পার্বত্য অঞ্চল : সম্ভাবনার বিস্তৃত ক্ষেত্র

কুমুদিনী কলি | শনিবার , ২৪ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৬:১৫ পূর্বাহ্ণ

অনন্ত অপার সম্ভাবনার পাহাড় অটল আভিজাত্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, অবিনশ্বর হয়ে। তার বুকে অজস্র প্রাণ, জীবনের অপার আনন্দ আবার বিষাদের অশেষ বেদনায় চুয়ে চুয়ে পড়া অশ্রু একসময় প্রবল প্রকাণ্ড রূপে সব বাধা নিষেধ উপেক্ষা করে সবেগে ধাবিত হয়, আর আমরা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যাই। চোখ মেলে শুধু দৃষ্টির তৃষ্ণা মিটাই। এত সুন্দর, এত অপার্থিব সে সুন্দর, যা শুধু দৃষ্টিতে ধরা দেয়, বর্ণনার যোগ্য নয়। কোনো শব্দে বা বাক্যে এই অপার্থিব সৌন্দর্যের বর্ণনা সম্ভব নয়। এই সৌন্দর্য শুধু অনুভবের জন্য।

পাহাড় ও পাহাড়কেন্দ্রিক জীবনযাপন বাংলাদেশের এক অন্যতম ঐতিহ্য। এমনই এক ঐতিহ্য যা শুধু দেশেই নয়, ছড়িয়ে আছে দেশের বাইরেও। পাহাড়কে যারা বুকে আগলে রাখেন তারা আমাদের সম্পদ।

আদিবাসী তারা। পাহাড় তাদের, তারা পাহাড়ের। পাহাড়ের সাথে আদিবাসীদের যে নৈকট্য, তা আমরা সমতলের মানুষরা বুঝতে পারবো না। তাদের অস্তিত্বের প্রতিটি অলিতে গলিতে পাহাড়ের অবাধ বিচরণ। সূর্যালোকের প্রখর আলো যেমন গহীন জঙ্গেেলর মধ্যে ও নানা অবয়বে, নানা ফাঁক ফোঁকরের মধ্যে দিয়ে প্রবেশ করে, তেমনি পাহাড় আর পাহাড়ের নানা অভিজ্ঞতা, নানা রূপ তাদের অস্তিত্বের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে গেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। এ এক অপার্থিব আত্মিক বন্ধন।

পাহাড়কে ভালোবেসে, পাহাড়কেই একমাত্র অবলম্বন করে এখনো পাহাড়ে রয়ে গেছেন বেশিরভাগ আদিবাসী। আধুনিক এই বহুমাত্রিক জীবনযাপনের ধারায় তারা এখনো স্বকীয়, এখনো স্বাধীন, স্বতন্ত্র।

তাদের নিজস্ব রীতিনীতি, ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনযাপনের ধারা, পোশাকের ভিন্নতা, ধর্মীয় আচার আমাদের মুগ্ধ করে চলেছে। এসবকে ছাপিয়ে সবচে বড় হয়ে ধরা দেয় যে অনুষঙ্গটি, তা হলো তাদের সততা ও পরিশ্রম। তারা ভীষণ পরিশ্রমী। নানাভাবে নিজেদের জীবনের উন্নয়নের জন্য তারা কাজ করে চলেছে প্রতিনিয়ত। তাদের সততা, তাদের পরিশ্রম তাদেরকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।

বর্তমান সময়ে অতি আধুনিকতা এখনো যেনো তাদের সবটা গ্রাস করে উঠতে পারেনি। তবে আধুনিকায়নের ফল পরিস্ফুট হতে শুরু করেছে পাহাড়ে। সন্ধ্যে হলেই পাহাড় জুড়ে আলোর উৎসব সে কথাই বলে যায় কানে কানে।

পাহাড় অফুরন্ত সম্ভাবনা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অটল এক সম্পদ। কিন্তু পাহাড়ের কিছু সীমাবদ্ধতাও ছিলো এতকাল। সুপেয় পানি, জ্বালানি, খাদ্য সংকট, বিদ্যুতের অব্যবস্থাপনা, শিক্ষার অভাব মোটকথা মানবীয় মৌলিক চাহিদার ন্যূনতম যোগানও ছিলো না তেমন। তাতে করে সমতল থেকে পাহাড় পিছিয়ে ছিলো বহুগুণ। কিন্তু বিগত কয়েকদশক ধরে ধীরে ধীরে পাহাড় আলোর মুখ দেখতে শুরু করেছে। সবচেয়ে আশার কথা হলো এই, আগের চেয়ে শিক্ষার হার বেড়েছে, সচেতনতা বেড়েছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। আর মৌলিক চাহিদার যোগানও বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রশাসনের সহায়তায়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদান অবশ্যই প্রশংসনীয়। পাহাড়ের প্রতিটি রাস্তা চলাচল উপযোগী করে গড়ে তোলা এবং পাহাড়কে ঘিরে পর্যটন শিল্পের বিকাশমান যাত্রা তাদেরই কঠোর পরিশ্রমের ফসল এটা মানতেই হবে। সুউচ্চ পাহাড়ে পানি, টয়লেট, বৈদ্যুতিক বাতিসহ সুন্দর সুন্দর রিসোর্ট, হোটেল, মোটেলের ব্যবস্থা ও সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জোরালো ভূমিকা পালন করে তারা তাদের কাজের স্বীকৃতি পাচ্ছে সরকার কর্তৃক। এক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের ত্যাগ, ধৈর্য্য ও পাহাড় প্রীতির পরিচয় দিচ্ছে।

ইন্টারনেট সেবার দ্রুত প্রসার পাহাড়ের মানুষের কাছে অকল্পনীয় আশীর্বাদ নিঃসন্দেহে। ইন্টারনেটে নানান জায়গার ছবি পোস্টের মাধ্যমে এমন অদেখা নানা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে ভ্রমণপিপাসুদের একটা অংশ প্রতিদিন ছুটে আসে দূর দূরান্ত থেকে। এতে পর্যটন শিল্প বিস্তৃত হচ্ছে দিনদিন। এছাড়াও পাহাড়ের বুকে চাষ করা নানান দ্রব্য সামগ্রী নিয়ে এখন অনেকেই অনলাইন ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। শিক্ষিতদের একাংশ ধীরে ধীরে পুরো পৃথিবীতে পাহাড়ের মুখ আলো করে চলেছে। আর একটি অংশ পাহাড়কে প্রতিষ্ঠিত করছে সারাদেশে তথা বিদেশের মাটিতেও পাহাড়ের বুকে চাষ করা নানান রকম খাদ্যদ্রব্য আর পাহাড়ের ঐতিহ্যগত পোশাকের বেচাকেনার মাধ্যমে। অনলাইন ব্যবসা যেখানে আগে শুধুমাত্র স্বপ্নই ছিলো, আজ সেটা পূরণ করেছে অনেকজনই। এতে করে আর্থিক স্বচ্ছলতা আসছে, প্রচার ও প্রসার হচ্ছে পাহাড় এবং সংশ্লিষ্টদের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ।

বলে রাখা ভালো যে, বিভিন্ন এনজিও সংস্থা পাহাড়ের বুকে গড়ে তুলেছে তাদের স্বপ্নের সংগঠন। তারা আদিবাসীদের নিয়ে নানা প্রকল্পের কাজ করতে এগিয়ে যাচ্ছেন, আর তাতে পাহাড়ের আদিবাসীরা বিভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ পাচ্ছে। সবমিলিয়ে পাহাড় এবং পাহাড়কে বুকে আগলে রাখা আদিবাসী সমাজের সার্বিক সফলতা নিঃসন্দেহে চোখে পড়ার মতো। দেশ এবং বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে পাহাড়কে ঘিরে এই দৃশ্যমান অগ্রগতি আমাদের মতো পাহাড় প্রিয় মানুষকে মুগ্ধ করে।

কোনোভাবেই যে বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না, তা হলো ভূমিদস্যুদের দস্যিপনা। নির্বিচারে পাহাড় কাটা, বনাঞ্চল ধ্বংস পাহাড়ের অস্তিত্বকে সংকটময় পরিস্থিতিতে এনে দাঁড় করিয়েছে। পাহাড়ের রূপ সৌন্দর্য অনুভব করার জন্য রিসোর্ট বা কটেজগুলো তৈরী করার প্রয়োজন আছে নিঃসন্দেহে। যাতে করে মানুষ সেখানে ভ্রমণকালীন থাকা খাওয়ার সুযোগ পায়। রাত্রিযাপনের সুযোগ পায়। রাত্রিকালীন নৈসর্গিক সৌন্দর্য অবলোকনের সুযোগ থেকে যেনো বঞ্চিত না হয়।

কিন্তু সেসব সমতল কেন্দ্রিক হতে পারে। পার্বত্য অঞ্চলের সমতল স্থানগুলোতে এসব হোটেল, কটেজ স্থাপন করে পাহাড়কে এসব থেকে মুক্ত করা হোক। বিশাল বিশাল পাহাড় নষ্ট করে, পাহাড়ের বুকে প্রাসাদসম হোটেল তৈরীতে হয়তো পর্যটন শিল্পের অগ্রগতি পরিমাপ করা যায়, কিন্তু তাতে করে হারিয়ে যায় সেই পাহাড় যাকে দেখতে এই রাজকীয় আয়োজন।

পাহাড় আর পাহাড়ের বুকে জেগে থাকা এই অফুরন্ত সম্ভাবনা, উর্বরতা, সম্পদ নিঃসন্দেহে সৃষ্টিকর্তার এক অপূর্ব সংযোজন। আমরা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্য চোখে দেখবো বলে, সেই সৌন্দর্যকে নষ্ট করছি অবচেতনে। সবুজকে দুই চোখে মেখে নেবার যে আনন্দ আয়োজন তাতে আনন্দটুকুতে ভাটা পড়ে, তা আমরা বুঝতে চাই না।

পাহাড় শুধু সবুজে পরিপূর্ণ রাখা আর পাহাড় কাটা বন্ধ করা এখন সময়ের দাবী। ভূমিদস্যুদের করাল গ্রাস ঘেকে মুক্ত করে সবুজের আবাদ নিশ্চিত করার প্রয়াস গড়ে তোলা বা বনাঞ্চল সংরক্ষণ করার মধ্য দিয়ে সবুজ হোক আমাদের পৃথিবী।

পাহাড় পাহাড়ের জায়গায় অটুট অটল থাকবে। আমরা পাহাড়কে অক্ষত রেখে বাকি উন্নয়নটুকু করতে চাইবো। এতে করে আমাদের জাতীয় সম্পদ অক্ষত থাকবে। আমরা সমৃদ্ধ হবো।

পর্যটনশিল্পের এত বড় একটা অধ্যায় আমাদের এই পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড় ও তৎসংলগ্ন শিল্প, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি। পাহাড়ের যত্রতত্র প্লাস্টিকের ছড়াছড়ি, পলিথিনের অপর্যাপ্ত ব্যবহার, অপচনশীল বস্তুর কারণে মাটির পর্যাপ্ত উর্বরতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দিনদিন। এতে করে পাহাড়ের মাটি নষ্ট হয়ে ফসলের গুণগত মানও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে অস্বাভাবিকভাবে। আর তার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে আদিবাসীদের চাষাবাদের ওপর। তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের অর্থনীতির ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে আমাদেরই এই অসচেতনতার জন্য। পাহাড়কে সবুজ সুন্দর রাখার জন্য, অক্ষত রাখার প্রয়াসে একটু সচেতনতা, ভালোবাসা পাহাড় ও আদিবাসীদের জীবনযাপন পদ্ধতিতে আনতে পারে আমূল পরিবর্তন। পাহাড় থাকবে নির্মল, দূষণমুক্ত, নির্ভেজাল।

লেখক: প্রাবন্ধিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঘুমানোর আগে শিশুর কথা শুনলে তাদের মানসিক বিকাশ হয়
পরবর্তী নিবন্ধগণতন্ত্র খেলাফতের পরিপূরক বিপরীত বা প্রতিবন্ধক নয়