পৃথিবী কৃত্রিম আলোয় ভাসছে বিশ্ব

স্যাটেলাইট চিত্রে রাতের

| রবিবার , ১২ এপ্রিল, ২০২৬ at ১১:১৯ পূর্বাহ্ণ

রাতের পৃথিবী ক্রমেই আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। গত এক দশকে বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম আলোর ব্যবহার বেড়েছে। দ্রুত নগরায়ন ও প্রযুক্তির প্রসারের ফলে রাতের অন্ধকার ঘুঁচলেও তা পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থানের জন্য বড় এক উদ্বেগের বার্তা। স্যাটেলাইটের প্রতিদিনের পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা গেছে, কৃত্রিম আলোর ব্যবহারের ফলে বিশ্বজুড়ে রাতের উজ্জ্বলতা ক্রমাগত বাড়লেও অঞ্চলভেদে এতে বেশ পার্থক্য রয়েছে। যেমন, সাবসাহারান আফ্রিকা ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় আলোর উজ্জ্বলতা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। অন্যদিকে, জ্বালানি সাশ্রয় ও আলোক দূষণ নিয়ে উদ্বেগের কারণে ইউরোপের দেশগুলোতে রাতের আলোর উজ্জ্বলতা সচেতনভাবেই কমিয়ে আনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।

গবেষকরা নথিপত্র ঘেঁটে দেখেছেন, ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে রাতের আলো ১৬ শতাংশ বেড়েছে। ২০২২ সালের তথ্য বলছে, রাতের উজ্জ্বলতার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সব দেশের চেয়ে এগিয়ে। তালিকার পরবর্তী দেশগুলো হচ্ছে চীন, ভারত, কানাডা ও ব্রাজিল। গবেষণায় উঠে এসেছে, দ্রুত নগরায়ন, অবকাঠামোর বিস্তার ও গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংযোগ পৌঁছে দেওয়ার কারণেই রাতের এই উজ্জ্বলতা বাড়ছে। অন্যদিকে, আলোর উজ্জ্বলতা কমে যাওয়ার পেছনে দুটি ভিন্ন কারণ দেখা গেছে।

হঠাৎ করে আলো কমে যাওয়ার প্রধান কারণ ছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বিপর্যয় ও যুদ্ধবিগ্রহ। তবে যেখানে ধীরে ধীরে আলো কমেছে, সেখানে তা করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। সরকারি নীতিমালা, সাশ্রয়ী এলইডি বাতির ব্যবহার ও আলোক দূষণ কমানোর প্রচেষ্টার ফলেই এমনটি সম্ভব হয়েছে। গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার’এ। খবর বিডিনিউজের।

ইউনিভার্সিটি অফ কানেকটিকাট’ এর অধ্যাপক ও এ গবেষণার প্রধান লেখক ঝে ঝু বলেছেন, দশক ধরে আমাদের ধারণা ছিল, জনসংখ্যা ও অর্থনীতি বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাতের পৃথিবী কেবলই উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হচ্ছে। গবেষক ঝু বলেছেন, আমরা দেখেছি, রাতের পৃথিবীর উজ্জ্বলতার চিত্র আসলে পরিবর্তনশীল। পৃথিবীর আলোর পদচিহ্ন প্রতিনিয়ত কোথাও বাড়ছে, কোথাও কমছে, আবার কোথাও এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরে যাচ্ছে।

এ গবেষণায় মার্কিন সরকারের পৃথিবী পর্যবেক্ষণকারী এক স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ১০ লাখেরও বেশি প্রতিদিনের ছবি ব্যবহার করেছেন গবেষকরা, যা নাসার মাধ্যমে প্রক্রিয়া করা হয়েছে। এর আগের বৈশ্বিক বিভিন্ন গবেষণা বার্ষিক বা মাসিক সংগৃহীত ছবির ওপর ভিত্তি করে হয়েছিল।

সবচেয়ে নাটকীয় উজ্জ্বলতা দেখা গেছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে, বিশেষ করে সাবসাহারান আফ্রিকা ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায়। এ তালিকায় সবার শীর্ষে রয়েছে সোমালিয়া, বুরুন্ডি ও কম্বোডিয়া। এরপরই রয়েছে ঘানা, গিনি ও রোয়ান্ডার মতো বেশ কিছু আফ্রিকান দেশ।

অধ্যাপক ঝু বলেছেন, বিষয়টি কেবল নগরায়ণ নয়, বরং বিদ্যুৎ সুবিধার এক বড় বিস্তার। এসব সংখ্যা বড় এক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে পুরো একটি অঞ্চল ঘুটঘুটে অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে বৈশ্বিক বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কের অংশ হয়ে উঠছে। লেবানন, ইউক্রেন, ইয়েমেন ও আফগানিস্তানের মতো দেশগুলোতে রাতের আলোর ব্যাপক ঘাটতি দেখা গেছে। এসব দেশে যুদ্ধ ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ফলে আলো প্রায় নিভে এসেছে। একইভাবে হাইতি ও ভেনেজুয়েলাতেও আলোর উজ্জ্বলতা কমেছে। তবে সেখানে দীর্ঘায়িত অর্থনৈতিক সংকট ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তাই ছিল এর মূল কারণ। ইউরোপে রাতের আলোর উজ্জ্বলতা গড়ে চার শতাংশ কমেছে। এর প্রধান কারণ, প্রযুক্তির উন্নতি ও পরিবেশবান্ধব নীতিমালা। অধ্যাপক ঝু বলেছেন, পুরানো ও কম দক্ষ হাইপ্রেশার সোডিয়াম ল্যাম্পের বদলে নতুন প্রযুক্তির দিকনির্দেশক এলইডি বাতির ব্যাপক ব্যবহার এর অন্যতম কারণ। ফ্রান্সকে অন্ধকার আকাশ সংরক্ষণ ও জ্বালানি সাশ্রয় নীতিমালার ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন অধ্যাপক ঝু।

এদিকে গবেষণার ব্যাপ্তিজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রে রাতের আলোর উজ্জ্বলতা সব মিলিয়ে ছয় শতাংশ বেড়েছে। অধ্যাপক ঝু বলেছেন, ভৌগোলিকভাবে আমেরিকার দিকে তাকালে বিশ্বজুড়ে আলোর এ জটিল পরিবর্তনের একটি ছোট রূপের দেখা মেলে। দেশটির পশ্চিম উপকূলে আলোর উজ্জ্বলতা অনেক বেড়েছে, যা সেখানকার ক্রমাগত জনসংখ্যা ও শক্তিশালী প্রযুক্তি অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

উনিশ শতকের শুরুর দিকে শহরগুলোতে গ্যাসলাইটের মাধ্যমে বড় পরিসরে আলোকসজ্জার যাত্রা শুরু হয়। সেই শতাব্দীর শেষদিকে আসে বৈদ্যুতিক বাতি। আর এরপর থেকে আলোর ব্যবহার ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। বর্তমানে রাতের বেলা শহর ও জনপদগুলো এমনভাবে উজ্জ্বল হয়ে থাকে যে, আকাশে একসময় জ্বলে থাকা অসংখ্য তারা মানুষের চোখের আড়ালে চলে গেছে।

অধ্যাপক ঝু বলেছেন, আলোক দূষণের গভীর বাস্তুসংস্থানিক প্রভাব রয়েছে। এর ফলে রাতের বন্যপ্রাণীদের জীবনচক্র, প্রাণীদের মাইগ্রেশন বা অভিগমন ও মানুষের দেহের স্বাভাবিক জৈবিক ঘড়ি বা ঘুমের ছন্দ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর একটি দল যুদ্ধবিমান নিয়ে সৌদি আরবে
পরবর্তী নিবন্ধদেশে আবারও ভূমিকম্প অনুভূত, জানা গেল মাত্রা ও উৎপত্তিস্থল