বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের দীর্ঘ ইতিহাসে রাজেন তরফদার পরিচালিত ‘পালঙ্ক’ শ্রেষ্ঠ একটা নির্মাণ। কিন্তু চলচ্চিত্রটি তার আশানুরূপ প্রদর্শন ও আলোচনা থেকে অনেকটাই বঞ্চিত। নির্মাণকালীন সময়ে (১৯৭৩–৭৪) ছবিটি নিয়ে প্রচুর প্রতিবেদন ছাপা হতো বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায়। নির্মাতা রাজেন তরফদারও যথেষ্ট সমাদৃত হয়েছিলেন। বাংলাদেশের সুস্থধারার চলচ্চিত্রাঙ্গনের কর্মীরা প্রত্যক্ষে পরোক্ষ সংযুক্ত হয়েছিলেন এ ছবির নির্মাণের সঙ্গে, তিতাস একটি নদীর নামের নির্মাণের সঙ্গেও যেভাবে যুক্ত হয়েছিলেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ মুহম্মদ খসরুও সহকারী পরিচালক হিসেবে এ ছবির নির্মাণে সংযুক্ত হয়েছিলেন। ছবিটি ছিল বাংলাদেশ ভারত যৌথ প্রযোজনার। দুই দেশের প্রথিতযশা শিল্পী কলাকুশলীদের অনেকেই এ ছবির নির্মাণদলে ছিলেন। তবে অভিনয় শিল্পীদের মধ্যে উৎপল দত্ত ও সন্ধ্যা রায় ব্যতীত বাকি সবাই ছিলেন বাংলাদেশের। মুখ্য তিন চরিত্রের অভিনয়ে ছিলেন উৎপল দত্ত, আনোয়ার হোসেন এবং সন্ধ্যা রায়।
স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই নির্মিত হয়েছিল ঋত্বিক কুমার ঘটকের তিতাস একটি নদীর নাম ও রাজেন তরফদারের পালঙ্ক। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পে একটি নবজাগরণের সূচনা হয়েছিল সময়টাতে। আশা জাগানিয়া দিনগুলিতে আলমগীর কবির নির্মাণ করেছিলেন ধীরে বহে মেঘনা, সূর্যকন্যা কবির আনোয়ার–শ্লোগান, সুত্রভাত; সুভাষ দত্ত অরুনোদয়ের অগ্নিসাক্ষী এবং ১৯৭২ এ ববিতা গিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়ের অশনি সংকেতে অভিনয় করতে। একটা বৈপ্লবিক সুত্রপাত ঘটেছিল বাংলাদেশের সিনেমা জগতে। অবশ্য সময়টা ছিল রাজনৈতিকভাবে চরম এক সন্ধিক্ষণের। পালঙ্ক মুক্তি পেল দেরিতে।
পালঙ্ক মুক্তি পেল ১৯৭৬ সালের ২২ অক্টোবর। তখন বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা বিরাট এক ঝড়ের পর স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। তবে ছবিটি আশানুরূপ সাড়া জাগাতে সক্ষম হলো না সাধারণভাবে। নরেন্দ্রনাথ মিত্রের একই নামের ছোটগল্প, যেটি বাংলা সাহিত্যের সেরা গল্পগুলির অন্যতম বলে বিবেচিত, একটি পালঙ্ক বা খাটকে ঘিরের আবর্তিত হয়েছে ১৯৭৪ এর দেশভাগজনিত সৃষ্ট সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাম্প্রদায়িক ইত্যাকার নানাবিধ টানাপোড়েনের চিত্র যা বাস্তবভাবে রূপায়িত হয়েছে রাজেন তরফদারের কুশলী পরিচালনায়। পালঙ্ক বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা একটি কীর্তি। ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট কৃত সেরা বাংলা চলচ্চিত্রের তালিকায় এই ছবিটিও ধ্রুপদী চলচ্চিত্রের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত।

উভয় বঙ্গের যৌথ প্রযোজনায় (আনিস ফিল্মস, ঢাকা, বাংলাদেশ ও ডি.এস.পিকচার্স, কলকাতা, ভারত) নির্মিত পালঙ্ক কলকাতায় আগে মুক্তি পায় ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর। ছবিটি সেখানে অত্যন্ত সমাদৃত হয়। সে বছরের দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে ভারতের জাতীয় পুরস্কার রজত কমল অর্জন করে পালঙ্ক। বাংলাদেশে বাচসাস (বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি) পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ তিনটি বিভাগে পুরস্কৃত হয়। কিন্তু এরপর দু’দেশেই ছবিটি নিয়ে আলোচনা ও প্রদর্শন কোনোটাই আর তেমন পরিলক্ষিত হয়নি। তবে বাংলাদেশের সুস্থ ধারার চলচ্চিত্রকর্মীদের মধ্যে পালঙ্ক যথেষ্ট সমাদৃত হয়। মুহম্মদ খসরু সম্পাদিত কিংবদন্তী চলচ্চিত্র পত্রিকা ‘ধ্রুপদী’ পালঙ্ক ছবিটি নিয়ে বিশেষ একটি ক্রোড়পত্র এবং ছবির পরিচালক রাজেন তরফদারের অসাধারণ একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছিল, যা বাংলা চলচ্চিত্র সাহিত্যের একটি স্মরণীয় অধ্যায়।
কাকতালীয়ভাবে পালঙ্ক চলচ্চিত্রের প্রধান কুশলীবদের সকলেই বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী। দেশভাগ জনিত কারণে আজ ভিনদেশী নাগরিক, যা এ ছবির উপজীব্যও বটে। গল্পকার নরেন্দ্রনাথ মিত্রের জন্ম ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায়, পরিচালক রাজেন তরফদারের জন্ম রাজশাহীতে, মুখ্য তিন অভিনয়শিল্পীর মধ্যে উৎপল দত্তের জন্ম বরিশালে,সন্ধ্যা রায়ের কুষ্টিয়ায় এবং আনোয়ার হোসেনের জামালপুরে। এছাড়া অন্য সকল অভিনয় শিল্পীই বাংলাদেশের। তবে নেপথ্য কলাকুশলীরা ছিলেন কলকাতার। রাজনৈতিক কারণে ভিনদেশি পরিচালক রাজেন তরফদার তাঁর জন্মভূমিতে ছবিটি করতে এসেছিলেন শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের উদ্দেশ্যে। যা তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন। একই ঘটনা ঘটেছিল ঋত্বিককুমার ঘটকের ক্ষেত্রে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ নির্মাণের মধ্য দিয়ে। তবে তিতাস ও পালঙ্ক দেখলেই বোঝা যায় পূর্ববাংলার জলহাওয়া আর মানুষ ছাড়া এই দুটি ছবি নির্মাণ সম্ভবপর নয়। দুটি ছবির নদীমাতৃকতা এবং গ্রামীণ পারিপার্শ্বিকতা বাংলাদেশ ছাড়া আর কোথাও যাওয়া যাবে না। তাছাড়া পালঙ্ক ও তিতাস বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন ও পরিবেশের পরিপ্রেক্ষিতে রচিত গল্প ও উপন্যাস। এক কথায় বললে, দুটি ছবিই একান্ত বাংলাদেশের।
পালঙ্ক–শক্তিমান কথাশিল্পী নরেন্দ্রনাথ মিত্রের গল্প অবলম্বনে তৈরি। বাংলাসাহিত্যে তিনি ভিন্ন আঙ্গিকের গল্পকার হিসেবে স্বীকৃত। নরেন্দ্রনাথের গল্পগুলোর সম্পূর্ণ আলাদা বিশেষত্ব রয়েছে। অজৈবিক কোনো বস্তুর সঙ্গে মানুষের মানবিক সম্পর্কের কথা থাকে তাঁর লেখা অনেক গল্পে। অজৈবিক বা নিরেট কোনো উপকরণ বা বিষয়কে মানব জীবনের বিবিধ ইন্দ্রিয়ের প্রতীক হিসেবে অবলম্বন করে নরেন্দ্রনাথ মানবিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং সূক্ষ্মতম অনুভূতিকে মর্মস্পর্শী ভাবে উপস্থাপন করতেন তাঁর গল্পে। যেমন: রস, চেয়ার, সেতার, চাকরি, টিকেট, জামা, দশ টাকার নোট, শাল–এসব গল্প।
তবে পালঙ্ক গল্পটি আরও একটু ভিন্ন। এই গল্পে একটি পালঙ্ক অর্থাৎ খাটের মাধ্যমে অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক ছলচাতুরি, সামাজিক দৈন্য, ঠুনকো আভিজাত্যের বড়াই ও তা সংরক্ষণের ও অর্জনের লড়াই। এবং এসবের পাশাপাশি ছিন্নমূল মানুষের বড় হওয়ার সহজাত আকাঙ্ক্ষা এসব জটিল সূক্ষ্ম টানাপোড়নের পাশাপাশি এতদ্অঞ্চলের বিধ্বংসী সমস্যা ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং তৎপূর্ববর্তী ও পরবর্তী সাম্প্রদায়িকতা ও সহাবস্থানের বাস করা এ অঞ্চলের দু’টি সম্প্রদায় মুসলমান ও হিন্দুর আন্তঃসম্পর্ক যা পারস্পরিক স্নেহ–মমতা–ভালোবাসা, বিশ্বাস, নির্ভরতা; আবার হিংসা, অত্যাচার, শোষণ, প্রতারণা, বিশ্বাসহীনতা, সন্দেহ অর্থাৎ পরস্পর বিরোধী মানবিক দোষগুণের আবর্তনে আবর্তিত এবং মূল টানাপোড়েনটি সেই দেশভাগজনিত কারণেই মূলত সৃষ্ট এই বিশাল প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন।
বঙ্গের এক গ্রামের ধনাঢ্য মোস্তার ধলাকর্তা ও তাঁর পরিচালক হতদরিদ্র মকবুল–এই দুজনের সম্পর্কের পারম্পয়ে নরেন্দ্রনাথ এই বহুমাত্রিক প্রেক্ষাপট যেমন তুলে ধরেছেন তাঁর অসাধারণ এই গল্পে, তেমনি রাজেন তরফদার সেই গল্পকে সেলুলয়েডের ফ্রেমে ফ্রেমে প্রাণের পরশে চিত্রায়িত করেছেন অসামান্য কুশলতায় এতদিন পর আজ বলা যায়, রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক হীনম্মন্যতা আর চাপা ভয়ের কারণে ছবিটি দুই বাংলায় বা দুই দেশে উপেক্ষিত, অনালোকিত ও লুকায়িত রয়ে গেছে। অথচ পালঙ্ক নিঃসন্দেহে বিশ্বচলচ্চিত্রের উল্লেখযোগ্য একটি ধ্রুপদী কীর্তি।
নির্মম সত্য, অভিনয়শিল্পী ও পরিচালক রাজেন তরফদার তাঁর প্রাপ্য উপযুক্ত সম্মাননা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অথচ প্রথম সারির এই চলচ্চিত্রকার নির্মাণ করেছেন পাঁচটি স্মরণীয় চলচ্চিত্র; অন্তরীক্ষা (১৯৫৭), গঙ্গা (১৯৬০), জীবন কাহিনী (১৯৬৪), আকাশ ছোঁয়া (১৯৬৮), পালঙ্ক (১৯৭৬) ও নাগপাশ (১৯৮১)। এর মধ্যে গঙ্গা ও পালঙ্ক ধ্রুপদিয়ানায় অনবদ্য। তাঁর স্মরণীয় অভিনয়ের স্মারক মৃনাল সেনের খন্ডহর, আকালের সন্ধানে, শেখর চট্টোপাধ্যায়ের বসুন্ধরা। ৩০ বছরের (১৯৫৫–১৯৮৫) সুদীর্ঘ চলচ্চিত্র জীবনে নির্মাণ করেছেন মাত্র ৫ টি চলচ্চিত্র, যথেষ্ট বিরতি দিয়ে।
পালঙ্কের অভিনাংশ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। উৎপল দত্ত ও আনোয়ার হোসেন রীতিমতো পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন। রাজমোহন রায় ও মকবুল চরিত্রে। আনোয়ার হোসেন জীবনের সেরা অভিনয় করেছেন এ ছবিতে তাঁর ম্যানরিজমকে সরিয়ে রেখে। এই দুজনের মেথড অভিনয়ের সঙ্গে সমান তালে ফাতেমা চরিত্রে স্বতস্ফূর্ত অভিনয় করেছেন সন্ধ্যা রায়। অন্যান্য চরিত্রে ফরিদ আলী, আবুল হায়াত, সুফিয়া রুস্তম, ওবায়দুল হক সরকার, হরলাল রায়, আহমেদুর রহমান রানু, পরান সাহা, নজরুল ইসলাম, অমল দে,আমজাদ হোসেন, আবদুস সামাদ, ফরিদ আহমেদ, দিলীপ সোম প্রত্যেকেই যথাযথ সাবলীল। সুঅভিনয় আদায়ের ক্ষেত্রে পরিচালকের মুন্সিয়ানার দিকটি স্মর্তব্য। মহিউদ্দিন ফারুকের শিল্প নির্দেশনা রাজেন তরফদারের চিত্রনাট্যকে উপযুক্ত বাস্তবানুগ করে তুলতে যোগ্য সঙ্গত করেছে। তেমনি পুরো চলচ্চিত্রে প্রাণসঞ্চার করেছে শৈলজা চট্টোপাধ্যায়ের পরিশ্রমী চিত্রগ্রহণ। অরবিন্দ ভট্টাচার্যের দ্রুতিময় সম্পাদনা পালঙ্ককে যেমন গতিশীল করে তুলেছে তেমনিই প্রতিটি দৃশ্যকে বাঙ্গময় করে তুলেছে সুধীন দাশগুপ্তের সঙ্গীত। তাঁর রচিত শান্তস্নিগ্ধ দু’টি লোকসঙ্গীত কন্ঠ দিয়েছেন মান্না দে ও অংশুমান রায়। সব মিলে চমৎকার একটি টিমওয়ার্ক এবং ডিরেক্টর’স ফিল্ম রাজেন তরফদারের ‘পালঙ্ক।’
২০২৬ সালে পালঙ্ক চলচ্চিত্রের ৫০ বছর পূর্তি হলো। সুবর্ণ জয়ন্তীকে পালঙ্ক দলকে অভিবাদন। চট্টগ্রাম ফিল্ম ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে ২০২৫ সালে ছবিটির বিশেষ প্রদর্শনী অনুুষ্ঠিত হয়েছিল। ইউটিউবে এই ছবির খুব ভালো ডিজিটাল (২০২২ সালের) প্রিন্ট রয়েছে।











