পাহাড় কেটে প্রথমে হয় ক্ষেতখামার, পরে ওঠে পাকা অবকাঠামো

কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না পাহাড়খেকোদের

আজাদী প্রতিবেদন | রবিবার , ৩১ আগস্ট, ২০২৫ at ১১:০০ পূর্বাহ্ণ

পাহাড় কাটা থামছে না। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় কাটা চলছে। কোথাও রাতের আঁধারে আবার কোথাও বা দিনের আলোতে নির্বিচারে চলছে পাহাড় সাবাড় কার্যক্রম। এক সময় ছুটিছাঁটার অপেক্ষা করা হলেও এখন আর কোন কিছুরই তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। পাহাড় কেটে নির্মিত হচ্ছে স্থাপনা, বাড়ি ঘর, দোকান। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানাভাবে তোড়জোড় চলে, পরিদর্শন করা হয়, মামলা হয়। জরিমানাও করা হয়। কিন্তু কোনকিছুতেই থামানো যাচ্ছে না পাহাড়খেকোদের। নগরীর বায়েজিদ, আকবর শাহ এবং খুলশী এলাকার পাহাড়গুলোতে কোদাল শাবলের হানা অব্যাহত রয়েছে।

সূত্র জানায়, নগরীতে পাহাড় কাটতে কাটতে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হচ্ছে। দিনের পর দিন পাহাড় সাবাড় করতে করতে নগরীর অধিকাংশ পাহাড়ই শেষ করে দেয়া হয়েছে। এক সময় নগরীতে দুই শতাধিক পাহাড় ছিল। কিন্তু কাটতে কাটতে এখন ৬০৭০টিতে নেমে এসেছে। এগুলোতেও নিয়মিত পড়ছে কোদাল। নগরীর অন্তত ১০টি এলাকায় পাহাড় কাটা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পাহাড় কাটা চলছে বায়েজিদ থানার চন্দ্রনগর কলাবাগান এলাকায়। এখানে সুযোগ বুঝে থেমে থেমে পাহাড় কাটা চলছে। নগরীর আকবর শাহ, পাহাড়তলী, বায়েজিদ, জঙ্গল সলিমপুর, জঙ্গল লতিফপুর, খুলশী, লালখান বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় কাটা চলছে। ফৌজদার হাটবায়েজিদ লিংক রোড ঘিরেও চলছে পাহাড় কাটার মহোৎসব। বিভিন্ন অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েও পাহাড় কাটা চলে। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ও দাপট বেড়ে যায় পাহাড়খেকোদের। প্রশাসন অন্যদিকে ব্যস্ত থাকলেই তারা রাতে দিনে পাহাড় কাটতে থাকে। জালালাবাদ, আরেফিন নগর, শান্তিনগর, চন্দ্রনগরসহ বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় কেটে প্রথমে ক্ষেতখামারের মতো করা হচ্ছে। পরবর্তীতে তোলা হচ্ছে পাকা অবকাঠামো। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে দফায় দফায় সতর্ক করা হলেও বিষয়টি তেমন একটা গুরুত্ব পাচ্ছে না। পাহাড় কাটার অভিযোগে পরিবেশ অধিদপ্তর অনেকগুলো মামলা করেছে, জরিমানা করেছে। কিন্তু পাহাড়খেকোদের কাছে এসব যেনো ছেলের হাতের মোয়া। তারা দোর্দণ্ড প্রতাপেই পাহাড় সাবাড় করছে। ভূমি মূল্য বেড়ে যাওয়ায় নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ি এলাকাগুলো থেকে ভূমিদস্যুদের চোখ সরানো যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করে সূত্র বলেছে, আইনের কঠোর প্রয়োগ না হলে পাহাড়খেকোদের দমানো যাবে না। একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, শুধুমাত্র একটি সিদ্ধান্ত কার্যকর করলেই একদিনেই পাহাড় কাটা বন্ধ হয়ে যাবে। তিনি বলেন, শহরের কোথায় কোথায় পাহাড় আছে তা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ জানে। তারা ওই পাহাড়ি জমিতে কোন ধরনের প্ল্যান পাশ করাবে না এবং পাহাড় কেটে যে ভূমি তৈরি করা হয়েছে তার বাজারমূল্যের তিনগুন জরিমানা করতে হবে। ওই ভূমিতে কোন ধরনের স্থাপনা করতে দেয়া হবে নাএমন একটি সিদ্ধান্ত কার্যকর করা গেলে কেউ আর পাহাড় কাটতে যাবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

শান্তিনগরের কাননি পাহাড় সাবাড় করা হচ্ছে অনেকদিন ধরে। পুরো পাহাড়টি চারদিকে কেটে ফেলা হয়েছে। পাহাড় কেটে বের করা ভূমিতে নির্মাণ করা হয়েছে পাকা অবকাঠামো। দিনের পর দিন পাহাড় কাটা এবং অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে।

পাহাড় কাটা রোধে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ প্রশাসনের আরো কঠোর এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের উপর জোর দিয়ে সূত্রগুলো বলেছে, বহুদিন ধরে নগরীতে পাহাড় সাবাড় করা হচ্ছে। ভূমিদস্যুদের দাপট এখনই ঠেকানো না গেলে চট্টগ্রাম শহরের পাহাড়গুলো গল্পে পরিণত হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা শহরে পাহাড় কাটার কথা স্বীকার করে বলেন, আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করেও পাহাড় কাটা পুরোপুরি রোধ করতে পারছি না। নানা কৌশলে তারা পাহাড় কাটছে। তিনি পাহাড় কাটা ঠেকাতে জেলা প্রশাসন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের সমন্বিত একটি ক্রাশ প্রোগ্রাম জরুরি হয়ে পড়েছে বলেও উল্লেখ করেন।

পাহাড় কাটা রোধে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) দীর্ঘদিন ধরে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টি করে চলেছে। বেলা চট্টগ্রামের সমন্বয়ক মনিরা পারভীন দিনকয়েক আগে দৈনিক আজাদীকে জানান, পাহাড় কাটা চলছেই। শহরের অধিকাংশ পাহাড়ই কেটে ফেলা হয়েছে। পাহাড় যারা কাটছে বা কাটাচ্ছে তাদের সবাইকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে সর্বনাশা এই দাপট বন্ধ করা কঠিন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবাংলাদেশের দাপুটে জয়
পরবর্তী নিবন্ধউৎসবে সরগরম চবি ক্যাম্পাস