রমজান মোবারক। পবিত্র মাহে রমজান মাস সকল মুসলিম জাহানের জন্য অত্যন্ত পবিত্র মাস।এই মাসটিতে এবাদত বন্দেগীর পাশাপাশি খাওয়া– দাওয়া নিয়েও প্রত্যেক পরিবারকে বেশ মনোনিবেশ করতে হয়।
বিশেষ করে ইফতারী আইটেম। ইতিমধ্যে অনেকেই আমার কাছে জানতে চেয়েছেন ইফতারে কী ধরনের খাবার খাওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে আমার মতামত হচ্ছে, একমাস ব্যাপী আমাদের সিয়াম সাধনা করতে হবে। যার কারণে আমাদের দুইবেলা খাবার খেতে হবে। ইফতার এবং সেহেরী। নিয়মানুসারে সূর্যাস্ত ও সূর্য উদয়ের আগেই খাবার খাওয়া শেষ করতে হয়। অর্থাৎ রাতের মধ্যে দু‘বার খাবার খেতে হয়। এর মধ্যে কোনও ব্যায়াম, হাঁটাহাঁটি কিছুই করা হয় না । শুধু নামাজ আদায়ের সময় উঠাবসা হয়। তবে যাদের কোমড়, হাঁটুর ব্যথাবেদনা আছে, তারা বসে নামায আদায় করেন বিধায় তাঁদের নড়াচড়া হয় না বললেই চলে। তাই এই সময়কালে আমাদের খাবার তৈরি এবং কী ধরনের খাবার খাওয়া উচিত তা নিয়ে বিস্তারিত –
প্রথমে ইফতার দিয়ে শুরু করা যাক। ইফতার, ঘরে–বাইরে, পথে–প্রান্তরে কয়েকটি আইটেম সবাইকে বেশি আকৃষ্ট করে এবং প্রাণভরে খেতে দেখা যায়। যেমন– ছোলা, বুট, মুড়ি, পেঁয়াজু, আলুর চপ, বেগুনী, জিলাপি, হালিম, ফিরনি। এই খাবারগুলোর মধ্যে বেশিরভাগ ভাজাভুজি। যা খেলে সহজে হজম হয় না। পেটে গ্যাস জ্বালাযন্ত্রণা নিয়ে বেশিরভাগ মানুষ কষ্ট পায় এবং অনেক ক্ষেত্রে ফরজ রোজা ভাঙতে হয়। তাহলে কি ঐতিহ্যবাহী এসব খাবার বর্জন করবো? মোটেই না। শুধু মাত্র কিছু কৌশল অবলম্বন করলে আমরা পছন্দের খাবারগুলোর স্বাদ সহজেই নিতে পারি। ইফতারে একজনের হিসাব অনুসারে বলা যায়, একটি থালিতে একমুঠো মুড়ি, একমুঠো টালা চিনা বাদাম, একমুঠো সেদ্ধ করা ছোলা বুট, ১/৪ কাপ টক দই, এক টে: চামচ মধু, মিশিয়ে খাওয়া যায়। (পুদিনা, ধনিয়া পাতা, টমেটো পেস্ট, লেবুর রস, লবণ, ক্যাপসিকাম, সামান্য গুঁড় বা চিনি মিশিয়ে একটি সস তৈরী করে নেয়া যায়।) তৈরি করা করা সস এর সাথে একটি বেগুনী বা পেঁয়াজু বা তেলে ভাজা মুচমুচে যে কোন একটি খাবার খাওয়া যেতে পারে। পছন্দ মত ফল আধা কাপ ছোট কিউব কেটে খাওয়া যায়। সাথে এক গ্লাস বিশুদ্ধ পানি। অথবা বিটরুট, গাঁজর, শসা, টমেটো, আপেল, আংগুর, মাল্টা, লেবু, খেজুর এমন তিন চার রকমের সবজি ফলের সাথে দই মিশিয়ে এক গ্লাস স্মুদি’ তৈরি করে রোজা খুলে পান করতে পারলে খুব উপকার হবে। অনেকে রোজা খুলেন লেবুর সরবত পান করে। খালি পেটে এই সরবত অনেকের এসিডিটি হয়। তাই একটা খেজুর খেয়ে বাকী খাবার কিছুটা খেয়ে লেবুর সরবত পান করলে তেমন কোন সমস্যা হবে না। ইফতার দুইভাগে ভাগ করে খাওয়া ভালো। সামান্য কিছু খেয়ে রোজা খুলে বাকী খাবার নামাজের পর আস্তে আস্তে খাওয়া। এতে করে পেট ভারী হবে না, পেটে গ্যাস হবে না। অনেকে রাতে, ভোর রাতে দুই বার ভাত খায়। এটি অবশ্যই বর্জন করতে হবে। যাদের বেশি দুর্বল লাগে তারাবীর নামায শেষ করে একটা সেদ্ধডিম, একটা খেজুর, একগ্লাস উষ্ণ গরম পানি খেলে উপকার পাওয়া যাবে। ভোর রাতে, (সেহেরির সময়ে )। যতদূর সম্ভব মশলা কম হালকা, পাতলা রান্না করা মাছ, মাংস, সব্জি দিয়ে ভাত খাওয়া উচিত। প্রতিদিন দুধ কলা, ভাত নিয়ম করে না খেয়ে, দুধ কলার পরিবর্তে দই , কলা ভাত অনেক স্বাস্থ্যসম্মত। মোট কথা প্রতিদিন একই রকম ইফতার, সেহেরির খাবার না খেয়ে প্রতিদিন রদবদল করে খেলে খাবারের স্বাদ পাওয়া যাবে। স্বাস্থ্যসম্মত পুষ্টিকর খাবার পছন্দ করতে হবে। পানি, সরবত, পানীয় জাতীয় খাবার খেয়ে সারাদিনের পানি ঘাটতি পূরণ করতে হবে। এতে করে শরীর ও মন ঝরঝরে থাকবে এবং এবাদত করতেও আরামদায়ক হবে। তবে একটা কথা না বললেই নয়। এখন তেহেরী, ওরশ বিরিয়ানি, আখনি বিরিয়ানি পথে– প্রান্তের খাবারের দোকানগুলোতে ইফতার বেচাকেনার পাশাপাশি মাঝরাত অবদী বিক্রি হতে থাকে। এসব খাদ্যগুলো কতটা নিরাপদ রোজাদার দের জন্য, এটি ভাববার বিষয়। বিশেষ করে যারা হার্ট, ডায়েবেটিস, লিভার, কিডনির সমস্যা নিয়ে আছেন তাঁদের জন্য এসব খাবার অবশ্যই ক্ষতিকর। তাই ঘরের এবং বাইরের ইফতার ও সেহেরির খাবার তৈরি এবং পরিবেশন যেনো স্বাস্থ্যসম্মত হয়, এটির প্রতি সকলের দৃষ্টি থাকা একান্ত প্রয়োজন। আল্লাহ সবাইকে হেদায়েত দান করুন।
লেখক: রন্ধনশিল্পী– প্রশিক্ষক ও গবেষক।










