদন্তের উদ্যোগ পরিস্থিতিকে আরো জটিল ও উত্তপ্ত করে তুলেছে বলে চিঠিতে মন্তব্য করা হয়। এতে বলা হয়, জাতীয় নির্বাচনের ৪ দিন আগে দেশের সরবরাহ ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কোনো প্রকার ব্যাঘাত ঘটা আমাদের কারোর কাম্য নয়।
বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রধান উপদেষ্টার ব্যক্তিগত ও সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করে চিঠিতে বলা হয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে সকল পক্ষই আপনার বিজ্ঞ সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছে। একমাত্র আপনার বলিষ্ঠ দিকনির্দেশনাই পারে এই সংকটময় অচলাবস্থা নিরসন করে একটি সম্মানজনক ও স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে। আপনার সময়োপযোগী পদক্ষেপই বর্তমান স্থবিরতা কাটিয়ে দেশকে স্থিতিশীলতার পথে নিয়ে যাবে। জাতীয় নির্বাচনের আগমুহূর্তে চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত অচলাবস্থা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যৌথ এ আবেদনে স্বাক্ষর করেন বিইএফের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান, বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান, বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এবং বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল।












