প্রথমবার সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হয়েছেন লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে। জাতীয় সংসদে অভিষেক–এর দিনেই স্থান পেলেন মন্ত্রিসভায়। তিনি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম–৫ (হাটহাজারী) আসন থেকে নির্বাচিত ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। নবগঠিত বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। এ যেন প্রথম নির্বাচনী জয়েই বড় দায়িত্ব পাওয়া। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে বিশ্বাস নিয়ে তার উপর আস্থা রেখেছেন সেই আস্থার সম্মান রাখতে সর্বোচ্চ দিয়ে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছেন মীর হেলাল।
একইসঙ্গে চট্টগ্রামের এ সন্তান চট্টগ্রামকে সত্যিকারের বাণিজ্যিক রাজধানী করাসহ এ অঞ্চলের উন্নয়নে ভূমিকা রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, আগামী ৫ বছরের মধ্যে চট্টগ্রাম সত্যিকারের বাণিজ্যিক রাজধানী হবে, এ জন্য যা যা করার তার সর্বোচ্চটুকু আন্তরিকতা দিয়ে করব। পাশাপাশি চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যা দূরীকরণ, যানজট নিরসন এবং এখানকার সড়কসহ অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়নে অবদান রাখার চেষ্টা থাকবে। একটি সমৃদ্ধ চট্টগ্রাম গড়ার জন্য আন্তরিকতার ঘাটতি থাকবে না।
গতকাল মঙ্গলবার প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার পর আজাদীর সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি। এসময় কোনো তদবির ছাড়া যোগ্যতার মাপকাঠিতে মন্ত্রিসভায় স্থান দেয়ায় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়েছেন মীর হেলাল।
তিনি বলেন, বিদেশে পড়ালেখা শেষ করে দেশে এসে সরাসরি রাজনীতিতে যোগ দিয়েছি। দীর্ঘ ১৭ বছর আন্দোলন–সংগ্রামে ছিলাম। চট্টগ্রামে বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী ও সুসংঘটিত করতে দায়িত্ব পালন করেছি। হাটহাজারী থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে এক লক্ষ ভোটের ব্যবধানে বিজয় পেয়েছি। এসব কিছুর মূল্যায়ন করে মন্ত্রিসভায় স্থান দিয়েছেন আমাদের চেয়ারম্যান। তাছাড়া তারেক রহমান তরুণদের আস্থায় রাখতে চান। এর পরিচায়ক হিসেবে আমাকে দায়িত্ব দেন।
‘পার্বত্য চট্টগ্রামের মত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। তিন পার্বত্য জেলাকে ঘিরে কী পরিকল্পনা রয়েছে?’ এমন প্রশ্নে মীর হেলাল বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি এবং বাঙালি দু’পক্ষই বসবাস করেন। সবাইকে সাথে নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে কীভাবে সমৃদ্ধ করা যায় সে চেষ্টা থাকবে। পার্বত্য জেলাকে আমরা ট্যুরিজম জোন হিসেবে গড়ে তোলতে পারি। এছাড়া এই পার্বত্য জেলার অন্যান্য সুবিধাগুলো কাজে লাগিয়েও সমৃদ্ধ করতে পারি।
সংসদ সদস্য হিসেবে অভিষেক এবং প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করে মীর হেলাল বলেন, গত ১৭ বছর আমরা অবিরাম অক্লান্তভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করেছি। আমাদের লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মী কারা নির্যাতিত হয়েছেন, হামলা–মামলার শিকার হয়েছেন এবং অনেকে শহীদ হয়েছেন। এই সবকিছুর বিনিময়ে এবং একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা সংসদ ভবনে পা রেখেছি, এটা অবশ্যই বাংলাদেশের ইতিহাসের জন্য একটি মাইলফলক। একইসঙ্গে আমাদের জন্য এটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূণ ঘটনা হিসেবে সারা জীবন থেকে যাবে।
মীর হেলাল বলেন, আজকে আমাদের সংসদ নেতা নির্বাচিত করার পর তারেক রহমান কতগুলো ত্যাগের বিনিময়ে এখানে এসেছি সেই কথা বলেছেন। আমরা যেন কোনো কারণেই সেই ত্যাগটাকে ইগনোর করে এমন কিছু না করি, যাতে জনগণ আমাদের উপর যে আস্থা রেখেছে সে আস্থা বিনষ্ট হয়। জাতীয়তাবাদী দলের প্রত্যেকটা সদস্য অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনা গ্রহণ করেছেন। উনি (তারেক রহমান) খুব আবেগঘনভাবে বলেছেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এই যুদ্ধে তিনি (তারেক রহমান) তার মা ও ভাইকে হারিয়েছেন। পরিবারের বাইরেও উনি হাজার হাজার ভাইকে হারিয়েছেন, এই শহীদদের অসম্মান হয় এমন কর্মকাণ্ডে যেন কেউ লিপ্ত না হয় সেজন্য উনার কড়া নির্দেশনা ছিল।
ইতিহাসের পুনরাভিত্তি : সময়ের হাত ধরে যেন পুনরাভিত্তি ঘটেছে ইতিহাসের। একসময় যে পরিবার থেকে একজন মন্ত্রিসভায় স্থান পান, আজ সেই পরিবারের সদস্য হিসেবে মীর হেলাল প্রথমবার সংসদে গিয়েই জায়গা করে নিলেন। মীর হেলালের বাবা বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনও ছিলেন (২০০১ সালের ১০ অক্টোবর থেকে ২০০৫ সালের ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়–এর প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে) বিএনপি সরকারের প্রতিমন্ত্রী। এ যেন বাবার পথ ধরেই এগিয়ে চলা মীর হেলালের। অবশ্য কেবল বাবার পরিচয়ের আবর্তে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি মীর হেলাল। বিদেশে উচ্চ শিক্ষা শেষে ছুটে আসেন দেশে। যোগ দেন বিএনপিতে। বর্তমানে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ–সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ)। বিএনপি চেয়ারপার্সনের বৈদেশিক সম্পর্ক উপদেষ্টা কমিটির বিশেষ সহকারী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। ব্যারিস্টার হেলাল বিএনপি মিডিয়া সেলেরও সদস্য। তিনি জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের পরিচালক এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত এবং পরিচালিত একটি সংগঠন, লিগ্যাল রিসার্চ সেলের আহ্বায়ক।
মীর হেলাল ২০০২ সালে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব উলভারহ্যাম্পটন থেকে এলএলবি (অনার্স) করেন। এরপর ২০০৩ সালে কলেজ অব ল অব ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস (ইউনিভার্সিটি অব ল) থেকে বার ভোকেশনাল কোর্স সম্পন্ন করেন এবং ২০০৪ সালে অনারেবল সোসাইটি অব লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টার অ্যাট ল হিসেবে স্বীকৃতি পান। আইন পেশায় যুক্ত মীর হেলাল বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের তালিকাভুক্ত আইনজীবী। তিনি ল ফার্ম ‘দ্য লয়ার্স কাউন্সিল’–এর হেড অব চেম্বার্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া যুক্তরাজ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যারিস্টার–অ্যাট–ল, লিংকন’স ইনের সোসাইটির সদস্য।












