রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, উৎসব হলো মিলন ও মনুষ্যত্বের উদযাপন, যেখানে মানুষ তার ক্ষুদ্রতাকে অতিক্রম করে বৃহৎ হয়ে ওঠে, এবং এই উৎসবে একাকীত্ব নয়, সম্মিলিত আনন্দই মুখ্য; এটি জীবনের আনন্দকে বিশেষভাবে উপলব্ধি করার দিন, যেখানে মানুষ তার ভেতরের শক্তি ও বিশ্বজনীনতাকে অনুভব করে, যেমন ‘উৎসব একলার নহে, মিলনের মধ্যেই সত্যের প্রকাশ’। মানুষ সামাজিক জীব। নিত্যদিনের প্রয়োজনে মানুষকে লড়াই করে এগিয়ে যেতে হয়। কর্মে, দায়িত্বে, অভিভাবকত্বে নিজেকে সদা ব্যস্ত থাকতে হয়। এই ব্যস্ততার মাঝে যখন কোন হারানো মুখের দেখা মেলে তখন ক্লান্তির চেহারায় উজ্জ্বল হাসি ফুটে ওঠে। ইচ্ছে হয় কৈশোরের কিংবা টগবগে তারুণ্যের সেই উচ্ছল দিনগুলোতে ফিরে যেতে। মানুষের এই তাগিদবোধ থেকেই মিলনমেলার সূচনা। এক কথায় মিলনমেলা হল বহু মানুষের পারস্পরিক মিলন, আনন্দ এবং বন্ধুত্বের এক অপূর্ব ক্ষেত্র। যেখানে সংস্কৃতি ও আত্মিক বন্ধন দৃঢ় হয়। জীবনের ব্যস্ততায় হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কগুলো যেখানে এসে আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে। এ যেন এক টুকরো আনন্দদ্বীপ। সেখানে জীবনের সব ক্লান্তি আর দুঃখ মুহূর্তেই দূর হয়ে যায়। হাসির কলরবে মুখরিত থাকে চারিদিক।
মিলনমেলা অনেক ধরনের হয়ে থাকে। তবে সবগুলোকে ছাপিয়ে ‘পারিবারিক মিলনমেলা’–ই যেন এক বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে। এটি কর্মব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি দূর করে। আনন্দঘন আড্ডা, গান, নাচ, কবিতা, স্মৃতি রোমন্থন ইত্যাদির মাধ্যমে পারিবারিক বন্ধনকে যেমন সুদৃঢ় করে, তেমনি শিশু– কিশোরদের মধ্যেও একটি পারিবারিক বন্ধন, সমপ্রীতি, ঐতিহ্য ও আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে তুলতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এই মিলন মেলায় দীর্ঘদিনের বন্ধুদের সাথে তারুণ্যের সোনালী দিনগুলোর স্মৃতিচারণে নস্টালজিয়ায় ফিরে যাওয়া। তেমনি আবার স্বজনদের সাথে দূরত্বের সম্পর্ককে কাছে টেনে আনা। ‘পারিবারিক মিলনমেলায়’ এসে মনে হয়, সবাই যেন একই পরিবারের অংশ। এখানে কোনও ভেদাভেদ নেই। শুধু আছে আন্তরিকতা ও ভালোবাসার উষ্ণ আলিঙ্গন। সমমানের মানুষগুলোর এই মিল বন্ধন এর ফলে পরবর্তী প্রজন্মই মানসিকভাবে লাভবান হবে বলে মনে করি। পরিচিতির ব্যাপ্তি ঘটায় বলে তারা চেনে নেবে একে অপরকে, এক পরিবার অন্য পরিবারকে। ‘পারিবারিক মিলনমেলা’–গ্রামের বিস্তৃত মাঠ থেকে শুরু করে নগরের যে কোন কেন্দ্র বা দেশের ঐতিহাসিক স্থানগুলোতে হতে পারে। এতে করে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মিলন ঘটবে। যা আমাদের দেশের বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্যকে তুলে ধরে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে। আমাদের সন্তানদের মধ্যে সংকীর্ণতার পরিবর্তে সমৃদ্ধতা বৃদ্ধি করবে। পরিশেষে বলা যায়,‘পারিবারিক মিলনমেলা’ শুধু একটা অনুষ্ঠান নয়। এটি হৃদয়ের টানে ফিরে আসার এক গল্প। পারিবারিক সংকটে একে অপরের জন্যে এগিয়ে আসার নব উদ্যম। আর নিজেদের শিকড়কে চেনার একটি চমৎকার মাধ্যম। এটি হচ্ছে, একটি পরিবারের সাথে আরেকটি পরিবারের পরিচয় ও যোগাযোগের মেলবন্ধন। এই মেলবন্ধন যেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অব্যাহত থাকে।











