মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে দেশের সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ কমানো হয়েছে। এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) ও কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো) এর সার উৎপাদন। আর বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় সারা দেশে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং শুরু হয়েছে।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, এই অবস্থায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) স্পট মার্কেট থেকে দুই কার্গো এলএনজি ক্রয়ের চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে এ ব্যাপারে বিডিং এ সাড়া পাওয়া গিয়েছে। আশা করা হচ্ছে এই এলএনজি পেলে এবং সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে পূর্বের মতো আবার গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় দেশে গ্যাস আমদানি ঝুঁকিতে পড়েছে। এই অবস্থায় সরবরাহ সংকটের কথা মাথায় রেখে পেট্রোবাংলা বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনে রেশনিং শুরু করেছে। গত বুধবার থেকে এই সরবরাহ রেশনিং শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক পত্রিকান্তরে বলেন, বিদ্যুৎ ও সারে রেশনিং করার জন্য আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা কমিয়েছি। তবে এরই মধ্যে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি ক্রয়ের জন্য পেট্রোবাংলা ৪ মার্চ ডাকা বিডিংয়ে দুই কার্গো এলএনজি ক্রয়ের ব্যাপারে সাড়া পেয়েছে। এটি হয়ে গেলে রেশনিং করার আর প্রয়োজন হবে না। এই দুটি কার্গো অস্ট্রেলিয়া ও ইউএসএ থেকে কেনা হবে। আমাদের আগামী ১৫ ও ১৮ মার্চের এলএনজি নিয়ে সমস্যা ছিল। এই দুই কার্গো পাওয়া গেলে সমস্যা আর থাকবে না।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুন ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে এবং ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। আর তার প্রভাব পড়ছে বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুদ্ধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সরবরাহে বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রভাব পড়তে পারে প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক পরিবহনে। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়েও রয়েছে আশঙ্কা। সব মিলিয়ে বাংলাদেশকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
পত্রিকায় প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে যুদ্ধের নানা দিক এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তুলে ধরা হয়েছে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। তাঁরা বলেন, ইরানের হরমুজ প্রণালি অবরোধের কারণে সরবরাহ ব্যাহত এবং পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ও তৈরি পোশাক রপ্তানি এই রুটের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কিছু জাহাজ আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে চলাচল করায় শিপিং ব্যয় ও সময় উভয়ই বাড়ছে। ফলে তৈরি পোশাক রপ্তানি ব্যয় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত এবং অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৫ থেকে ১১০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। মার্চ থেকে মে পর্যন্ত নির্ধারিত ২২টির মধ্যে ১৮টি এলএনজি কার্গো হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসার কথা থাকায় সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে তাঁরা উল্লেখ করেন। তাঁরা আরো আশঙ্কা করেন এই বলে যে, জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোতে তেল চলে যেতে পারে। তাই জ্বালানি তেলের পাচার রোধে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৈশ্বিক পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব ন্যূনতম পর্যায়ে রাখতে সম্ভাব্য সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেশে এখন বোরোর মৌসুম চলছে। ব্যাপক সেচের প্রয়োজন হবে। এ সময় যাতে ডিজেল ও সারের সংকট না হয়, সেদিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ বোরো উৎপাদন ব্যাহত হলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। আমরা আশা করি, সরকার সাফল্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষম হবে।








