প্রথম বাঙালি নারী কবি চন্দ্রাবতী ছিলেন একজন ষোড়শ শতাব্দীর কবি। কবি চন্দ্রাবতীর জন্ম ১৫৫০ সালে। তিনি ছিলেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কবি। কিশোরগঞ্জ শহর থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে ফুলেশ্বরী নদীর তীরে পাতুয়াইর গ্রামে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এই কবি ষোড়শ শতকের মনসামঙ্গল–এর কবি দ্বিজ বংশীদাস আর সুলোচনা দেবীর ঘরে জন্মেছিলেন। কবি চন্দ্রাবতীর সমকালীন অপর দুজন বাঙালি নারী কবি হলেন শ্রীচৈতন্যের কৃপাপাত্রী মাধবী আর চন্ডীদাসের সাধনসঙ্গিনী রামী বা রামতারা।
চন্দ্রাবতীর পিতামহের নাম ছিল যাদবানন্দ এবং পিতামহীর নাম ছিল অঞ্জনা ভট্টাচার্য্য। ধারণা করতে পারি, দারিদ্র্যের শুরু এঁদের সময় থেকে। তাদের বাঁশের পাল্লায় তালপাতার ছাউনী দেওয়া ঘরেতেই চন্দ্রাবতীর পিতা কবি দ্বিজ বংশীদাসের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। দ্বিজ বংশীদাসের পিতা–মাতা যাদবানন্দ– অঞ্জনা ঘট বসিয়ে মনসার নিত্য পূজা করতেন। চন্দ্রাবতীর অভিযোগ, এ কারণে রাগ করে লক্ষীদেবী তাঁদের ছেড়ে চলে যায়। যাপিত জীবনে দারিদ্র্যের ছোবলের কারণকে এভাবেই চন্দ্রাবতী রামায়নে প্রকাশ করেছেন। তিনি এখানে এও উল্লেখ করেন, মনসার বরে চন্দ্রাবতীর পিতা দ্বিজ বংশীদাস জন্মেছিলেন এবং ভাসান শিল্পী হিসেবে জগৎ–সংসারে নন্দিত হয়েছেন। কবি দ্বিজ বংশীদাস যখন দারিদ্র্যের কশাঘাতে নিষ্পেষিত, সে–সময় মা মনসা তাঁকে স্বপ্নে নির্দেশনা প্রদান করেন মনসার ভাসান গেয়ে অর্থ–উপার্জনের। পিতা কবি দ্বিজ বংশীদাস ভাসান গেয়ে যে দু–চার পয়সা আয় করতেন, তা দিয়েই চন্দ্রাবতীদের ভরণপোষণ চলত। বিকল্প কোনো রোজগারের ব্যবস্থা আর ছিল না। সে–ক্ষেত্রে চন্দ্রাবতীর কাব্য প্রতিভার বিকাশ পিতার সস্নেহ প্রশয়ে যে বিকশিত হয়, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
মধ্যযুগের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বাস্তবতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে সমাজপতিদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে কবি চন্দ্রাবতী বোধ করি প্রথম নারী, যিনি পেরেছিলেন নিম্নবর্গীয় মানুষের জীবনগাঁথা সাহিত্য সাধনার অন্তগর্ত করতে। সীতার জীবনের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে পেরেছিলেন নিজের অন্তর্গত দুঃখ–বেদনার আর কষ্টের তিলককেও। চন্দ্রাবতী রচিত রামায়ণ পালায় তাঁর দারিদ্র্যপীড়িত যাপিত জীবনকথা আর বংশ পরিচয় ক্ষাণিকটা প্রকাশ ঘটেছে।
চন্দ্রাবতী বিবাহ না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে তখন পিতার নির্দেশে লিখেছিলেন রামায়ণ। এটি কিশোরগঞ্জ ও পূর্ব ময়মনসিংহ অঞ্চলের ঘরে ঘরে আজও মায়েদের কণ্ঠে গীত হয়। এ ছিল এক ভিন্নধারার এক পালা। চন্দ্রাবতীর রামায়ণ পালার সঙ্গে কৃত্তিবাস ওঝার কিংবা বাল্মিকী রামায়ণের তুলনা করার সুযোগ নেই। চন্দ্রাবতী এখানে রাম–সীতার কাহিনীর ভেতর দিয়ে তাঁর সময়ের কৃষিনির্ভর গ্রামীণ বাংলার সুখ–দুঃখ–প্রেম–বিরহকেও বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরেছেন। সে–ক্ষেত্রে তিনি হয়ত এটার নাম রামায়ণ না রাখলেও পারতেন। সাত কান্ডের রামায়ণের ধারা থেকে বেরিয়ে এসে চন্দ্রাবতী লিখলেন তিন খন্ডের রামায়ণ। এখানে কিশোরগঞ্জ কিংবা বৃহত্ত্র ময়মনসিংহের আঞ্চলিক লোক–ভাষা বা উপভাষাকে প্রাধান্য দিয়ে প্রান্তিক মানুষের হৃদয়কে ছুঁয়ে যেতে চেয়েছিলেন। পৌরাণিক আতিশয্যকে পরিহার করে তখনকার সমাজ ব্যবস্থার আটপৌরে জীবনকথাকে নিজের ভাষা শৈলী ব্যবহার করে প্রকাশ করেছেন। ফলে পাঠকমাত্রেই এ গ্রন্থের পরতে পরতে চন্দ্রাবতীর জীবনকথা, এমনকী প্রাচীন বাংলার সমাজ জীবনের নানান প্রতিচ্ছবি দেখতে পান।
সমগ্র বিশ্বেই চন্দ্রাবতী এখন পরিচিত। পৃথিবীর একুশটি ভাষায় তাঁর কবিতা অনূদিত হয়ে গবেষণা হচ্ছে।
‘রামায়ণ’ ছাড়াও ‘মলুয়া’, ‘পদ্মপুরাণ’, ‘দস্যু কেনারামের পালা’সহ অপরাপর রচনাসমূহেও চন্দ্রাবতী তাঁর চারপাশের সমাজ ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছেন। ব্যক্ত করেছেন তাঁর এবং তাঁর চারপাশের প্রান্তিক ও নিম্নবর্গীয় মানুষের সুখদুঃখ, প্রতিবাদ আর বীরগাঁথা। এখানে তিনি তাঁর সমকালের লেখকদের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রগামী ছিলেন। চন্দ্রাবতী তাঁর কাব্যে সব–সময় নারীর শ্রেষ্ঠত্বকে প্রকাশ করেছেন। এই শ্রেষ্ঠত্বটুকু বিজয়ের মাধ্যমে নয়, পরাজয়ের মাধ্যমে। শর্তহীন আত্মসমর্পণ করেনি কোথাও। মধ্যযুগে এ ধরনের সাহসী ভূমিকা আর কেউ নিয়েছেন বলে জানা নেই। এছাড়াও জয়ানন্দকে বিবাহ করার ঘোষণা, পরবর্তীকালে কুমারী থাকার দৃঢ়তাও চন্দ্রাবতীর সাহসী পদক্ষেপের অন্যতম। কারণ সময়টা ছিল মধ্যযুগ।
চন্দ্রাবতী রামায়ণে সব ধরনের মান–অভিমান, অপ্রাপ্তি–অসংগতিকে নিয়তির নির্মম পরিহাস হিসেবে মেনে নিয়েছেন। অভিযুক্তদের কাঠগড়ায় দাঁড় করালেও চূড়ান্ত বিচারে কেমন জানি ক্ষমার একটা মনোভাব ফুটে ওঠে।
পিতা–পুত্রী একত্রে ১৫৭৫ সালে লিখলেন ‘মনসা ভাসান’। সে–সময় চন্দ্রাবতী ২৫ বছরের যুবতী। এই ভাসান আজও গ্রামবাংলায় প্রাচীন পুঁথি হিসেবে নন্দিত হচ্ছে। এছাড়াও চন্দ্রাবতী অজস্র লোকগীতি রচনা আজও নৌকার মাঝির কণ্ঠে, ব্রতে, বিয়ে এবং গ্রামীন জীবনের প্রতিদিনের গার্হস্থ্য জীবনে মায়েদের কণ্ঠে গীত হয়।
আমাদের সাহিত্য–সমালোচকরা চন্দ্রাবতীর গ্রামীণ পটভূমিতে রচিত রচনাবলীর বিচার–বিশ্লেষণ বিশেষভাবে করেননি। অল্প–বিস্তর যা হয়েছে, তাও পাঠক প্রিয়তা লাভ করেনি। আমরা অনেক বেশি জেনেছি চন্দ্রাবতীর প্রণয়োপখ্যান। কারণ এটাই বেশি প্রকাশিত হয়েছে নয়ান ঘোষ বিরচিত ‘জয়চন্দ্র ও চন্দ্রাবতী’র পালার মাধ্যমে, যাকিনা মৈমনসিংহ গীতিকায় প্রকাশিত। যদিও এখানে চন্দ্রাবতী প্রণীত ‘দস্যু কেনারামের পালা’,‘মলুয়া’ ইত্যাদি পালাও প্রকাশিত হয়েছে।
চন্দ্রাবতীর সাহিত্যচর্চার চাইতে তাঁর প্রণয়োপখ্যান বেশি প্রচারের কারণ চন্দ্রাবতী সুন্দরী ছিলেন। আখ্যানটি বিয়োগান্তর। তাঁর স্বপ্নের মানুষও তেমন ছিলেন। চন্দ্রাবতীর প্রণয়োপখ্যানের নায়কের নাম জয়ানন্দ। জয়ানন্দের বাড়ি করিমগঞ্জ উপজেলার সুন্ধা গ্রামে। চন্দ্রাবতীদের পাশের গ্রাম। জয়ানন্দ ছিল চন্দ্রাবতীর শৈশবের বন্ধ ও খেলার সাথী। প্রতিদিন ভোরে দুই বন্ধু মিলে পূজার ফুল তুলত। জয়ানন্দ ফুল গাছের ডাল নুঁইয়ে ধরত। আর চন্দ্রাবতী ফুল তুলত। ফুলেশ্বরী নদীর তীরে দু’জনে খেলাধুলা করত। চন্দ্রাবতী পিতার উৎসাহে কাব্য রচনায় মনোনিবেশ করলে, জয়ানন্দও তাতে উৎসাহী হয়ে কবিতা লেখা শুরু করেন। সে–সময় দু’জনকে উদ্দেশ্য করে কবিতা লিখেতেন, পাঠ করে শুনাতেনও। দুজনের এ বন্ধুত্ব বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রণয়ের দিকে মোড় নেয়। বিষয়টা পরিবারের মধ্যে বিশেষ করে চন্দ্রাতীর বাবা জানার পর বললেন, তিনি জয়ানন্দের সঙ্গে চন্দ্রাবতীর যথাসময়ে বিবাহের আয়োজন করবেন।
বিয়ের দিন–ক্ষণও ঠিক হয়। ততদিনে চন্দ্রাবতীর মতো ‘ধর্ম্মশীলা সংযমশীরা তপস্বিনী নারী… জয়চন্দ্রকে স্বামীরূপে হৃদয়ে গ্রহণ’ করে ফেলেন। এ–সময় জয়ানন্দের জীবনে চলে আসে আরেক নায়িকা। হ্যাঁ নায়িকাই তো। নায়িকার নাম আসমানি। এক কাজী সাহেবের মেয়ে। ধর্মান্তরিত হয় জয়ানন্দ। বিয়ে করে তাকে। আকাশ ভেঙ্গে পড়ল চন্দ্রাবতীর মাথার উপর। চরমভাবে মর্মাহত হলেন। বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেন চন্দ্রাবতী। পিতার নির্দেশে ফুলেশ্বরী নদীর তীরে শিব মন্দির প্রতিষ্ঠা করে শিবের উপাসক হলেন। একই সঙ্গে সাহিত্যচর্চা শুরু করেন।
এক সময় জয়ানন্দ নিজের ভুল বুঝতে পারে। ছুটে আসে চন্দ্রাবতীর কাছে। অভিমানী চন্দ্রাবতী গ্রহণ করলেন না জয়ানন্দকে। চন্দ্রাবতীর দর্শন লাভ করতে একদিন জয়ানন্দ ছুটে যায় ফুলেশ্বরী নদীর তীরে সেই শিব মন্দিরে। সে–সময় চন্দ্রাবতী পূজা করছিলেন। মন্দিরের দরজা ছিল বন্ধ। অনেক ডাকাডাকি করল। চন্দ্রাবতী মন্দিরের বন্ধ দরজা খুললেন না। নিরুপায় জয়ানন্দ চন্দ্রাবতীর প্রিয় ফুল সন্ধ্যামালতী রস নিঙ্গরে শিব মন্দিরের দরজার সামনে চার লাইনের একটি কবিতা লিখে– ‘শৈশব কালের সঙ্গী তুমি যৈবন কালের সাথী/ অপরাধ ক্ষমা করো তুমি চন্দ্রাবতী/ পাপিষ্ঠ জানিয়া মোরে না হৈলা সম্মত/ বিদায় মাগি চন্দ্রাবতী জনমের মতো।’ অতপর জয়ানন্দ ফুলেশ্বরী নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে।
পূজা শেষ করে এক সময় চন্দ্রাবতী মন্দিরের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে। বুঝতে পারেন জয়ানন্দ এসেছিল। জয়ানন্দের লেখা কবিতা পাঠ করলেন। অতপর ফুলেশ্বরী নদীতে গেল পানি আনতে। নদীর ধারে গিয়ে চন্দ্রাবতী জানতে পারল জয়ানন্দ আত্মহত্যা করেছে। চন্দ্রাবতী এবার চূড়ান্তভাবে ভেঙ্গে পড়েন। নিজেকে আর স্থির রাখতে পারলেন না। জয়ানন্দের মৃত্যু চন্দ্রাবতী খুব আঘাত পেলেন। ফুলেশ্বরী নদীতে ঝাঁপিয়ে তিনিও আত্মহত্যা করলেন। চন্দ্রাবতীর এই মৃত্যু নিয়ে ভিন্নমত আছে। কেউ বলেন, তাঁর স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ হয়েছে। আবার কারো মতে, শিবদর্শনের কিছুদিন পরে হৃদরোগে মৃত্যুবরণ করেন। আবার কেউ বলেন, জয়ানন্দের মৃত্যু সংবাদ শুনে চন্দ্রাবতী মন্দিরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেন। এরপর আর বের হননি। ওখানেই চন্দ্রাবতীর মৃত্যু হয়। সে সময়টা ছিল ১৬০০ সাল। চন্দ্রাবতী ৫০ বছর কাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন।
লেখক : কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার











