সাড়ে তিন হাজার কোটির বেশি টাকা ব্যয়ে নির্মিত চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পাইপলাইনে জ্বালানি তেল সরবরাহ দেড় মাসের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে ১১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কুমিল্লার বরুড়ার অত্যাধুনিক এবং স্বয়ংক্রিয় ডিপোটি পুরোপুরি তেলশূন্য হয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) নির্দেশনা না পাওয়ায় তিনটি তেল বিপণন কোম্পানি পাইপলাইনে কুমিল্লা ও ঢাকা অঞ্চলে তেল পাঠানো বন্ধ করে রেখেছে।
পরিবহন ব্যয় সাশ্রয় এবং সিস্টেম লসের নামে তেল চুরি বন্ধ করতে কোটি কোটি টাকা খরচ করে পাইপলাইন নির্মাণ করা হলেও তা কাজে না লাগানো নিয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হচ্ছে। অবশ্য বিপিসি বলেছে, অভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যার কারণে পাইপলাইনে তেল পরিবহন বন্ধ রাখতে হয়েছে। আজ উচ্চ পর্যায়ের একটি মিটিংয়ের পর তেল পরিবহনের দিনক্ষণ ঠিক করা হবে।
সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় জ্বালানি তেল সরবরাহের জন্য পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়। গত ১৬ আগস্ট পাইপলাইনটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল হয়ে ঢাকার ফতুল্লা পর্যন্ত ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনটিতে ইতোমধ্যে লক্ষ লক্ষ টন জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়েছে। কিন্তু গত মাস দেড়েক ধরে পাইপলাইনে জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। নৌপথে অয়েল ট্যাংকারে চাঁদপুর এবং ঢাকা অঞ্চলে জ্বালানি তেল পাঠানো হচ্ছে।
দেশের চাহিদার ৭০ লাখ টন জ্বালানির অন্তত ৩০ লাখ টন ব্যবহৃত হয় ঢাকা ও কুমিল্লা অঞ্চলে। এসব জ্বালানির বেশিরভাগ বেসরকারি অয়েল ট্যাংকারের মাধ্যমে নৌপথে পরিবাহিত হয়। ওখানে কোটি কোটি টাকার তেল চুরিসহ নানা ধরনের অপকর্ম ঘটে। ট্যাংকারে জ্বালানি তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে পয়েন্ট ১৭ শতাংশ সিস্টেম লস বিপিসি মেনে নেয়। বছর শেষে এই পয়েন্ট ১৭ শতাংশে দাঁড়ায়। সিস্টেম লস কিংবা তেল চুরির এই লোকসান থেকে জ্বালানি তেল সেক্টরকে বাঁচাতে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়। ৫০ লাখ টন ধারণক্ষমতার পাইপলাইনে বর্তমানে ৩০ লাখ টন জ্বালানি তেল সরবরাহ দেওয়া হবে। পাইপলাইনে জ্বালানি তেল চট্টগ্রাম থেকে গোদনাইলে নেওয়ার ক্ষেত্রে সিস্টেম লস শূন্যে নামিয়ে আনা এবং বছরে ২২৬ কোটি টাকার পরিবহন ব্যয় সাশ্রয়ের লক্ষ্যে পাইপলাইনটি নির্মাণ করা হয়।
এই পাইপলাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লার বারুড়া হয়ে জ্বালানি তেল যাবে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল এবং ঢাকার ফতুল্লায়। কুমিল্লার বরুড়ায় স্থাপন করা হয়েছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ অটোমেটেড ডিপো। সর্বাধুনিক এই ডিপো থেকে ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ সন্নিহিত অঞ্চলের প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হবে, যা এখন নৌপথে চাঁদপুরে পাঠানো হয়। এই ডিপোতে জ্বালানি তেল গ্রহণ এবং সরবরাহ সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হবে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে। তেলের ওজন, তাপমাত্রা, সরবরাহ সবই পরিচালিত হবে কম্পিউটারাইজড প্রযুক্তিতে। ম্যানুয়ালি কোনো কাজ হবে না। কিন্তু অত্যাধুনিক এই ডিপোটি বর্তমানে পুরোপুরি তেলশূন্য। গত ১৫ দিন এই ডিপো থেকে কোনো তেল সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হয়নি। চট্টগ্রাম থেকে পাইপলাইনে তেল সরবরাহ না দেওয়ায় বরুড়া ডিপো তেলশূন্য হয়ে পড়ে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইনের ২৪১ কিলোমিটার অংশে ১৬ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ বসানো হয়েছে, যা পতেঙ্গা থেকে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল পর্যন্ত বিস্তৃত। পাশাপাশি গোদনাইল থেকে ফতুল্লা ডিপো পর্যন্ত ৮.২৯ কিলোমিটার পৃথক ১০ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইন স্থাপন করা হয়েছে। বিপিসির একজন কর্মকর্তা জানান, ভূগর্ভস্থ এই পাইপলাইন ২২টি নদী ও খালের নিচ নিয়ে এসেছে এবং পুরো রুটে মোট ৯টি পাম্পিং স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে।
নৌপথে তেলবাহী ট্যাংকারে চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত তেল পরিবহনে অন্তত ২৪ ঘণ্টা সময় লাগে। নতুন পাইপলাইনের মাধ্যমে মাত্র ৪ ঘণ্টায় তেল পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত তেল পরিবহনে বিপিসির বার্ষিক খরচ হয় প্রায় ৩২৬ কোটি টাকা। কিন্তু পাইপলাইন চালু হলে খরচ হবে মাত্র ৯০ কোটি টাকা। ফলে বছরে অন্তত ২২৬ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। এছাড়া সিস্টেম লস এবং চুরি ঠেকানোর মাধ্যমে বছরে কোটি কোটি টাকা রক্ষা পাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু গত দেড় মাস ধরে এই পাইপলাইনে তেল দেওয়া হয়নি। ফলে আগের মতোই তেল পরিবহন করা হচ্ছে। চলছে সিস্টেম লসও।
এ বিষয়ে বিপিসির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, পাইপলাইনে জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়েছিল। বিশেষ করে মীরসরাইয়ে পাইপলাইন ফুটো করে তেল চুরির ঘটনার পর বিষয়টি আমাদের ভাবিয়ে তোলে। তিনি বলেন, এই পাইপলাইনে তেল পরিবহনের কার্যক্রম চট্টগ্রামের ডেসপ্যাচ টার্মিনালের স্ক্যাডা মাস্টার কন্ট্রোল স্টেশন থেকে নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনা করা হয়। স্ক্যাডা, টেলিকমিউনিকেশন এবং লিক ডিটেকশন করতে এই পাইপলাইনের সাথে অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল লাইন সংযুক্ত রয়েছে। কিন্তু ৮ জানুয়ারি মীরসরাইয়ে লাইন ফুঁটো করার ঘটনাটি কেন স্কাডা মাস্টার কন্ট্রোল স্টেশনে ধরা পড়ল না, কেন লিক ডিটেকশন সিগন্যাল পাওয়া গো না সেটি নিয়ে আমরা নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সাথে পুনরায় বৈঠক করেছি। তারা পাইপলাইনের আরো কিছু ত্রুটি– বিচ্যুতি চিহ্নিত করে। সব বিষয় ঠিক করার পর জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হবে। তিনি বলেন, মঙ্গলবার আমাদের একটি মিটিং রয়েছে। মিটিং থেকেই পাইপলাইনে জ্বালানি তেল সরবরাহ দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।












