প্লাস্টিক জমা দিলেই মিলবে রমজানের বাজার। নগরীতে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। গত ২ মার্চ দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, চট্টগ্রাম নগরীর পরিবেশ সুরক্ষা এবং পবিত্র রমজানে সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের সহায়তায় এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। নগরীর সরকারি কমার্স কলেজের সামনে স্থাপিত ‘প্লাস্টিক এক্সচেঞ্জ কর্নার’–এ ব্যবহৃত প্লাস্টিক বর্জ্যের বিনিময়ে মিলবে চাল, ডাল, তেল, চিনি ও ইফতার সামগ্রীসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ‘রমজানের বাজার’। ক্লিন বাংলাদেশের উদ্যোগে এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সার্বিক সহযোগিতায় গত রবিবার এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। উদ্বোধনী বক্তব্যে মেয়র বলেন, ‘প্লাস্টিক দূষণ আজ আমাদের নগরীর অন্যতম প্রধান সমস্যা। ড্রেন ও নালানর্দমা প্লাস্টিকে ভরাট হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। আমরা চাই রমজানে শহর পরিচ্ছন্ন থাকুক এবং দ্রব্যমূল্যের চাপে কেউ যেন কষ্ট না পায়। নাগরিকরা বাসায় জমে থাকা প্লাস্টিক বোতল বা বর্জ্য এখানে জমা দিয়ে পয়েন্ট সংগ্রহ করবেন। সেই পয়েন্টের বিনিময়ে তারা প্রয়োজনীয় বাজার ও ইফতার সামগ্রী নিতে পারবেন।’ আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, নির্দিষ্ট বুথে প্লাস্টিক বোতল বা সামগ্রী জমা দিলে ওজন অনুযায়ী ডিজিটাল কার্ড বা কুপনে পয়েন্ট যুক্ত হবে। সেই পয়েন্ট ব্যবহার করে কর্নারে সাজানো ‘রমজানের বাজার’ থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ করা যাবে।
এটি একটি প্রশংসনীয় ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। চট্টগ্রামের পাহাড়, প্রকৃতি ও পরিবেশ মহান স্রষ্টার অকৃত্রিম দান। বাগান–উদ্যান, পার্ক, সবুজ গাছপালা ও ফাঁকা খোলা জায়গা ইত্যাদি নাগরিকদের জন্য এক মৌলিক প্রয়োজনীয় চাহিদা। নগরবাসীর জন্য এটি এক মৌলিক অধিকারও বটে। নগর জীবনের কোলাহলময় ব্যতিব্যস্ত জীবনধারায় এইসব পার্ক বা উদ্যান ছোটো বড় সকলের জন্য শান্তিময় প্রাকৃতিক অবসর বিনোদন স্থল। এসব পার্ক বা উদ্যান নগরবাসীদের নন্দনতাত্ত্বিক স্বস্তি জোগায়, তাদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করে, আয়ু বৃদ্ধি করে, ভ্রমণ বিলাসী বক্তিদেরকে আকৃষ্ট করে, তাদের আনন্দ দান করে এবং তাদের নৈতিক মূল্যবোধ বজায় রেখে দৈহিক ও মানসিক বিকাশে সহায়ক হয়। বড় ধরনের সংকট এড়িয়ে, কংক্রিটসম পরিবেশের মাঝে এ পার্কগুলো শ্যামল মরু–উদ্যানের মতো স্বস্তি জোগায়। তাই পাহাড়, প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা করা নাগরিকদের দায়িত্ব। কিন্তু দুঃখের বিষয়, চট্টগ্রামের পাহাড় কাটা রোধ করা যাচ্ছে না, প্রকৃতি ও পরিবেশ আজ বিপন্ন প্রায়। এছাড়া প্লাস্টিক দূষণ আমাদের পরিবেশকে বিপর্যস্ত করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্ব আজ নানাধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে। তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং খরার মতো সমস্যাগুলো আমাদের জীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে আমাদের এই সবুজ পৃথিবী ক্রমশই মরুকরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় দুই বর্গকিলোমিটার এলাকাতে মরুকরণ হচ্ছে। বাংলাদেশেও এ সমস্যাগুলো প্রকট আকার ধারণ করছে। এ অবস্থায় পরিবেশ সুরক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তাঁরা বলেন, চলতি শতাব্দীতে পৃথিবী যে চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে তার মূল হলো বিশ্ব উষ্ণায়ন। বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্যে আবহাওয়া ও জলবায়ুতে পরিবর্তন আসার ফলে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৃক্ষনিধন বন্ধ ও বৃক্ষরোপণে কার্যকর ভূমিকা রাখলে এই পৃথিবী সত্যিই বাসযোগ্য থাকবে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, পরিবেশ সুরক্ষা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সম্ভব। বনাঞ্চল সংরক্ষণ, অবৈধ দখলদারিরোধ এবং পরিকল্পিত নগরায়ণ বাস্তবায়নের জন্য জনগণ, সরকার এবং পরিবেশবাদীদের যৌথভাবে কাজ করতে হবে। তাঁরা বলেন, উন্নয়নকে সব সময় পরিবেশের বিপরীতে দাঁড় করানো হয়েছে। আইন যথাযথ বাস্তবায়নের অভাবে পরিবেশ সুরক্ষা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও উদ্যোগ প্রয়োজন। নাগরিক সম্পৃক্ততা থাকলেও অনেকেই ভিন্ন ভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে আন্দোলন করছে। ফলে দেশে অনেক যুগোপযোগী ও অত্যাধুনিক আইন থাকলেও যথাযথ বাস্তবায়নের অভাবে তার সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। সুফল পেতে চাইলে সবাইকে একই কাতারে এসে কাজ করতে হবে। এর মাধ্যমে সরকারের প্রতি চাপ সৃষ্টি সহজ হবে।








