পুলিশ-বিএনপি ব্যাপক সংঘর্ষ

কাজীর দেউড়ি থেকে নাসিমন ভবন এলাকা রণক্ষেত্র ।। পুলিশের মোটরসাইকেলে আগুন গাড়ি-দোকানপাট ভাঙচুর ।। ৮ পুলিশসহ আহত ৩৩, আটক ১৬, তিন মামলার প্রস্তুতি

আজাদী প্রতিবেদন | মঙ্গলবার , ১৭ জানুয়ারি, ২০২৩ at ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ

নগরের কাজীর দেউড়ি মোড়ে পুলিশ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। গতকাল বিকেল ৩টার দিকে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে পুলিশের ৮ জন সদস্য এবং বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের ২৫ নেতাকর্মী আহত হয়। আহত পাঁচ পুলিশ সদস্যকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে বিএনপির ১৬ নেতাকর্মীকে আটক করে পুলিশ। এ ঘটনায় ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করে ৩টি মামলা দায়ের প্রক্রিয়াধীন বলে গত রাত পৌনে ১২ টায় দৈনিক আজাদীকে জানায় কোতোয়ালী থানা পুলিশ।

সংঘর্ষ চলাকালে কাজীর দেউড়ি থেকে নাসিমন ভবন পর্যন্ত পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এসময় পুলিশ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। বিএনপি নেতাকর্মীরা পুলিশের একটি মোটরসাইকেলে আগুন দেয়। ভাঙচুর করে সিসিটিভি, পুলিশ সার্ভিস সেন্টার এবং আশপাশের বিভিন্ন দোকানপাট। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে লাঠিচার্জ, ফাঁকা গুলি ও টিয়ার গ্যাস ছুঁড়েছে পুলিশ। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কাজীর দেউড়ি থেকে আলমাস সিনেমা হল মোড়, এমএ আজিজ স্টেডিয়াম সংলগ্ন সড়কে বেশকিছু গাড়ি ভাংচুর করা হয়। সড়কের এক পাশ বন্ধ করে সমাবেশ চলার সময় অন্যপাশে দুই দিকের গাড়ি চলাচল করায় আগে থেকেই যানজট লেগেছিল। সংঘর্ষের সময় সড়কে আটকে থাকা গাড়িতেও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। বিএনপি কর্মীদের ভাংচুরের কবলে পড়েছে চিকিৎসক ও গণমাধ্যম কর্মীদের গাড়িও।

পাঁচলাইশ থানার ওসি (তদন্ত) সাদেকুর রহমান জানান, ঘটনায় আহত ট্রাফিক বিভাগের পুলিশ পরিদর্শক বিপ্লব বড়ুয়া, জলৎকার চাকমা, ওসমান গনি, অজয় চাকমা ও লিনা আকতারকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি জানান, বিপ্লব বড়ুয়ার মাথায় ইটের আঘাত লেগেছে। জানা গেছে, বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল পূর্ব ঘোষিত বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ ছিল নগর বিএনপির। নাসিমন ভবনস্থ দলীয় কার্যালয়ের সামনে নূর আহম্মদ সড়কে সমাবেশের আয়োজন করা হয়। ৩টার দিকে কাজীর দেউড়ি মোড় থেকে নগর যুবদলের একটি মিছিল সমাবেশের উদ্দেশে রাওয়ানা হয়। মোড় পার হয়ে সামান্য আসতেই খোয়াজা হোটেলের সামনে পুলিশি বাধার মুখে পড়ে মিছিলটি। সেখানে পুলিশের ব্যারিকেড ছিল। বাধা পেরিয়ে মিছিলের অগ্রভাগ চলে গেলেও পেছনে যারা ছিলেন তাদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয় পুলিশের। এর জের ধরেই সংঘর্ষ হয়।

যুবদলের মিছিল থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়নি বলে দাবি করেছেন নগর যুবদলের সভাপতি মোশারফ হোসেন দিপ্তি। দৈনিক আজাদীকে তিনি বলেন, কাজীর দেউড়ি থেকে জমায়েত হয়ে মিছিল নিয়ে আমরা সমাবেশের দিকে চলে যাচ্ছিলাম। খোয়াজা হোটেলের সামনে পুলিশ ব্যারিকেড দেয়। সেটা অতিক্রম করে আমরা চলে আসি এবং সমাবেশে বক্তব্যও দিই। আমরা চলে যাওয়ার পর বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে আসা নেতাকর্মী এবং সাধারণ লোকজনকেও বাধা দেয়। তখন তাদের উপর বিনা কারণে লাঠিচার্জ করে পুলিশ। তিনি বলেন, কাজীর দেউড়ি মোড় পার হলেই কিন্তু নূর আহমদ সড়কে সমাবেশস্থল। সেখানে গাড়িও চলছে না। তবু এ সামান্য পথে মিছিল নিয়ে যেতে সমস্যা কোথায়। যারা সমাবেশে যাচ্ছে তারা একসঙ্গে মিছিল নিয়েই তো যায়। মিছিল নিয়ে আসতে পারব না সেটা কিন্তু পুলিশ আগে বলেনি। মিটিংয়ের অনুমতি দিল তারপরও ঢুকতে বাধা দিবে কেন। এদিকে পুলিশের দাবি, কাজীর দেউড়ি মোড়ে একটি মিছিল আসার সময় পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোঁড়া হয়। এসময় সেখানে থাকা পুলিশ সদস্যরা শিশু পার্কের দিকে চলে যান। পরে পুলিশ ফাঁকা গুলি ও টিয়ার সেল নিক্ষেপ করে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অনুমতি ছিল বিএনপির। তবে তারা সমাবেশের নামে বিশৃঙ্খলা করেছে। গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেছে। পুলিশের ৭/৮ জন সদস্য আহত হয়েছে। কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল কবির দৈনিক আজাদীকে বলেন, ডা. শাহাদাত হোসেন ও আবুল হাশেম বক্করের নির্দেশে পূর্বপরিকল্পিতভাবে পুলিশের উপর হামলা করেছে। যখন মিছিল আসে তখন টিআই বিপ্লব বড়ুয়া তাদের যাওয়ার পথ করে দেয়। তখন আকস্মিকভাবে বিএনপি নেতাকর্মীরা প্রথমে সেখানে থাকা সিসি ক্যামেরা ভাঙচুর করে। এরপর বিপ্লব বড়ুয়ার উপর হামলা করে। ওসি বলেন, সামগ্রিক ঘটনায় তিনটা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। টিআই বিপ্লব বড়ুয়ার উপর হামলায় একটি, বিস্ফোরক আইনে একটি এবং সন্ত্রাস দমন আইনে অপর মামলা দায়ের হবে। ১৬ জনকে আটক করা হয়েছে বলেও জানান ওসি। এদিকে নির্দেশ দেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন নগর বিএনপির আহবায়ক ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি দৈনিক আজাদীকে বলেন, পুলিশ এমনটা বলবেই।

বাস্তবতা হচ্ছে তারা পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। আমরা অনুমতি নিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করছিলাম। হঠাৎ করে পুলিশ ব্যারিকেড দেয়। সমাবেশে বেশিরভাগ লোক আসে কাজীর দেউড়ির দিক থেকে। তাই ও পথে ব্যারিকেড দেয়ার উদ্দেশ্য পরিষ্কার। ব্যরিকেড না দিলে এ পরিস্থিতি হত না। তিনি বলেন, আমাদের মিছিলের অনুমতি ছিল। কিন্তু এক ঘণ্টা আগে হঠাৎ করে পুলিশ বলে, হেড কোয়ার্টার থেকে নাকি মিছিলের পারমিশন দেয়নি। এরপর শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করার জন্য আমি তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তখন তাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজে মনে হচ্ছিল, কিছু একটা করে মামলা দিবে। শেষ পর্যন্ত তাই হয়েছে।

এদিকে বিএনপির মিছিল থেকে বিভিন্ন যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ লোকজন। জাহাঙ্গীর আলম নামে এক শিশু চিকিৎসক দৈনিক আজাদীকে বলেন, আমি নিজে গাড়ি চালিয়ে এমএ আজিজ স্টেডিয়ামের দক্ষিণ গেইট হয়ে যাচ্ছিলাম লালখান বাজারের দিকে। এসময় কিছু এলোপাথাড়ি গাড়ি ভাঙচুর শুরু করে। আমার গাড়ির সামনে অপর একটি গাড়ি ও কয়েকটি সিএনজি অটোরিকশা ভাঙচুরের কবলে পড়লে আমি দ্রুত গাড়ি ঘুরিয়ে উল্টোপথে চলে আসি। এসময় তাদের ছোঁড়া ইটে গাড়ির গ্লাস ভেঙে যায়। জনগণের স্বার্থে সমাবেশ করার কথা বললেও তারা বিনা কারণে সাধারণ লোকজনের গাড়ি ভাঙচুর করেছে বলেও দাবি করেন ডা. জাহাঙ্গীর। ঢাকার একটি পত্রিকার চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান সাইদুল ইসলাম বলেন, অফিস যাওয়ার পথে আমাদের গাড়িতে ইটপাটকেল মারা হয়। গাড়ির সামনের ও পাশের গ্লাস ভেঙে গেছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরাতে বক্করের বাসায় অভিযান
পরবর্তী নিবন্ধপিএসসির প্রশ্ন ফাঁসে ১০ বছরের কারাদণ্ড