পাহাড়ের কয়েক কিমি এলাকায় শুধু ছাই আর ছাই

চন্দনাইশে পাহাড়ে হঠাৎ আগুন লাগা কি পরিকল্পিত

মুহাম্মদ এরশাদ, চন্দনাইশ | বুধবার , ১৮ মার্চ, ২০২৬ at ৬:০৬ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের অধীন দোহাজারী রেঞ্জের আওতাধীন বিভিন্ন পাহাড়ে চলতি শুকনো মৌসুমে বেশ কয়েকবার আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পাহাড়ের বুক চিরে যাওয়া দিয়াকুলমাস্টারঘোনাচিরিংঘাটাধোপাছড়ি সড়কের দুই পাশে দুই সপ্তাহ আগেও সবুজের সমারোহ দেখা গেলেও বর্তমানে উক্ত সড়কের কয়েক কিলোমিটারজুড়ে শুধু ছাই আর ছাই। সড়কের দুই ধারে বেশ কিছু স্থানে আগুনে বিভিন্ন প্রজাতির বনজ ও ফলদ বাগানের গাছ পুড়ে গেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির কীটপতঙ্গ, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল পুড়ে গেছে। আগুন লাগার খবর পেয়ে বনবিভাগের লোকজন ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই বিস্তীর্ণ অংশ পুড়ে যায়। এভাবে প্রতি শুকনো মৌসুমে পাহাড়ে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটলেও বনবিভাগ কিংবা সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে প্রতিকারে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।

স্থানীয়ভাবে জানা যায়, প্রতি বছর শুকনো মৌসুমে পাহাড়ে হঠাৎ আগুন লাগে। এতে বিস্তীর্ণ পাহাড় পুড়ে অনেকটা ন্যাড়া পাহাড়ে পরিণত হয়। তেমনি চলতি মৌসুমেও কয়েকদিন আগে হঠাৎ করে দিয়াকুলমাস্টারঘোনাচিরিংঘাটাধোপাছড়ি সড়কের মাস্টারঘোনা অংশ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। চৈত্রবৈশাখ মাসের আগে পাহাড়ের মাঠিতে শুকনো পাতা ও শুকনো কাঠ পড়ে থাকায় একবার আগুন লাগলে তা পাহাড়ের পর পাহাড় গ্রাস করে নেয়। কিন্তু কী কারণে পাহাড়ে আগুন লাগে বনবিভাগ তা পরিষ্কার করে বলতে পারেনি।

গত সোমবার বিকালে সরেজমিনে দেখা যায়, মাস্টারঘোনা থেকে কয়েক কিলোমিটার অংশজুড়ে পুড়েছে পাহাড়। আগুনে পাহাড়ের বড় বড় বৃক্ষের তেমন ক্ষতি না হলেও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে বিস্তীর্ণ বনজ ও ফলদ বাগানের ছোট ছোট গাছের চারা, লতাপাতা। আগুনে পুড়ে ধ্বংস হচ্ছে পশুখাদ্য ও বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে অসংখ্য বন্যপ্রাণী, পাখি ও কীটপতঙ্গ। আগামীতে পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকাতে পাহাড়ে আগুন দেওয়া থেকে বিরত রাখতে স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা।

এনজিওকর্মী মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, পাহাড়পর্বতকে বলা হয় পৃথিবীর পেরেক। পাহাড়ে আগুন দিলে পরিবেশের কি কি ক্ষতি সাধিত হয় তা নিয়ে প্রচারপ্রচারণার মাধ্যমে স্থানীয়দের ধারণা দিতে হবে। অন্যথায় পাহাড়ে আগুন দেওয়ার ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। প্রতি মৌসুমে পাহাড়ে এভাবে আগুন দেওয়ার ঘটনা অব্যাহত থাকলে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় হবে।

স্থানীয়রা জানান, শুকনো এ সময়ে পাহাড়ে বিভিন্ন পাখি ও বন্যপ্রাণীরা বাসা বেঁধে ডিম দেয় ও বাচ্চা প্রসব করে। আগুনে এসব পাখি ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল পুড়ে যায়। পাহাড়ে প্রতিনিয়ত আগুন লাগায় পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে।

জানা যায়, স্থানীয় কতিপয় ব্যক্তি জঙ্গল পরিষ্কার করার জন্য কৌশলে পরিকল্পিতভাবে আগুন দিয়ে শুকনো লতাপাতাগুলো পুড়িয়ে ফেলে। এতে আগুনের লেলিহান শিখা পাহাড়ের চর্তুদিকে ছড়িয়ে পড়ে পাহাড়ের বিশাল অংশ পুড়ে যায়। আবার স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বয়ং বনবিভাগও মাঝেমধ্যে বন পরিষ্কারের জন্য গোপনে আগুন ধরিয়ে দেয়।

বনবিভাগ দোহাজারী রেঞ্জের রেঞ্জার মনোয়ার ইসলাম বলেন, শুকনো মৌসুমে বিস্তীর্ণ পাহাড়জুড়ে শুকনো লতাপাতা ও শুকনো কাঠ পড়ে থাকে। চলতি মৌসুমে দোহাজারী রেঞ্জের অধীন বনাঞ্চলে বেশ কয়েকবার আগুন লেগেছে। আমি নিজেও ১০ থেকে ১২ বার ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণ করেছি। এ সময় পাহাড়ে কীভাবে আগুন লাগে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পাহাড়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসে। এর মধ্যে রয়েছে কাঠুরিয়া, পর্যটক ও সাধারণ মানুষ। কেউ আসে পাহাড়ি শণ কাটতে, কেউ আসে লাকড়ি আহরণ করতে। আবার কেউ কেউ আসে ঘুরতে। এদের মধ্যে আবার অনেকে ধূমপায়ী। হয়তো বিড়িসিগারেট ধরাতে গিয়ে আগুনসহ দিয়াশলাইয়ের কাঠি শুকনো পাতায় ফেলে দেয় অথবা ছুড়ে ফেলা বিড়িসিগারেটের আগুন থেকে শুকনো লতাপাতায় আগুন ধরে যায়। নিজেরা আগুন লাগিয়ে দিয়ে বন পরিষ্কারের বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকৌতুক কণিকা
পরবর্তী নিবন্ধসিলেটের ডাকাতদল রাউজানে ডাকাতি করতে এসে ধরা