পেট্রোবাংলার রূপরেখায় ঘাটতির হিসাব

২০৩৫ সাল পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোয় গুরুত্ব বিশেষজ্ঞদের

হাসান আকবর | সোমবার , ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৬:৫৩ পূর্বাহ্ণ

দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতি ক্রমে বাড়ছে। ঘাটতি মেটাতে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর বিকল্প ব্যবস্থা থাকলেও সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা না থাকায় দেশের শিল্প, বাণিজ্য এবং আবাসিক খাতকে গ্যাস সংকটের মধ্যেই থাকতে হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। গ্যাস সেক্টরের নিয়ন্ত্রক সংস্থা পেট্রোবাংলার নিজস্ব যে পরিকল্পনা সেটি পর্যালোচনায় ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে। পেট্রোবাংলা ২০৩৫ সাল পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহের যে রূপরেখা তৈরি করেছে, তাতে প্রায় প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ঘাটতির হিসাব ধরা হয়েছে।

পেট্রোবাংলার দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছর দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ধরা হয়েছে ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ২৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে আসছে ১৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে ১০৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। এতে প্রতিদিন ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু বাস্তবে এলএনজি সরবরাহ গড়ে ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। কখনো কখনো যান্ত্রিক সমস্যার কারণে আরো কমে যাওয়ায় গ্যাসের প্রকৃত ঘাটতি অনেক বেশি।

পেট্রোবাংলার পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরবরাহ অপরিবর্তিত রেখে ২০২৫২৬ অর্থবছরে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৩৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং ২০২৬২৭ অর্থবছরে ৩৮৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট ধরা হয়েছে। ফলে ওই দুই বছরে ঘাটতি যথাক্রমে ৯২৫ ও ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছাবে। ঘাটতি কমাতে দেশীয় খনিগুলোতে অন্তত ১০০টি নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এই পরিকল্পনা ঠিকমতো বাস্তবায়ন করা গেলে ২০২৭ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে গ্যাসের উৎপাদন দৈনিক অন্তত ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট বেড়ে ১৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে পরিকল্পনা যদি বাস্তবায়িত না হয় বা আংশিক হয় তাহলে এই হিসেবও মিলবে না। ঘাটতি প্রকট হবে। ওই সময়ে এলএনজি সরবরাহ ১০৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে স্থির থাকবে বলে পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হলেও তা কতটুকু রক্ষা করা সম্ভব হবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে। ২০২৮২৯ সালে চাহিদা ধরা হয়েছে ৩৮৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট এবং পরের বছর ৩৯২৫ মিলিয়ন ঘনফুট। এতে ঘাটতি ৮৭৫ থেকে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে ওঠানামা করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। পেট্রোবাংলার পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ২০৩০৩১ সালের মধ্যে মহেশখালীতে নতুন একটি এলএনজি টার্মিনাল চালু হলে এলএনজি সরবরাহ দৈনিক আরো ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট বাড়বে। অর্থাৎ এলএনজি সরবরাহ দাঁড়াবে ১৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে। একই সময়ে দেশীয় কূপগুলোতে উৎপাদন ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট বাড়িয়ে ২০০০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। তখন গ্যাসের চাহিদা ধরা হয়েছে ৩৯৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি রয়ে যাবে।

তবে এলএনজি টার্মিনাল ও পাইপলাইন অবকাঠামো নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় সম্ভাব্য জরিপ, প্রকল্প প্রণয়ন ও অর্থায়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। মহেশখালী থেকে সমান্তরাল পাইপলাইন এবং ভোলাবরিশাল পাইপলাইন নির্মাণের কথা বলা হলেও বিষয়টি খুব সহজ নয় বলে সূত্রগুলো মন্তব্য করেছে।

পেট্রোবাংলার পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত দেশীয় গ্যাস ও এলএনজি সরবরাহ তেমন না বাড়লেও চাহিদা প্রতি বছর ২৫ মিলিয়ন ঘনফুট করে বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এতে প্রতিদিনের ঘাটতি ৫৫০ থেকে ৫৭৫ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে থাকতে পারে।

অপরদিকে অতীতে গ্যাস সরবরাহের বাস্তবতা বিবেচনায় না এনে একাধিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করায় সংকট আরো তীব্র হয়েছে বলে মন্তব্য করে সূত্রগুলো বলেছে, মেঘনাঘাটে ৪৫০ মেগাওয়াটের চারটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং খুলনায় ৮০০ মেগাওয়াটের একটি গ্যাসচালিত কেন্দ্র চালু হয়েছে। পাশাপাশি শিল্পখাতেও নতুন করে গ্যাসের চাহিদা তৈরি হয়েছে, যা পূরণে সরকার হিমশিম খাচ্ছে।

পেট্রোবাংলার শীর্ষস্থানীয় একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমান চাহিদাসরবরাহ পরিস্থিতিতে যে বিরাট পার্থক্য এবং গ্যাসের যে হাহাকার চলছে সামনে কয়েক বছর এর থেকে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি নিরাপত্তা এখন অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। গ্যাস উন্নয়ন তহবিল যথাযথভাবে ব্যবহার করে দেশীয় অনুসন্ধান জোরদার করা গেলেই কেবল পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। শুধু গ্যাসের ঘাটতি নয়, ব্যয়বহুল এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতায় শিল্প ও বিদ্যুৎখাতে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে উল্লেখ করে তারা বলেন, এই বাড়তি ব্যয়ের যোগান মূলত দেশের সাধারণ মানুষের উপরই পড়বে। জ্বালানি নিরাপত্তা এবং শিল্পোৎপাদনের বিষয়টি মাথায় রেখে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর সর্বাত্মক উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএনসিটি নিয়ে চুক্তির বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের কিছুই করার নেই
পরবর্তী নিবন্ধএকুশ বাঙালির প্রথম প্রতিরোধ