পোড়া ভোজ্য তেল মানব স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এই পোড়া তেল খেলে ক্যান্সার ও হার্টের রোগে আক্রান্তের ঝুঁকি বেশি। বিশেষ করে অল্প বয়সে হার্টের বিভিন্ন রোগে আক্রান্তের ঝুঁকি রয়েছে। তাই পোড়া ভোজ্য তেল কোনোভাবেই রি-ইউজ (পুনঃব্যবহার) করা যাবে না। একবার ব্যবহার করা তেলও কোনোভাবেই দ্বিতীয়বার গরম করে ব্যবহার করা যাবে না।
‘ন্যাশনাল ইউজড কুকিং অয়েল কালেকশান মিশন ফর চট্টগ্রাম’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞরা এ তথ্য তুলে ধরেন। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে নগরীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও মানজার বাংলা প্রা. লি. নামে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল কাইয়ুম সরকার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য প্রফেসর ড. মো. আব্দুল আলীমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. অতিয়ার রহমান। প্যানেল ডিসকাশনে বক্তা ছিলেন চসিকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক মো. সাইফুল ইসলাম চৌধুরী, চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ, হিফ’স এগ্রো ফুড ইন্ডাস্ট্রিজের সিইও সৈয়দ মোহাম্মদ শোয়াইব হাসান, বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি- চট্টগ্রামের সভাপতি সালেহ সোলেমান প্রমুখ। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন মানজার বাংলা প্রা. লি. এর চিফ ফাইনান্স অফিসার গৌতম অভি বড়ুয়া।
প্রেজেন্টশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য প্রফেসর ড. মো. আব্দুল আলীম। তিনি বলেন, পোড়া ভোজ্য তেল পানিতে ফেললে পানি নষ্ট হয়ে যায়। মাটিতে ফেললে সে মাটিতে আর কোনো শস্য হবে না। এটিকে (পোড়া তেল) তাই ওয়াস্ট (বর্জ্য) হিসেবে বিবেচনা করে যথাযথ (বর্জ্য) ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। মানজার বাংলা একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান। তারা এই ওয়াস্ট (পোড়া তেল) সংগ্রহ করে একটি সুন্দর ব্যবস্থাপনায় নিয়ে যেতে চায়। তাদের এই প্রস্তাবে আমরা সাপোর্ট দিচ্ছি।
মাত্র ৩৫ শতাংশ ভোজ্য তেল বোতলজাত বা প্যাকেটজাত হিসেবে বাজারে বিক্রি হচ্ছে জানিয়ে ড. আব্দুল আলীম বলেন, বাকি ৬৫ শতাংশ খোলা তেল হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু বাজারে বিক্রি হওয়া খোলা ভোজ্য তেল খাওয়ার উপযোগী নয়। এগুলো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। আমরা দেশের ৮টি বিভাগ থেকেই খোলা তেল সংগ্রহ করে দেখেছি। সব খোলা তেলেই ভেজাল পাওয়া গেছে। তাছাড়া বোতলজাত তেলে ভিটামিন ‘এ’ ফর্টিফিকেশন ঠিকঠাক পাওয়া গেলেও খোলা তেলে সেটি পাওয়া যায়নি। তাই বাজারের খোলা তেলের কোনোটাই খাওয়ার উপযোগী না। মূলত ভিটামিন ‘এ’ এর জন্যই সয়াবিন তেল খাওয়া। সেখানে ওই ভিটামিন ‘এ’ যদি না-ই থাকে, তাহলে সেটা কেন খাবে?
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃক পরিচালিত এক গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, বাজারে খোলা ভোজ্য তেল সয়াবিন ও পাম তেল হিসেবে বিক্রি হয়। তবে সয়াবিন ও পাম তেল আলাদা নামে বিক্রি হলেও শুধু সয়াবিন বা শুধু পাম তেল হিসেবে কোনো তেল পাওয়া যায়নি। সবই ছিল সয়াবিন ও পাম তেলের মিশ্রণ।
ড. মো. আব্দুল আলীম বলেন, বোতলজাত সয়াবিন তেলের অবস্থা ভালো হলেও খোলা সয়াবিন ও পাম অয়েলের কোনোটাই খাঁটি নয়। নমুনা সংগ্রহের সময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাজারে পাম তেল পাওয়া যায়নি। ব্যবসায়ীরা সব তেলই সয়াবিন নামেই বিক্রি করছে।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনে চবির প্রাণ রসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. অতিয়ার রহমান বলেন, বাইরের (হোটেল-রেস্টুরেন্টের) খাবার খেয়ে এখন আমরা প্রতিনিয়ত রোগবালাই আমদানি করছি। বেশ কিছুদিন আগে আমরা চট্টগ্রামের ২৪টি দোকান থেকে মিষ্টি সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে দেখেছি। কোনোটাই মানসম্মত পাওয়া যায়নি। বছরের শুরুর দিকে যারা আম নিয়ে আসছে, তারা ভিন্নভাবে আম পাকায়। কলাও পাকায়। তাই সন্দেহ ছাড়া বাজার থেকে কোনো কিছুই খাওয়া যাচ্ছে না। এগুলোর মাধ্যমে কেবল নিজেদের না, পরের প্রজন্মেরও ক্ষতি হচ্ছে। পোড়া তেল শরীরে হাইড্রোজেন পার-অঙাইড তৈরি করে উল্লেখ করে অধ্যাপক ড. আতিয়ার বলেন, শরীরে আরো বিভিন্ন রাসায়নিক তৈরি করে। ‘নিরাপদ খাদ্য আইন- ২০১৮’ তে এই পোড়া তেলকে ‘টঙিক’ (বিষ) হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তাই এই পোড়া তেল যাতে কোনোভাবেই ফুড চেইনে প্রবেশ করতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
হোটেল-রেস্টুরেন্টে পোড়া তেল ব্যবহার প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, আমরা সবই জানি। কিন্তু মূল কথা হচ্ছে, বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? দেশকে রাতারাতি সুইডেন বা সুইজারল্যান্ড বানাতে চাইলে কিন্তু হবে না। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ঢাল-তলোয়ার বিহীন নিধিরাম সর্দার বলেও মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল কাইয়ুম সরকার বলেন, পোড়া ভোজ্য তেল রি-ইউজের জন্য কেউ সংরক্ষণ করলে আইনে ১-৩ বছরের জেল অথবা ৩-৬ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। দ্বিতীয়বার কেউ একই অপরাধ করলে ৩ বছরের জেল অথবা ১২ লাখ পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। দেশে মোট আমদানিকৃত তেলের মধ্যে ২২ লাখ টন খাওয়ার কাজে ব্যবহার হয়ে থাকে জানিয়ে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বলেন, আর ৬ লাখ টন ব্যবহার হয় শিল্প কারখানায়। খাওয়ার কাজে ব্যবহৃত ২২ লাখ টনের ১০ শতাংশ হিসেব করলেও দেশে প্রতি বছর ২ লাখ ২০ হাজার টন পোড়া তেল তৈরি হচ্ছে। মানব স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এই পোড়া তেল সংগ্রহ করে মানজার বাংলা অস্ট্রিয়াতে বিক্রি করে দিচ্ছে। যা পরবর্তীতে বায়ো-ফুয়েল বা বায়ো-ডিজেল এ রূপান্তর করা হচ্ছে। এটি ভালো উদ্যোগ। আমরা সাপোর্ট দিচ্ছি। পোড়া তেল পুনঃব্যবহারের শাস্তির বিষয়ে তিনি বলেন, প্রথমে আমরা সচেতনতা সৃষ্টিতে জোর দিচ্ছি এবং সংশ্লিষ্ট দোকান, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট মালিকদের সচেতন করার চেষ্টা করছি। তারা যাতে পোড়া তেল ব্যবহার না করে। মানুষকে যাতে পোড়া তেলে রান্না করে কিছু না খাওয়ায়। সর্বশেষ ধাপ হচ্ছে মোবাইল কোর্ট। সচেতন করার পরও কেউ যদি সেটা না মানে তখন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মোবাইল কোর্টের পথে যেতে হবে। তবে আমরা সচেতনতা সৃষ্টিতে গুরুত্ব দিচ্ছি।












