বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস আজ ৩ মার্চ। পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের মোট আয়তনে প্রায় এক দশমাংশ। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান নিয়ে গঠিত চিটাগং হিল ট্র্যাক্স জীব বৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের আধার। বাংলাদেশের মোট পাহাড়ি বনের ৯০ শতাংশই পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় আর দেশের মোট জীববৈচিত্র্যের ৮০ শতাংশই পাহাড়ে বিদ্যমান।
ক্রমাগত বন উজাড়ের কারণে আবাসস্থল হারানোর পাশাপাশি শিকারের কারণে অস্তিত্ব সংকটে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী। ইতোমধ্যে বন্যহাতি, সাম্বার হরিণ, বনমোরগ, মথুরা, ধনেশসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও পশু হুমকির মুখে। খাগড়াছড়িসহ তিন পার্বত্য জেলায় ক্রমাগত বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস, খাদ্য সংকট ও শিকারীদের উৎপাতের কারণে অস্ত্বিত্বে সংকটে বন্যহাতি, মায়া হরিণ, সাম্বার হরিণ, রাজ ধনেশ, ভাল্লুক, পাহাড়ি ময়না, বন মোরগ, মথুরা, মুখপোড়া হনুমানসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী ও পাখি। মানুষের অসচেনতা ও শিকারীদের কারণে দিন দিন বিপন্ন হয়ে উঠছে বন্যপ্রাণীর জীবন।
গত কয়েক বছর ধরে খাগড়াছড়িসহ তিন পার্বত্য জেলায় বন্যপ্রাণী ও জীব বৈচিত্র্য সুরক্ষায় কাজ করছে বায়োডাইভারসিটি কনজারভেশন সোসাইটি অফ সিএইচটি নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। সংগঠনটির সংগঠক সাইথোয়াই মারমা বলেন, এই পার্বত্য তিন জেলায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বন্যপ্রাণী ছিল। বর্তমানে আশংকাজনকভাবে বন্যপ্রাণী কমে আসছে। এটার অন্যতম কারণ হল নির্বিচারে বন্যপ্রাণী শিকার। এছাড়া আমাদের প্রাকৃতিক যে বন রয়েছে সেটি নিধন। জনসংখ্যার যে চাপ সেটাও একটা কারণ। বন্যপ্রাণীগুলো সংরক্ষণে উদ্যোগ না নিলে জীববৈচিত্র্যের যে ভারসাম্য সেটি থাকবে না। এজন্য বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে যে আইন রয়েছে তা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
বায়োডাইভারসিটি কনজারভেশন সোসাইটি অফ সিএইচটির প্রতিষ্ঠাতা সবুজ চাকমা বলেন, বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি বনের আয়তন ৩ লাখ ২২ হাজার ৩৩১ হেক্টর । পার্বত্য চট্টগ্রামে বন্যপ্রাণী আজ বিপন্ন এটি নিয়ে কারো কোন দ্বিমত নেই। আমাদের ধনেশ, বন্যহাতি, হনুমান ইত্যাদি প্রাণী বিপন্ন হওয়ার পথে। তারা খুবই সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। তাদেরকে আমাদের প্রকৃতিতে ফিরিয়ে আনতে হবে। সে জন্য প্রাকৃতিক বন সৃজন করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বিভন্ন সংস্থা, এনজিও এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে এগিয়ে আসতে হবে। এছাড়া অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে বনের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। বন ধ্বংসের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে শত প্রজাতির বৃক্ষ, লতা–গুল্ম। বিচরণ ক্ষেত্র কমে যাওয়ায় বনের উপর নির্ভরশীল বণ্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বন ধ্বংস হওয়ায় পানি উৎস কমেছে প্রায় ৬১ শতাংশ। শুষ্ক মৌসুমে ঝিরি ঝরনায় পানি উৎস কমে আসায় দুর্ভোগে পড়েছে স্থানীয়রা। ছড়ার আশপাশের পাহাড়ে নির্বিচারে গাছ কেটে পাহাড় ন্যাড়া করার কারণে বিনষ্ট হয়েছে পানির উৎস। ঝিরি ও ছড়ায় পানির প্রবাহ না থাকায় বিপাকে স্থানীয়রা।
বন্যপ্রাণী শিকার করলে ৫০ হাজার জরিমানা ও ১ বছরের জেল দেওয়ার বিধান রয়েছে। ইতোমধ্যে বন আইনে একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলার পাশাপাশি কয়েক বছরে বন বিড়াল, লজ্জ্বাবতী বানর, তক্ষকসহ ৪৫টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছে খাগড়াছড়ি বন বিভাগ। শিকার বন্ধে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি আইন প্রয়োগ করার কথা জানিয়েছেন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. ফরিদ মিঞা। তিনি বলেন, বন্যপ্রাণী যাতে কেউ শিকার বা পাচার করতে না পারে সে জন্য খাগড়াছড়ি বন বিভাগ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মাঝে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করছি।
পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বন্যপ্রাণী উপযোগী বৃক্ষ রোপণের পাশাপাশি কেউ যাতে বন্যপ্রাণী শিকার বা হত্যা না করে সে জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন হাট বাজারে লিফলেট বিতরণসহ সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করছি।








