গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, আগামী ২০৮০ সাল নাগাদ সমুদ্রতল ৯ থেকে ৪৮ সেন্টিমিটার এবং কার্বন নির্গমনের উচ্চহারে যে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে তার ফলে সমুদ্রতল ১৬ থেকে ৬৯ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়বে। ২০৮০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের ভূমির এক–তৃতীয়াংশ পানিতে নিমজ্জিত হবে। এর ফলে সমুদ্রের কাছাকাছি অঞ্চলগুলোর মনুষ বাস্তুভিটা হারাবে। নদ–নদীতে লোনা পানির পরিমাণ বেড়ে যাবে, বাড়বে শরণার্থীর সংখ্যা। ২০ থেকে ৩০ শতাংশ প্রজাতি বিলুপ্তির মুখে পড়বে এবং দেশে বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট বেড়ে যাবে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়বে, হেপাটাইটিস–বি, সংক্রামক ব্যাধি, মেনিনজাইটির মতো গ্রীষ্মকালীন রোগ বৃদ্ধি পাবে। সেই সঙ্গে সূর্যের বিকিরণকৃত আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মিও অনুপ্রবেশ বৃদ্ধির কারণে ত্বক ক্যান্সার ও চোখের ছানি পড়া রোগ বৃদ্ধি পাবে। এমনকি খাদ্যশস্যে তেজস্ক্রিয়তা বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে খাদ্যাভাব দেখা দেবে। এটা খুবই শংকারই কথা।
মানুষের সঙ্গে এই প্রকৃতির সম্পর্ক অতি নিবিড়। কারণ প্রকৃতির কোলেই মানুষের বসবাস। তাই প্রকৃতির ক্ষতি হলে মানুষেরও ক্ষতি হয়। আমরা আজ নানাভাবেই প্রকৃতির ক্ষতি করে চলেছি। আজ প্রাকৃতিক পরিবেশ ভয়াবহ দূষণের শিকার। এতে চরম বৈরী হয়ে উঠছে আবহাওয়া। পরিণামে বাড়ছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়, বাড়ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা। উষ্ণতার কারণে বরফ গলে যাচ্ছে হিমালয় এবং মেরু অঞ্চলের। এতে বাড়ছে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা। পরিণামে তলিয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর বিশাল নিম্নাঞ্চল। চট্টগ্রামের একটি বড় অংশও এর আওতাভুক্ত। পানি, বায়ু, শব্দদূষণ দিন দিন মাত্রা ছেড়ে যাচ্ছে। এতে হানা দিচ্ছে নানা রোগব্যাধি, ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। নষ্ট হচ্ছে খাদ্যশৃঙ্খল। বিনাশ হচ্ছে সভ্যতা। এ অবস্থা চলতে থাকলে মানব–অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে।
পরিবেশ আজ বড়ই বিপন্ন। পরিবেশ বিপন্ন হওয়ার ফলে দেখা দিচ্ছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়। মানবজীবনও হুমকিতে পড়েছে। পরিণামে জ্যামিতিক হারেই বাড়ছে পরিবেশ শরণার্থীর সংখ্যা।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, পাহাড়–পর্বত প্রকৃতি ও পরিবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। এটি পরিবেশ, অর্থনীতি ও মানবজীবনের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য ও বিশুদ্ধ পানির উৎস ধরা হয় পাহাড় ও পর্বতকে। পৃথিবী পৃষ্ঠের প্রায় ২৭ শতাংশে রয়েছে পাহাড় ও পর্বতমালা, যেখানে বসবাস করছে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ মানুষ। গাছপালা ও প্রাণীদের আশ্রয়স্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা এ পাহাড়গুলো জনসংখ্যার চাপ, নগরায়ণ ও শিল্পায়নের কারণে বিপর্যয়ের সম্মুখীন। শহরাঞ্চলের অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের কারণে এসব পাহাড়কে নির্বিচারে কাটা হচ্ছে, এতে বিনষ্ট হচ্ছে প্রকৃতির ভারসাম্য। পাহাড় কাটার ফলে বর্ষা মৌসুমে (জুন–আগস্ট) পাহাড়ধস এ অঞ্চলের অন্যতম একটি সমস্যা। পাহাড় কাটার মাটি দিয়ে বিভিন্ন নিম্নভূমি ভরাট, জমি ভরাট, ইটের ভাটা, সড়ক যোগাযোগ নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়, যা বিনষ্ট করছে প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য এবং ত্বরান্বিত করছে পরিবেশ বিপর্যয়। পাহাড় কাটার ফলে পাহাড়ি ভূমির ঢাল বৃদ্ধি পায়, মাটির বুনট হ্রাস পায়, গাছপালা মারা যায় এবং বৃষ্টির পানি মাটির গভীরে দ্রুত অনুপ্রবেশ করে। যেসব পাহাড় খাড়াভাবে কাটা হয় সেসব পাহাড়ে ধসের ঝুঁকির মাত্রাও বেশি থাকে। সামপ্রতিক সময়ে দেশে পাহাড় কাটা ও পাহাড়ধসজনিত হতাহতের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের টেকসই উন্নয়নের জন্য হুমকিস্বরূপ।
পরিবেশ বিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ এবং পরিবেশ দূষণের শিকার সচেতন জনগণের মতে, বৃক্ষ নিধন ছাড়াও প্রাণী বৈচিত্র্য রক্ষা না করা, রাসায়নিক সার ব্যবহার করা, কল–কারখানার বর্জ্য, পলিথিন ও পোড়া জ্বালানী, কালো ধোয়া, কীটপতঙ্গ ধ্বংস করা, বস্তির উদ্ভব, ঘনবসতি, ধূমপান, পানিতে মলমূত্র ও মৃত প্রাণীদেহ ফেলা, আর্সেনিক ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়ন, গাড়ীর হর্ণ ও মিলকারখানার শব্দ এবং অসচেতনতা ও শিক্ষার অভাব সর্বোপরি আইন অমান্য করা ও দেশপ্রেমের অভাবই পরিবেশ দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ হিসাবে কাজ করছে। তাই সময় থাকতেই পরিবেশ সুরক্ষায় সম্মিলিত প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে, আইনের যথাযথ প্রয়োগ হলে এবং সকলেই যার যার অবস্থান থেকে পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে কাজ করলে একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়া সম্ভব।








