পাকিস্তানে তরুণ প্রজন্মের নতুন ঝোঁক মদ-মাদকহীন আড্ডা

| শনিবার , ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ

নিয়ন আলোর নিচে ড্যান্স ফ্লোরে বাজনার তালে নাচছে একদল তরুণতরুণী। তবে এই নাচের সঙ্গে নেই কোনও অ্যালকোহল বা মাদক; বরং তাদের হাতে ধরা কফি বা আইসড টি। পাকিস্তানে করাচির একটি ইনডোর স্পোর্টস ক্লাবে দেখা গেছে এমনটাই। রাত ১০টা বাজতেই সেখানে বন্ধ হয়ে যায় মিউজিক। এটিই পাকিস্তানের ‘জেন জি’ বা বর্তমান তরুণ প্রজন্মের সামাজিক বিনোদনের নতুন চিত্র। সারা বিশ্বের মতো পাকিস্তানেও জেনজি রা এখন স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা বেছে নিয়ে ‘সোবার সোশ্যালাইজিং’ বা নেশামুক্ত আড্ডার দিকে ঝুঁকছে।

মুসলিমদের জন্য অ্যালকোহল নিষিদ্ধ। আর পাকিস্তানে মুসলিম বেশি হওয়ার কারণে মদমাদকহীন আড্ডার নতুন ধারাটি তরুণ প্রজন্মের কাছে বাড়তি আবেদন তৈরি করেছে। তারা আগের আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। আগে প্রায়ই আন্ডারগ্রাউন্ড বা গোপন আড্ডা কিংবা পার্টি হত। কারণ, ওইসব পার্টিতে অ্যালকোহল এবং মাদক থাকত। তাই কর্তৃপক্ষের হাতে ধরা পড়ার ঝুঁকিও থাকত। কিন্তু এখন স্পোর্টস ক্লাব, কফি শপ, এমনকি আর্ট গ্যালারিতেও স্থানীয় সরকারের অনুমতি নিয়ে প্রকাশ্যে মাদকহীন পার্টি আয়োজন করা হচ্ছে। খবর বিডিনিউজের।

করাচির স্পোর্টস ক্লাবে তরুণ প্রজন্মের ওই পার্টিতে যোগ দেওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল সীমিত। নাচের ফাঁকে বিরতি দিয়ে সেখানে চলেছে প্যাডেল খেলাও (টেনিস ও স্কোয়াশের সংমিশ্রণে তৈরি এক ধরনের র‌্যাকেট খেলা)। সফটওয়্যার উদ্যোক্তা জিয়া মালিক বলেন, করাচিতে আমাদের সামাজিক অস্তিত্ব প্রকাশের জায়গা খুব কম। এই আয়োজনগুলো আমাদের লুকিয়ে না থেকে জনসমক্ষে আড্ডা দেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। আমি কয়েকটি আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টিতে গেছি। সেখানে আপনি নিরাপদ বোধ করবেন না।

পার্টি আয়োজক সংস্থা ‘১২এক্সপেরিয়েন্স’ জানায়, ড্রোন এবং দেওয়ালে লাগানো ক্যামেরার মাধ্যমে পুরো আসর নজরে রাখা হয় যাতে কোনো ধরনের মাদকের ব্যবহার বা হেনস্তার ঘটনা না ঘটে। সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা উসমান আহমেদ বলেন, আমরা এমন একটি জায়গা তৈরি করতে চাই যেখানে মানুষ কোনও মদ ও মাদক কিংবা বিশৃঙ্খলা ছাড়াই নিরাপদ বোধ করবে। এ রকম পার্টি এখন করাচিজুড়েই বেড়েছে। স্পোর্টস ক্লাব, কফি শপ, আর্ট গ্যালারির মতো জায়গাগুলোতেই এসব আড্ডা বা পার্টি চলছে বেশি।

ইউরোমনিটরের তথ্যানুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পাকিস্তানে কোমল পানীয় ও গরম কফির বাজার ২৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র বা ব্রিটেনের বাজারকেও ছাড়িয়ে গেছে। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, তরুণরা ধর্মকে অস্বীকার করছে না, বরং ধর্মীয় কাঠামোর ভেতরে থেকেই সামাজিক জীবনকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে।

করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. কায়সার পারভীন বলেন, তারা ধর্মের বাইরে যাচ্ছে না, বরং সামাজিক জীবন যাপনের পদ্ধতিকে নতুন রূপ দিচ্ছে। শুধুমাত্র নারীদের জন্য আয়োজনও পাকিস্তানে ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে। শুধুমাত্র নারীদের জন্য করাচিতে আয়োজিত হচ্ছে বিশেষ মিউজিক নাইট।

কৌতুক অভিনেতা ও ইনফ্লুয়েন্সার আমতুল বাওয়েজা তার ক্যাফেতে নারীদের জন্য এ ধরনের আয়োজন করেন। তিনি বলেন, নারীদের জন্য রাতে কোনও কিছু করা অনেক শর্তের ওপর নির্ভর করে। যেমন : পার্টি কতক্ষণ চলবে, কারা থাকবে, কতজন দেখবেএসব নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় নারীদের। কিন্তু আমরা এমন এক জায়গা তৈরি করেছি, যেখানে তারা এতসব প্রশ্নের মুখোমুখি না হয়ে নিশ্চিন্তে নাচতে এবং আড্ডা দিতে পারবে।

তবে এসব আয়োজনের টিকিটের দাম (,০০০ থেকে ৭,০০০ পাকিস্তানি রুপি) সাধারণের তুলনায় কিছুটা বেশি হওয়ায় এটি উচ্চমধ্যবিত্ত তরুণতরুণীদের মধ্যেই বেশি সীমাবদ্ধ থাকছে। তারপরও স্মার্টফোন আর সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের মাধ্যমে করাচির এই নতুন বিনোদনের ধারা এখন আর গোপন কোনও বিষয় নয়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপুনঃ ভোট গণনার দাবি জামায়াত প্রার্থীর
পরবর্তী নিবন্ধসরওয়ার জামাল নিজামকে মন্ত্রিপরিষদে রাখার দাবি