প্রকল্পটি শিগগির একনেকে তোলার প্রস্তুতি

ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণ বর্তমানে ব্যয় নির্ধারণ ৪২ হাজার কোটি টাকা ৪০ শতাংশ দেবে বিপিসি, ৬০ শতাংশ সরকার চট্টগ্রামে আজ আসছেন এক সচিব ও বিপিসি চেয়ারম্যান

হাসান আকবর | শনিবার , ২৯ নভেম্বর, ২০২৫ at ৬:০৭ পূর্বাহ্ণ

দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণকাজে গতি এসেছে। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনেকবার সংশোধনের পর এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপিত হয়েছে। উপস্থাপিত প্রকল্প প্রস্তাবনা নিয়ে গেল সপ্তাহে দুদিন পরিকল্পনা কমিশনে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। প্রকল্পটি শিগগির একনেক বৈঠকে তোলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। একনেকে তোলার আগে আজ সকালে চট্টগ্রাম আসছেন পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের প্রধান, কমিশনের সদস্য (সিনিয়র সচিব) . মোহাম্মদ মোখলেস উর রহমান। তার সঙ্গে থাকছেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আমিন উল আহসান। তারা সরেজমিনে ইস্টার্ন রিফাইনারি এবং দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য নির্ধারিত স্থান পরিদর্শন করবেন। সরকারের এই উদ্যোগের ফলে প্রকল্প গ্রহণের প্রায় ১৫ বছর পর এটি নিয়ে আবার আশার সঞ্চার হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ১৯৬৮ সালে চালু হওয়া দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত একমাত্র রিফাইনারির উৎপাদন ক্ষমতা তিন গুণে উন্নীত করার প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছিল ২০১০ সালে। বছরে ৩০ লাখ টন জ্বালানি তেল পরিশোধনের ক্ষমতাসম্পন্ন ইস্টার্ন রিফাইনারি২ নামে নতুন একটি রিফাইনারি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পটির ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৩ হাজার কোটি টাকা। পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারির ২শ একর জায়গার এক পাশে ৭০ একর জায়গায় দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৫ বছর ধরে ঢিমেতালে চলা প্রকল্পটির ব্যয় ইতোমধ্যে দফায় দফায় বেড়েছে। বিপিসি নানাভাবে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করে সফল না হওয়ায় সরকারের কাছে একটি প্রস্তাবনা দিয়েছিল। এতে বিপিসি ৩০ শতাংশ অর্থ যোগান দেওয়া, বাকি ৭০ শতাংশ অর্থ সরকারের তহবিল থেকে ঋণ হিসেবে নেওয়ার প্রস্তাব দেয়। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাবটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে সরকার এতে অর্থায়নের সম্মতি জানিয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর এস আলম গ্রুপ প্রকল্পটিতে অর্থায়নের প্রস্তাব দেয়। তারা রিফাইনারির সক্ষমতা ৩০ লাখের পরিবর্তে ৫০ লাখ টনে উন্নীত করার প্রস্তাব দেয়। এস আলম গ্রুপের প্রস্তাব নিয়েও বেশ কিছুদিন তোড়জোড় চলে। পরে গণ অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর সেই প্রস্তাব বাতিল করে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার।

সূত্র বলেছে, ২০১০ সালে যখন প্রথম ইআরএল দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৩ হাজার কোটি টাকা। সংশোধনের পর এর সম্ভাব্য ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৯ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা। এরপর সংশোধিত হয়ে ব্যয় পৌঁছায় ২৩ হাজার কোটি টাকায়। তারপর আবারও সংশোধন করে বর্তমানে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। এই ব্যয়ের ৪০ শতাংশ দেবে বিপিসি এবং ৬০ শতাংশ দেবে সরকার। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবটি (ডিপিপি) ইতোমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। যেটি নিয়ে গেল সপ্তাহে দুদিন আলোচনার পর সরেজমিনে দেখতে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য মোহাম্মদ মোখলেস উর রহমান আজ শনিবার চট্টগ্রাম আসছেন। প্রকল্পটি শ্রীঘ্রই একনেকে উঠবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।

ইস্টার্ন রিফাইনারিতে বর্তমানে ১৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল পরিশোধন করে ১৭ ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন করা হয়। দেশে বর্তমানে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর বেশিরভাগ আমদানি করা হয় পরিশোধিত অবস্থায়। ক্রুড অয়েল থেকে রিফাইনড অয়েলের মূল্য চড়া। এতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। ক্রুড অয়েল আমদানি করে দেশে পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা রক্ষা পেত। কিন্তু ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন ক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব না হওয়ায় দেশে ক্রুড অয়েল আমদানি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। শত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রায় বাড়তি অর্থ ব্যয় করে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করতে হচ্ছে।

বিপিসির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, নতুন ইউনিটে পরিশোধন শুরু হলে ইআরএলের মোট পরিশোধন ক্ষমতা দাঁড়াবে বছরে ৪৫ লাখ টনে, যা দেশের ডিজেল, অকটেন, পেট্রল, জেট ফুয়েল, বিটুমিন এবং এলপিজি উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এনে দেবে। এতে দেশের অন্তত ৭০ শতাংশ চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বছরে ২০ থেকে ২৪ কোটি ডলার সাশ্রয় হবে। শুধু ডিজেল উৎপাদনে প্রতি ব্যারেলে ১০১১ ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় সম্ভব হবে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, পরিশোধিত অবস্থায় না এনে ক্রুড অয়েল এনে পরিশোধন করলে প্রতি লিটারে অন্তত ৮ টাকা সাশ্রয় হবে। যা দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমাবে। এছাড়া এ প্রকল্প জ্বালানি নিরাপত্তার বড় অবলম্বন হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধগুমাইবিলে ধান কাটা উৎসব
পরবর্তী নিবন্ধআজ জয়ের বিকল্প নেই বাংলাদেশের