বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের নগরী কক্সবাজার। আর এই পর্যটননগরীর ‘হৃদয়’ খ্যাত শ্বেত–শুভ্র পাথুরে সমুদ্র সৈকতের দ্বীপ প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি সেন্টমার্টিন। এটি দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। এই দ্বীপের মোহনীয় আবেশ মাতাল করে দেয় ভ্রমণ পিপাসুদের। কংক্রিটের নগরী ছেড়ে একটু শান্ত অবসরের জন্য এই দারুচিনি দ্বীপে ছুটে যেতে পাগলপারা দেশের লাখ লাখ মানুষ। কিন্তু সরকারি বিধিনিষেধ আর নানা সীমাবদ্ধতার কারণে গত বছরের মতো এবারও পর্যটকদের জন্য সেন্টমার্টিন ভ্রমণ বিলম্ব হয়েছে। তবে সব জল্পনা–কল্পনা আর প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ পহেলা ডিসেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য খুলে গেছে ‘স্বপ্নদ্বীপ’ সেন্টমার্টিনের দুয়ার!
সরকারি নির্দেশনা মতে, আজ থেকে আগামী জানুয়ারির শেষ দিন পর্যন্ত সেন্টমার্টিনে রাত্রিযাপন করতে পারবে পর্যটকরা। তবে সংখ্যা থাকবে দুই হাজারে সীমিত। তারই প্রেক্ষিতে আজ থেকে ভোর ৫টায় কক্সবাজার বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে পর্যটকদের নিয়ে সেন্টমার্টিন যাত্রা করবে তিনটি জাহাজ। একইসঙ্গে আরও ৪টি জাহাজ প্রস্তুত রয়েছে এবং প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষে সেগুলোও পর্যায়ক্রমে চলাচল শুরু করবে। এই জন্য জাহাজসহ সব ধরনের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হয় আগেই। অন্যদিকে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পর্যটকদের বরণ করতে প্রস্তুত রয়েছে সেন্টমার্টিনবাসী। প্রশাসন, জাহাজ মালিক এবং পর্যটকসেবীরা এই তথ্য জানিয়েছেন।
সেন্টমার্টিন রুটের পর্যটকবাহী জাহাজ মালিকদের সংগঠন ‘সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’–এর সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর গতকাল রাতে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আগামীকাল (আজ) থেকে কর্ণফুলী এক্সপ্রেস, এমভি বার আউলিয়া ও কেয়ারি সিন্দাবাদ এই ৩ টি জাহাজ যাত্রা শুরু করবে। ইতোমধ্যে যেসব পর্যটকরা টিকেট কেটেছেন জাহাজ কর্তৃপক্ষ তাদের ভ্রমণ অনুমতি সংগ্রহ করে দিচ্ছে। তিনটি জাহাজে যাত্রার আগমুহূর্ত পর্যন্ত পর্যন্ত টিকেট বিক্রি করা হবে। তাই প্রথম দিনে কত পর্যটক যাবে তা নিশ্চিত করা যাবে না। তবে দুই হাজার পূর্ণ হবে এটা নিশ্চিত। এছাড়া ঘাটে প্রস্তুত থাকা অপর ৪টি জাহাজ হলো– এমভি বে ক্রুজ, এমভি কাজল, কেয়ারি ক্রুজ অ্যান্ড ডাইন ও আটলান্টিক ক্রুজ।’ যাত্রী সংখ্যার বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘দুই হাজারের অধিক কোনো টিকেট বিক্রি করা হবে না। সরকারি সিদ্ধান্ত মেনেই চলবে জাহাজ।’
জাহাজ চলাচলের অনুমতির বিষয়ে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো. শাহিদুল আলম বলেন, ‘চারটি জাহাজ কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন নৌপথে চলাচলের জন্য জেলা প্রশাসন থেকে অনুমতি পেয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সেন্টমার্টিনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকারের জারি করা ১২টি নির্দেশনা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করবে জেলা প্রশাসন। আগে টেকনাফ থেকে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল করলেও নিরাপত্তার কারণে এখন কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া থেকে পর্যটকবাহী জাহাজ বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে সেন্টমার্টিন যাতায়াত করবে। তার জন্য সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন।’ অন্যদিকে দীর্ঘ নয় মাস পর পর্যটক গমণে বেশ খুশি হয়ে অপেক্ষায় রয়েছেন সেন্টমার্টিনবাসী। কেননা শুধু পর্যটন সংশ্লিষ্টরা নয়; নানাভাবে সেন্টমার্টিনের সব অধিবাসী পর্যটন শিল্পের সুবিধাভোগী। তাই দীর্ঘদিন পরে হলেও পর্যটক গমণ করায় খুশিতে আত্মহারা তারা।
এ ব্যাপারে সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, ‘পর্যটন ব্যবসাই আমাদের বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন, পর্যটকদের বরণে এখানকার মানুষ মুখিয়ে আছে। হয়তো অনেক সংকট আমাদের আছে তারপরেও দ্বীপবাসী আতিথেয়তায় কোনো কমতি রাখবে না।’
দ্বীপের হোটেল মালিক সংগঠনের নেতা আব্দুল মালেক বলেন, ‘পর্যটকেরা যেন আগের মতো থাকা–খাওয়াসহ সব ধরনের সুবিধা পায়, সেই লক্ষ্যে তারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পর্যটকদের আগমনের ওপরই নির্ভর করে নারকেল জিঞ্জিরার (সেন্টমার্টিনের অপর নাম) বেশিরভাগ মানুষের রুটিরুজি। তাই পর্যটকদের সেন্টমার্টিন ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন স্থানীয়রা।’
পর্যটকদের নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের পরিচালক মো. জমির উদ্দিন বলেন, ‘সেন্টমার্টিনে পর্যটক আসা–যাওয়ার সময় জাহাজগুলোকে কঠোর নজরদারিতে রাখা হবে। দুই হাজারের বেশি পর্যটক যেতে দেওয়া হবে না। এ জন্য নুনিয়ারছড়ার বিআইডব্লিউটিএ জেটিঘাট ও সেন্টমার্টিন জেটিঘাটে পৃথক তল্লাশির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’ এর আগে সেন্টমার্টিন দ্বীপের অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পরিবেশ–প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় গত ২২ অক্টোবর ১২টি নির্দেশনাসহ দ্বীপটিতে ভ্রমণের ব্যাপারে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে।
তথ্য অনুযায়ী, আগামী বছরের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে আবারও ৯ মাসের জন্য দ্বীপে পর্যটক যাতায়াত সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। তাই এবারের মৌসুমে দ্বীপে ভ্রমণের সময়সূচি এবং পর্যটক উপস্থিতিও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, পর্যটকদের ভ্রমণকালে রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো, শব্দ সৃষ্টি বা বারবিকিউ পার্টি করা নিষিদ্ধ। কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ বা ক্রয়–বিক্রয়, সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, রাজকাঁকড়া, শামুক–ঝিনুক ও অন্যান্য জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা কঠোরভাবে নিষেধ। এছাড়া সৈকতে মোটরসাইকেল, সি–বাইকসহ যেকোনো মোটরচালিত যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। ভ্রমণকালে নিষিদ্ধ পলিথিন বহন করা যাবে না। একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক– যেমন চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিক চামচ, স্ট্র, সাবান ও শ্যাম্পুর মিনিপ্যাক, ৫০০ ও ১০০০ মিলিলিটারের প্লাস্টিক বোতল ইত্যাদি বহন নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এছাড়া পর্যটকদের নিজস্ব পানির ফ্লাস্ক সঙ্গে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।












