পাচার করা সম্পদ পুনরুদ্ধার করতে পারলে অর্থনীতি শক্তিশালী হবে

| শনিবার , ১০ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৬:১২ পূর্বাহ্ণ

২০২৪২৫ অর্থবছরের সামপ্রতিক তথ্য থেকে জানা যায়, দেশ ও বিদেশের ১৭৪টি আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (এফআইইউ) সহযোগিতায় পাচার করা অর্থের সন্ধানে তদন্তের এক বিশাল জাল বিস্তার করা হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে এমন সমন্বিত ও ব্যাপক উদ্যোগ আগে দেখা যায়নি। পাচার করা অর্থের অঙ্কটিও মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো। শ্বেতপত্র কমিটির মতে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশ থেকে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পাচার করা অর্থে তৈরি হয়েছে ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের দৃঢ় অবস্থান এবং বিএফআইইউএর সক্রিয়তা এই অন্ধকার অধ্যায় অবসানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাব স্থগিত এবং দেশের অভ্যন্তরে ও বিদেশে প্রায় ৬৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ ফ্রিজ করার পদক্ষেপগুলো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতি জনমনে আস্থার সঞ্চার করছে।

পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, অর্থ পাচার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক ৪টি সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জি.এফ.আই)সুইস ব্যাংক, ইউ.এন.ডিপি ও যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের আইসিআইজের পানামা ও প্যারাডাইস পেপারে পৃথিবী বিভিন্ন দেশের সাথে অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশীদের নামও উঠে এসেছে। তাদের তথ্য মতে বিশ্বে যে পরিমান অর্থ পাচার হয় তার ২৪% উন্নয়নশীল দেশ থেকে। সংস্থাগুলোর মতে বাংলাদেশ থেকে যে অর্থ পাচার হয় তার অধিকাংশ যায় উন্নত ৩৬টি দেশে তার মধ্যে ১০টি দেশকে চিহ্নিত করেছে বিএফআইইউ ও দুদক। দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সিঙ্গাপুর, কানাডা, মালেয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজার ল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া, হংকং ও থাইল্যান্ড। এছাড়া কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভারতসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ রয়েছে। তাই স্বাভাবিকভাবে বলতে হয় এই উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে দুর্নীতি এবং অর্থ পাচারে উন্নত রাষ্ট্র সমূহ অনেকাংশে দায়ী। সমীক্ষা ও পরিসংখ্যানে যতদূর জানা যায় এই দুর্নীতির থেকে আয়কৃত সকল অর্থ তারা ঐ সমস্ত উন্নত রাষ্ট্রেই বিনিয়োগ করে। কিন্তু হঠাৎ করে অন্য একটি দেশের নাগরিক কী করে তার দেশে এত অর্থ বিনিয়োগ করলো তার উৎস কী, তারা সেটা যাচাই করে না। ফলে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের দুর্নীতিবাজ মানুষগুলো আরো দুর্নীতি করতে উদ্বুদ্ধ হয়। প্রকৃত অর্থে উন্নত রাষ্ট্র সমূহ যারা উন্নয়নশীল বা অনুন্নত রাষ্ট্র সমূহকে দুর্নীতি কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছে প্রকারান্তরে দুর্নীতিবাজদের সহযোগিতা করছে।

অর্থ পাচার নিয়ে অতীতে অনেক আলোচনা হলেও বাস্তবে পাচার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকা পালনের খবরও বেরিয়েছে। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে, বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) অর্থ পাচার ঠেকানোর দায়িত্বে থাকলেও উলটো সংস্থারটিরই ঊর্ধ্বতন কতিপয় সদস্য পাচারকারীদের সহায়তা করেছে। সংস্থাটির এক সদ্য পদত্যাগী বলেছেন, অর্থ পাচারের সবকটি দরজা দুর্নীতিবাজদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ায় দেশ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচার হয়ে গেছে। রাজনৈতিক পালাবদলের এ প্রেক্ষাপটে কেউ যাতে অর্থ তুলে নিয়ে পালিয়ে যেতে না পারে, তা প্রতিরোধে সন্দেহভাজনদের ব্যাংক হিসাব জব্দকরণসহ বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

আসলে দেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচার হওয়ার বিষয়টি নতুন নয়। বিগত অনেক বছর ধরেই তা চলছে এবং দিন দিন আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোনোভাবেই অর্থ পাচার যেমন বন্ধ করা যাচ্ছে না, তেমনি পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনারও কোনো প্রচেষ্টা সফল হচ্ছে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, দুর্নীতি ও অর্থ পাচার সংক্রান্ত অপরাধগুলো বিশ্বের যেসব দেশে সাফল্যের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে; দেখা যাচ্ছে, সেখানে দুদকের মতো দুর্নীতিবিরোধী রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোই মূল ভূমিকা পালন করেছে। সামগ্রিক অবস্থা পর্যালোচনা করে অর্থনীতিবিদরা বলেন, পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে কৌশলী ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, পাচার করা সম্পদ পুনরুদ্ধার করতে পারলে তা ভঙ্গুর অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে