প্রথম মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল : একটি যুগান্তকারী প্রকল্প হওয়ার সম্ভাবনা

| শুক্রবার , ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৫:৫৬ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) বাংলাদেশে বৈশ্বিক বাণিজ্য সংযোগ জোরদার ও শিল্পখাতে পণ্য সরবরাহের সময় কমাতে দেশের প্রথম মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল (এফটিজেড) স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রস্তাবিত এ মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় স্থাপন করা হবে। গত ২৭ জানুয়ারি দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, গত সোমবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে বেজার গভর্নিং বোর্ডের এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। সভা শেষে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের জানান, আনোয়ারায় প্রায় ৬০০ থেকে ৬৫০ একর জমির ওপর এই ফ্রি ট্রেড জোন গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখনো ফ্রি ট্রেড জোনের ধারণা কার্যকরভাবে নেই। প্রস্তাবিত এই অঞ্চলটি কাস্টমস বিধির ক্ষেত্রে একটি অফশোর টেরিটরির মতো কাজ করবে। সেখানে কোনো শুল্ক বাধ্যবাধকতা থাকবে না। পণ্য সংরক্ষণ, পুনঃরপ্তানি কিংবা উৎপাদন করা যাবে। ফ্রি ট্রেড বলতে আমরা মূলত একটি অফশোর টেরিটরিকে বুঝি। এখানে পণ্যের ওপর কোনো শুল্ক আরোপ হবে না। এফটিজেডের প্রধান কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে তিনি জানান, রপ্তানিমুখী শিল্পখাতে কাঁচামাল সরবরাহের সময় (টাইম টু মার্কেট) উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি করতে অর্ডারের পর অনেক সময় লাগে, যা দ্রুত ডেলিভারির অর্ডারের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, তুলার মতো কাঁচামাল এফটিজেডে সংরক্ষণ করা যাবে। যেহেতু এটি কাস্টমসের আওতার বাইরে থাকবে, তাই স্থানীয় শিল্পকারখানা প্রয়োজন অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে এসব কাঁচামাল ব্যবহার করতে পারবে। প্রয়োজনে ভিয়েতনামের মতো অন্য দেশেও পুনঃরপ্তানি করা যাবে। এতে বাজারে পণ্য পৌঁছাতে সময়জনিত জটিলতা অনেকটাই কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এই উদ্যোগের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক উদাহরণ হিসেবে দুবাইয়ের জেবেল আলী ফ্রি জোনের কথা উল্লেখ করে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, প্রায় ১৪ হাজার একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা জেবেল আলী ফ্রি জোন একাই প্রায় ১৯০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য পরিচালনা করে, যা বাংলাদেশের মোট বাণিজ্য পরিমাণের চেয়েও বেশি। দুবাইয়ের মোট জিডিপির প্রায় ৩৬ শতাংশ আসে এই অঞ্চল থেকে। বাংলাদেশও অফশোর বাণিজ্যভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরির মাধ্যমে এমন সাফল্য অর্জনের লক্ষ্য নিয়েছে। তবে নীতিগতভাবে অনুমোদন পেলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে। এছাড়া ফ্রি ট্রেড জোন বাস্তবায়নে বিদ্যমান আইন, বিধি ও নীতিমালায় সংশোধন প্রয়োজন হবে, যা পরবর্তী সরকার সময় নিয়ে বাস্তবায়ন করবে বলে জানান তিনি। চলতি বছরের মধ্যেই প্রাথমিক পর্যায়ের একটি মাইলফলক অর্জনের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

বর্তমানে বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দ্রুত কাঁচামাল আমদানি এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ অপরিহার্য। আনোয়ারার ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে এখানে কাস্টমস শুল্ক ছাড়াই পণ্য আমদানি, সংরক্ষণ এবং পুনঃরপ্তানির সুযোগ তৈরি করা হবে। এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে বেজা আইন ও কাস্টমস আইনসহ অন্তত আটটি আইন ও বিধিমালা সংশোধন করা হবে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি শক্তিশালী লজিস্টিকস ও ট্রেড হাবে পরিণত করার পথে বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন অনেকে।

ফ্রি ট্রেড জোন স্থাপনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। বিডা ও বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনের মতে, বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পণ্য উৎপাদনে দীর্ঘ সময় লাগা। এফটিজেড স্থাপনের ফলে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল (যেমন: তুলা বা ফেব্রিক) আগে থেকেই এই জোনে মজুদ রাখা যাবে। ফলে পোশাক কারখানার মালিকরা কয়েক সপ্তাহের পরিবর্তে মাত্র কয়েক দিনেই কাঁচামাল হাতে পাবেন। এতে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়বে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, পরিকল্পিত মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল সরাসরি ও পরোক্ষভাবে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করে। আনোয়ারার এই প্রকল্পে উৎপাদন, প্যাকেজিং, কার্গো হ্যান্ডলিং এবং লজিস্টিকস খাতে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। তাঁরা বলেন, বাংলাদেশের প্রথম ফ্রি ট্রেড জোন একটি যুগান্তকারী প্রকল্প হওয়ার সম্ভাবনা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়িতে কেবল পোশাক খাত নয়, বরং ইলেকট্রনিক্স, অটোমোবাইল এবং লজিস্টিকস খাতেরও সংযোজন ঘটবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে