বিজু এবং বৈসু উৎসবের রঙে সেজেছে পার্বত্য জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি। গতকাল বৃহস্পতিবার রাঙামাটিতে চাকমা ও মারমা সমপ্রদায়ের বর্ণিল র্যালি, নৃত্য এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, আর খাগড়াছড়িতে ত্রিপুরা সমপ্রদায়ের আয়োজনে বর্ণিল শোভাযাত্রা ও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বছরের বরণ। পাহাড়ের ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে এসব উৎসবে অংশ নিয়েছে বিভিন্ন বয়সী মানুষ, যেখানে মুখে মুখে সুরের ছোঁয়া, রঙের ঝলক এবং ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সাজানো মানুষ যেন নতুন বছরকে এক আনন্দময় আগমনের বার্তা দিচ্ছে।
রাঙামাটি প্রতিনিধি জানান, পাহাড়ি জেলা রাঙামাটিতে বিজু, সাংগ্রাইং, বৈসু, বিষু, চাংক্রান, চাংলান, পাতা, বিহু–২০২৬ উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র্যালি অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল সকালে রাঙামাটি পৌরসভা প্রাঙ্গণে বেলুন উড়িয়ে র্যালি ও আলোচনা সভার উদ্বোধন করেন রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার।
অনুষ্ঠানে উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সভাপতি প্রকৃতি রঞ্জন চাকমার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সহসভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদার। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত উপসচিব কৃষ্ণ চন্দ্র চাকমাসহ অন্যরা।
ঊষাতন তালুকদার তার বক্তব্যে বলেন, বিজু আমাদের অস্তিত্বের উৎসব। এটি আমাদের জীবন ও সংস্কৃতির অংশ, যা রাষ্ট্রের তরফে ক্ষুদ্র নৃ–গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদেরই। তিনি আরও বলেন, বিজু মানে অস্তিত্ব, বিজু মানে আমাদের জীবন ও সংস্কৃতি। আমরা এখন এই ঐতিহ্য সংস্কৃতিগুলো হারিয়ে ফেলছি। রাষ্ট্রের তরফ থেকে আমাদের বলা হচ্ছে ক্ষুদ্র নৃ–গোষ্ঠী। আবার অনেকে বৈসাবি বলছে, যাতে করে আমরা বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু ভুলে যাই। তাই এই সংস্কৃতিকে আমাদের ধরে রাখতে হবে। বর্তমান সরকারের কাছ থেকে পার্বত্য অঞ্চলের সংকট সমাধানে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর চাকমা, মারমাসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর শিল্পীদের নৃত্য পরিবেশিত হয়। শেষে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী পোশাকে রাঙামাটি পৌরসভা চত্বর থেকে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি শুরু হয়ে জেলা শিল্পকলা একাডেমির সামনে গিয়ে শেষ হয়।
আগামী ১২–১৪ এপ্রিল শুরু হবে পাহাড়ের বর্ষবরণের মূল আনুষ্ঠানিকতা। ১২ এপ্রিল চাকমাদের ফুল বিজু, ত্রিপুরাদের হারি বৈসু; এদিন গঙ্গা দেবীর উদ্দেশ্যে নদীর পাড়ে ফুল নিবেদন করবেন স্ব–স্ব নৃ–গোষ্ঠীর মানুষ। ১৩ এপ্রিল চাকমা বিজু আর ত্রিপুরাদের বৈসু মা; এদিন চলবে ঘরে ঘরে পাজনের আতিথেয়তা। ১৪ এপ্রিল নতুন বছর, এদিন চাকমাদের গোজ্যেপোজ্যে দিন আর ত্রিপুরাদের বিসিকাতাল। সব শেষে অনুষ্ঠিত হবে মারমাদের সাংগ্রাই জল উৎসব।
খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানান, খাগড়াছড়িতে নানা আয়োজনে পুরাতন বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করছে ত্রিপুরা সমপ্রদায়। এ উপলক্ষে ত্রিপুরা সমপ্রদায় আয়োজন করেছে বর্ণিল বৈসু শোভাযাত্রা। গতকাল সকালে খাগড়াছড়ি জেলা টাউনহলে ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও ত্রিপুরাদের নিজস্ব গরিয়া নৃত্য পরিবেশন করেন শিল্পীরা।
পরে বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদ ও বৈসু উদযাপন কমিটির উদ্যোগে টাউন হল প্রাঙ্গণ থেকে একটি বর্ণিল শোভাযাত্রা বের হয়। এতে ত্রিপুরা সমপ্রদায়ের তরুণ–তরুণীসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ ঐতিহ্যবাহী রিনা–রিসা ও গহনা পরে ঢোল–বাঁশি বাজিয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ মাঠে গিয়ে শেষ হয়।
শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া চেলসি ত্রিপুরা ও সুরভী ত্রিপুরা বলেন, আজ বছর ঘুরে আবারো বৈসুর শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আমরা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে শোভাযাত্রায় অংশ নিতে এসেছি। নতুন বছর আমাদের জন্য আরো সুখ–সমৃদ্ধি বয়ে আনুক এটাই প্রার্থনা।
শোভাযাত্রার আগে বৈসুর অনুষ্ঠানমালা উদ্বোধন করেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা। ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদের সভাপতি কমল বিকাশ ত্রিপুরার সভাপতিত্বে এতে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান, জেলা পরিষদ সদস্য জয়া ত্রিপুরা, বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক প্রভাংশু ত্রিপুরা, খাগড়াছড়ি প্রেসক্লাবের সভাপতি তরুণ কুমার ভট্টাচার্য ও সাধারণ সম্পাদক এইচএম প্রফুল্ল প্রমুখ।
বৈসু উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব ধনেশ্বর ত্রিপুরা বলেন, সংস্কৃতির মাধ্যমে ঐক্যের বন্ধন রচিত হওয়ার পাশাপাশি পাহাড়ে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সমপ্রীতির বন্ধন আরো সুদৃঢ় হবে। ত্রিপুরাদের হাজার বছরের নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা, সংগীত ও নৃত্যসহ হারানো সংস্কৃতিকে তুলে ধরার জন্যই এই আয়োজন।
বৈসু উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদের সাধারণ সম্পাদক শুভ্রদেব ত্রিপুরা জানান, ত্রিপুরাদের বর্ষবরণের মূল আয়োজন শুরু হবে আগামী ১২ এপ্রিল, যা চলবে তিন দিন। পুরনো বছরের শেষ দুই দিন উদযাপন করা হবে হারি বৈসু ও বৈসুমা; আর নতুন বছরের প্রথম দিন উদযাপন করা হবে বিচি কাতাল। মূলত ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি ধরে রাখার জন্যই এই শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে।














