বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সার্জেই পারাজানভ এমন এক নাম, যা কোনো নির্দিষ্ট দেশ, কাল বা ব্যাকরণের ফ্রেমে ধরা দেয় না। তাকে বলা হয় সিনেমার ‘জাদুকর’, যার প্রতিটি ফ্রেম এক একটি জীবন্ত চিত্রকলা। ১৯২৪ সালের ৯ জানুয়ারি জর্জিয়ার তিবিলিসিতে এক আর্মেনীয় পরিবারে তার জন্ম। তার শৈশব কেটেছে তিবিলিসির এক বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে যেখানে পারস্য, আর্মেনীয় এবং জর্জীয় ঐতিহ্যের মিলন ঘটেছিল। পারাজানভের পিতা জোসেফ পারাজানভ ছিলেন একজন প্রাচীন সামগ্রী বা এন্টিক ডিলার। সোভিয়েত আমলে এই ব্যবসা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, ফলে রাষ্ট্রীয় তল্লাশির ভয়ে পারাজানভকে ছোটবেলায় অনেক সময় মূল্যবান ছোট গয়না গিলে ফেলতে হতো এবং পরে তা মলত্যাগের মাধ্যমে উদ্ধার করা হতো । এই অদ্ভুত ও তিক্ত অভিজ্ঞতা সম্ভবত তাকে বস্তুর অভ্যন্তরীণ রহস্য এবং তার জৈবিক রূপান্তরের প্রতি এক গভীর সংবেদনশীলতা দান করেছিল।
পারাজানভের শৈল্পিক জীবনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল সংগীতের মাধ্যমে। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ ভায়োলিন বাদক এবং গায়ক। ১৯৪৫ সালে তিনি মস্কোর মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র স্কুল ভিজিআইকে (ঠএওক)-তে ভর্তি হন, যেখানে তিনি কিংবদন্তি ইউক্রেনীয় নির্মাতা আলেকজান্ডার ডোভঝেনকোর অধীনে দীক্ষা নেন । ডোভঝেনকোর কাছেই তিনি শিখেছিলেন কীভাবে একটি অঞ্চলের মাটি ও মানুষের সংস্কৃতিকে সিনেমার মূল উপজীব্য করতে হয়। ১৯৫১ সালে স্নাতক শেষ করার পর তিনি কিয়েভের ডোভঝেনকো ফিল্ম স্টুডিওতে কর্মজীবন শুরু করেন। তবে তার শুরুর দিকের চলচ্চিত্রগুলো ছিল সোভিয়েত রাষ্ট্রীয় আদর্শ বা ‘সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ’–এর অনুকরণে তৈরি, যেগুলোকে পারাজানভ পরবর্তীতে ‘আবর্জনা’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন । ১৯৬২ সালে আন্দ্রেই তারকোভস্কির ‘ইভান’স চাইল্ডহুড’ দেখার পর তার শিল্পবোধে এক আমূল পরিবর্তন আসে এবং তিনি প্রচলিত আখ্যানধর্মী সিনেমা ছেড়ে রূপকধর্মী নিজস্ব ভাষা নির্মাণে মনোনিবেশ করেন ।
পারাজানভের ব্যক্তিগত জীবন ছিল এক বিশাল ট্র্যাজেডির আখ্যান। ১৯৫০ সালে তিনি নিগার কেরিমোভা নামক এক তাতার মুসলিম নারীকে বিয়ে করেন। নিগার পারাজানভকে বিয়ে করার জন্য ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করায় তার নিজ পরিবার তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে ট্রেনের নিচে ফেলে দেয় । এই ঘটনা পারাজানভকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে এবং তার পরবর্তী সৃষ্টিতে বিসর্জন, রক্ত এবং পবিত্রতার যে করুণ সুর পাওয়া যায়, তার মূলে ছিল নিগারের সেই স্মৃতি। পরবর্তীতে তিনি সভেতলানা শ্চেরবাতিউককে বিয়ে করেন এবং তাদের সুরেন নামে এক পুত্রসন্তান হয়, কিন্তু পারাজানভের খামখেয়ালি এবং বোহেমিয়ান জীবনযাপনের কারণে সেই সংসারও টেকেনি ।
১৯৬৪ সালে ‘শ্যাডোস অব ফরগটেন অ্যান্সেস্টরস’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পারাজানভ বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। ইউক্রেনের হুতসুল জনজাতির এই লোকগাথা নির্মাণে তিনি রঙের এক জাদুকরী ব্যবহার দেখান। কিন্তু তার শ্রেষ্ঠ কীর্তি হিসেবে ধরা হয় ১৯৬৯ সালের ‘দ্য কালার অব পমেগ্রানেটস’ বা ‘সায়াত নোভা’কে। এই চলচ্চিত্রে তিনি সিনেমার প্রচলিত ভাষাকে পুরোপুরি ভেঙে ফেলেন। এখানে কোনো সংলাপ নেই, কোনো রৈখিক গল্প নেই; আছে কেবল স্থির ক্যামেরায় বন্দি একের পর এক দৃশ্যপট বা ‘ত্যাবলো ভিভঁ’। তিনি ক্যামেরা মুভমেন্ট প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিলেন এবং প্রতিটি ফ্রেমকে সাজিয়েছিলেন মধ্যযুগীয় পারস্য মিনিয়েচার পেইন্টিংয়ের আদলে। এই স্থিরচিত্রের মতো দৃশ্যগুলো দর্শকদের বাধ্য করে প্রতিটি ফ্রেমের ভেতরে লুকিয়ে থাকা রূপকগুলো পর্যবেক্ষণ করতে। যেমন, ঝরতে থাকা ডালিমের রস যখন রক্তের মতো ক্যানভাসে ছড়িয়ে পড়ে, তা কেবল কবির যন্ত্রণা নয় বরং গোটা আর্মেনীয় জাতির রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের প্রতীক হয়ে ওঠে । সফিকো চিয়াউরিলিকে দিয়ে একই সাথে পুরুষ ও নারী চরিত্রে অভিনয় করিয়ে তিনি আত্মার লিঙ্গহীনতা ও সৃজনশীলতার বহুমাত্রিকতাকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন ।
সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ পারাজানভের এই বিমূর্ত ও আধ্যাত্মিক শিল্পরীতিকে সহজভাবে নেয়নি। ১৯৭৩ সালে তাকে সমকামিতা, পর্নোগ্রাফি ছড়ানো এবং প্রাচীন জিনিসের অবৈধ ব্যবসার মতো সাজানো অভিযোগে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয় । জেলখানার নরকযন্ত্রণা তাকে দমাতে পারেনি। ক্যামেরা ও সেলুলয়েড না থাকায় তিনি জেলের আবর্জনা, কাপড়ের টুকরো এবং দইয়ের কৌটার ধাতব ঢাকনা খুঁটিয়ে কোলাজ ও পুতুল তৈরি শুরু করেন। তার কোলাজে বারবার ফিরে আসত ‘ক্রেন হুক’ বা ‘পবিত্র ঝাড়ুদার’–এর প্রতিচ্ছবি, যা ছিল কারাবন্দী জীবনের এক করুণ বিদ্রূপ। জেলের ভেতরে বসেই তিনি প্রায় ৮০০টি শিল্পকর্ম তৈরি করেছিলেন, যেগুলোকে তিনি বলতেন ‘তিলজমান’ বা জাদুকরী রক্ষাকবচ। তার কারামুক্তির জন্য ফেদেরিকো ফেলিনি, গদার এবং তারকোভস্কির মতো বিখ্যাত পরিচালকরা আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করেন, যার ফলে ১৯৭৭ সালে তিনি মুক্তি পান ।
পারাজানভের জীবনযাপন ছিল তার চলচ্চিত্রের মতোই বর্ণিল ও বোহেমিয়ান। তিবিলিসিতে তার বাড়িটি ছিল এক জীবন্ত মিউজিয়াম, যেখানে টয়লেটের দেয়ালও সাজানো ছিল ব্যঙ্গাত্মক চিত্রকলায় । তিনি বিশ্বাস করতেন পরিচালক হতে গেলে তা মায়ের গর্ভ থেকেই শিখে আসতে হয়। তার সম্পর্কে কিংবদন্তি আন্দ্রেই তারকোভস্কি বলেছিলেন, “পারাজানভ প্রতিটি বিষয়েই একজন জিনিয়াস”। জাঁ–লুক গদার বলেছিলেন, “সিনেমার মন্দিরে থাকে আলো, ছবি আর বাস্তবতা; পারাজানভ ছিলেন সেই মন্দিরের প্রধান পুরোহিত”। মিখাইল বার্তানভ দাবি করেছিলেন যে গ্রিফিথ এবং আইজেনস্টাইন যে চলচ্চিত্র ভাষার সূচনা করেছিলেন, পারাজানভ তাতে এক বিপ্লবী সংযোজন ঘটিয়েছেন ।
১৯৮০–এর দশকে সোভিয়েত রাজনীতির পরিবর্তনের হাওয়ায় তিনি আবার কাজ করার সুযোগ পান এবং ‘দ্য লিজেন্ড অব সুরাম ফোর্ট্রেস’ ও ‘আশিক কেরিব’ নির্মাণ করেন। ১৯৯০ সালের ২০ জুলাই ইয়েরেভানে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে এই মহান শিল্পীর জীবনাবসান ঘটে । মৃত্যুর আগে তিনি বলেছিলেন, “আমি ভালোবাসার মাধ্যমে দুনিয়ার ওপর প্রতিশোধ নেব” । পারাজানভ কেবল একজন চলচ্চিত্রকার ছিলেন না; তিনি ছিলেন এমন এক সাধক যিনি দেখিয়েছিলেন যে জেলের প্রাচীর বা সেন্সরশিপের কাঁচি কোনোটিই মানুষের সৃজনশীল আত্মাকে বন্দী করতে পারে না। আজ তার চলচ্চিত্রগুলো কেবল সেলুলয়েডের ফিতা নয়, বরং মানুষের অন্তরাত্মার অবিনশ্বর সৌন্দর্যের এক অমর দলিল হিসেবে বিশ্ব চলচ্চিত্রে দীপ্যমান।








