মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে ইরানে ঢুকে ভেঙে পড়া যুদ্ধবিমানের দুই পাইলটকে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছে আমেরিকা। আর তা করতে গিয়ে নিজেদের প্রায় ৯০০ কোটি টাকার দুটি যুদ্ধবিমান নিজেরাই ধ্বংস করে দিয়েছে তারা।
আমেরিকার এফ–১৫ই যুদ্ধবিমান ইরানে ভূপাতিত হওয়ার পর বিমানের দ্বিতীয় পাইলটকে উদ্ধারের জন্য অভিযান শুরু করে আমেরিকা। অন্যদিকে তাকে ধরার হুঁশিয়ারি আগেই দিয়ে রেখেছিল ইরান। ওই পাইলটকে উদ্ধার করতে ইরানের মরুভূমির উপরে অস্থায়ী এয়ারফিল্ড তৈরি করে ফেলে আমেরিকা। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয়, যখন সেই এয়ারফিল্ডে অবতরণের পরে অকেজো হয়ে পড়ে দুটি মার্কিন বিমান। সে সময় আমেরিকার অন্য যুদ্ধবিমান আসলে তারা ইরান ছাড়েন। ইরান ছাড়ার আগে অকেজো হয়ে পড়া সি–১৩০–র এমসি–১৩০জে কমান্ডো বিমানগুলো ধ্বংস করে বেরিয়ে আসেন তারা। ওই যুদ্ধবিমানের মূল্য প্রায় ১০ কোটি ডলার। গোপন কোনও তথ্য যাতে শত্রুপক্ষের হাতে না যায়, তাই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে। বিপক্ষের ভূমিতে ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে গেলে এটাই প্রোটোকল। এই আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলিতে অত্যাধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, নেভিগেশন প্রযুক্তি থাকে, যার মাধ্যমে শত্রুপক্ষ অনেক তথ্য বার করতে পারে। সে কারণেই মূল্যের কথা না ভেবে বিমানটি ধ্বংস করা হয়েছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। দেশটি স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধ চায়। গতকাল ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের স্থায়ী অবসান প্রয়োজন। ইরান অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান করে আর কিছু দাবি তুলেছে। যার মধ্যে রয়েছে অঞ্চলে সংঘাতের অবসান, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ পথের জন্য প্রোটোকল এবং ইরানের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। ইরানের আধা সরকারি গণমাধ্যম ইরনার খবরে বলা হয়েছে, তেহরান যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তা মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের কাছে এরই মধ্যে পাঠিয়েছে। প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তেহরান জানিয়েছে, সাময়িকভাবে নয়, স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধ না হলে এই সমস্যার কোন সমাধান হবে না। এই যুদ্ধবিরতি আলোচনার মধ্যেই ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত রয়েছে। এর পাল্টা জবাবও দিচ্ছে ইরান।
ট্রাম্পের আলটিমেটাম : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ইরানকে চুক্তিতে রাজি হতে মঙ্গলবার (আজ) রাত ৮টা পর্যন্ত যে আলটিমেটাম দিয়েছেন সেটাই চূড়ান্ত। ইরান যে প্রস্তাব দিয়ে তা যথেষ্ট নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুতে হামলার হুমকিও দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বলেছেন, আর বেশি আগাতে চায় না যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউসে গতকাল সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ‘তারা আত্মসমর্পণ না করলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের অবকাঠামোতে হামলা চালিয়ে যাবে। আর যদি তারা তা না করে, তাহলে তাদের কোনো সেতু থাকবে না। কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকবে না। কিছুই থাকবে না।’ তিনি আরও বলেছেন, তিনি এর বেশি এগোবেন না। কারণ এর থেকেও বড় আরো কিছু বিষয় আছে। ট্রাম্প বলেন, ‘আমার হাতে যদি সুযোগ থাকতো তাহলে আমি কী করতাম? আমি সেখান থেকে তেল নিয়ে আসতাম। কারণ নিয়ে আসার জন্যই ওখানে আছে। আমরা যদি সেটা করতে চাই, তাহলে তারা কিছুই করতে পারবে না।’ এরপরই তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমেরিকার জনগণ চায় আমরা দেশে ফিরে আসি। যদি আমার ওপর নির্ভর করত, আমি তাদের সব তেল নিয়ে নিতাম, সেটি নিজের কাছে রাখতাম। অনেক অর্থ উপার্জন করতাম এবং একই সঙ্গে ইরানের জনগণের দেখভালও করতাম। ইরানের উপর ব্যাপক বোমাবর্ষণ চলার মধ্যেই ট্রাম্প বলেন, এসব বোমাবর্ষণ বন্ধ হয়ে গেলে ইরানের লোকজনই সবচেয়ে অখুশী হবে।’
এদিকে গতকাল ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি’র গোয়েন্দা প্রধান মেজর জেনারেল মাজিদ খাদেমির হত্যার দায় স্বীকার করেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী বা আইডিএফ তাদের এক টেলিগ্রাম বার্তায় বলেছে, আইআরজিসি’র গোয়েন্দা প্রধান নিহত হওয়া ইরানের জন্য আরো একটি বড় ধাক্কা।
সামপ্রতিক যুদ্ধে ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের মৃত্যুর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বেশিরভাগ সময়ই ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র দায় স্বীকার করার পরই ইরান তা নিশ্চিত করেছে। তবে এবার ব্যতিক্রম ঘটেছে। ইরান নিজেই আগে খাদেমির নিহত হওয়ার খবর ঘোষণা করেছে। খাদেমি তার পূর্বসূরি মোহাম্মদ কাজেমি নিহত হওয়ার চার দিন পর আইআরজিসির গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। কাজেমি গত বছরের ১৫ই জুন ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন।
ইসরায়েলে হামলা : ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে। জেরুজালেম, তেল আবিব এবং এলিয়াতে এসব বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন বলছে, ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী ইরান থেকে নতুন দফায় আসা ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করার পর সতর্কতা সংকেত বাজানো হয়। এরপর এসব বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সূত্রের বরাত দিয়ে টাইমস অব ইসরায়েল বলেছে, এলিয়াতকে ইয়েমেন থেকে আসা ড্রোনের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ইসরায়েলের আরুৎজ সেভা মিডিয়া জানিয়েছে, ইরান, লেবানন এবং ইয়েমেন থেকে সমন্বিত হামলা চালানো হয়েছে।
অপরদিকে, ইরানের দুটি পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেঙে হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, সাউথ পার্স পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্ট ও মারভদাশত পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেঙকে হামলার লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে শত্রুরা। ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, হামলার পর পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেঙে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। যা কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। এই হামলা উল্লেখযোগ্য কোনো ক্ষতি হয়নি। এর আগে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে সাউথ পার্স পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্টে হামলা চালায় ইসরায়েল।
তবে জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করে হামলা ‘অবৈধ এবং অগ্রহণযোগ্য’ হবে বলে মন্তব্য করেছেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্টা। তিনি বলেন, বেসামরিক অবকাঠামো, বিশেষত জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করা অবৈধ এবং অগ্রহণযোগ্য।












