পবিত্র রমজান: আত্মশুদ্ধির আহ্বান ও মানবিক পুনর্জাগরণ

মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম | বৃহস্পতিবার , ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৪১ পূর্বাহ্ণ

সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য, যিনি পরম করুণাময়। সালাম ও বরকত বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম), তাঁর পরিবারবর্গ এবং তাঁর সাহাবীগণের উপর।

মানুষের জীবন আজ এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। চারপাশে প্রযুক্তির অগ্রগতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও ভোগের অসংখ্য উপকরণ তবুও মানুষের অন্তরে প্রশান্তি নেই। অস্থিরতা, হতাশা, অসহিষ্ণুতা ও নৈতিক ক্লান্তি যেন আধুনিক জীবনের স্থায়ী সঙ্গী হয়ে উঠেছে। ব্যক্তি হিসেবে মানুষ যত ব্যস্ত হচ্ছে, ততই সে নিজের ভেতরের মানুষটিকে হারিয়ে ফেলছে। ঠিক এই বাস্তবতায় পবিত্র রমজান মাসের শুভ আগমন মানবজীবনে আসে এক গভীর আত্মিক বিরতি হিসেবে আসে যা মানুষকে থামতে শেখায়, ভাবতে শেখায় এবং নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার আহ্বান জানায়।

রমজান কোনো আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় উৎসব নয়, কিংবা শুধু কয়েকটি নির্দিষ্ট ইবাদতের সমষ্টিও নয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ আত্মশুদ্ধির কর্মসূচি। আল্লাহ তায়ালা এই মাসকে নির্ধারণ করেছেন মানুষের মৌলিক বৈশিষ্ট্য সংযম, সচেতনতা ও দায়িত্ববোধের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উপবাসের মাধ্যমে মানুষ শুধু খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকে না; বরং সে নিজেকে শেখায় কীভাবে বৈধ চাহিদার উপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়। এই শিক্ষাই মানুষকে অবৈধ, অন্যায় ও ক্ষতিকর প্রবণতা থেকে দূরে রাখার মানসিক শক্তি জোগায়।

রমজানের মূল দর্শন হলো আত্মসংযম। আধুনিক সমাজে সংযম যেন দুর্বলতার নামান্তর হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভোগবাদী সংস্কৃতি মানুষকে শেখায় যা ইচ্ছা, যখন ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা ভোগ কর তাতে আছে সাফল্য। কিন্তু রমজান এই ধারণার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করে সংযমই প্রকৃত শক্তি। যে ব্যক্তি নিজের ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সেই প্রকৃত অর্থে স্বাধীন। এই আত্মসংযম মানুষকে শুধু ধর্মীয়ভাবে নয়, মানসিক ও সামাজিকভাবেও পরিণত করে।

রমজানের উপবাস মানুষকে ধৈর্যের শিক্ষা দেয়। আধুনিক জীবনে মানুষ সবকিছু তাৎক্ষণিকভাবে পেতে অভ্যস্ত। ক্ষুধা লাগলে খাবার, ক্লান্তি এলে বিনোদন, ইচ্ছা জাগলে ভোগ এই তাৎক্ষণিক তৃপ্তির সংস্কৃতি মানুষের সহনশীলতা নষ্ট করছে। রমজানে ইফতারের মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করা মানুষকে শেখায় সব তৃপ্তি তাৎক্ষণিক নয়, কিছু তৃপ্তি অর্জনের জন্য অপেক্ষা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। এই শিক্ষা ব্যক্তিত্ব গঠনে গভীর ভূমিকা রাখে।

রমজান কেবল ব্যক্তিগত চরিত্র গঠনের মাস নয়; এটি সামাজিক চেতনারও পুনর্জাগরণ ঘটায়। একজন রোজাদার যখন ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট অনুভব করে, তখন সে সমাজের দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। এই অভিজ্ঞতা তার হৃদয়ে সহমর্মিতা জাগিয়ে তোলে। তাই দেখা যায়, রমজান মাসে দান, সদকা, জাকাত ও ফিতরার মাধ্যমে সমাজে এক মানবিক স্রোত প্রবাহিত হয়। এটি কোনো দয়ার প্রদর্শন নয়; বরং সামাজিক দায়িত্ব পালনের বাস্তব প্রয়োগ।

আজকের বিশ্বে অর্থনৈতিক বৈষম্য একটি গভীর সংকটে পরিণত হয়েছে। অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে বিপুল সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, আর বিপুলসংখ্যক মানুষ মৌলিক চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে। রমজান এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক নৈতিক অবস্থান নেয়। ইসলামী দর্শনে সম্পদ ব্যক্তির একক মালিকানা নয়; বরং এতে সমাজের অন্যদের অধিকার রয়েছে। এই উপলব্ধিই রমজানকে অর্থনৈতিক ন্যায়বোধের মাসে পরিণত করে।

রমজানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আত্মজবাবদিহি। রোজা মানুষকে শেখায় আইন বা সামাজিক নজরদারি না থাকলেও আল্লাহর সামনে সে দায়বদ্ধ। দিনের বেলায় একাকী অবস্থায়ও খাবার গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত মানুষের ভেতরে একটি গভীর নৈতিক সচেতনতা তৈরি করে। এই অভ্যন্তরীণ জবাবদিহির বোধই প্রকৃত নৈতিকতার ভিত্তি। সমাজে আইন থাকতে পারে, শাস্তির ব্যবস্থাও থাকতে পারে; কিন্তু অন্তরের জবাবদিহি না থাকলে নৈতিকতা টেকসই হয় না। রমজান এই অভাব পূরণের এক অনন্য সুযোগ।

পবিত্র রমজানের আরেকটি তাৎপর্য পূর্ণ দিক হচ্ছে এ পবিত্র মাসে নাজিল হয়েছে আলকুরআন যেটি মানবজাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ পথনির্দেশক। তাই রমজান শুধু উপবাসের মাস নয়; এটি কুরআনের সাথে সম্পর্ক নবায়নের মাস। কুরআন মানুষকে ন্যায়, সততা, ধৈর্য, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দেয়। আধুনিক বিশ্বের সংকটগুলো যেমন দুর্নীতি, সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা ও নৈতিক অবক্ষয় মূলত এই মূল্যবোধগুলোর অভাব থেকেই জন্ম নিয়েছে। রমজান মানুষকে সেই মূল্যে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেয়।

রমজানের রাতগুলো আত্মিক জাগরণের বিশেষ সময়। দিনের ব্যস্ততা ও ক্লান্তির পর তারাবির নামাজে দাঁড়ানো, কুরআন তিলাওয়াতে মনোনিবেশ করা এবং নিরিবিলি রাতে নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া, এসব মানুষের আত্মাকে নরম করে। বিশেষ করে লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধান মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় একটি রাতও জীবন বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, যদি তা আন্তরিক আত্মসমর্পণের হয়।

তবে বাস্তবতা হলো, আমরা অনেক সময় রমজানকে তার মূল দর্শন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলি। ইফতারের বাহারি আয়োজন, অতিভোজন, অপচয় ও ভোগের প্রতিযোগিতা রমজানের সংযমের শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক। যেখানে রমজান শেখায় সরলতা, সেখানে আমরা অনেক সময় একে ভোগের মাসে পরিণত করি। এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে রমজানের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করাই আজ সময়ের দাবি।

রমজান আমাদের শেখায় উন্নয়ন কেবল ভোগ বৃদ্ধির নাম নয়; বরং নৈতিক উন্নয়নই টেকসই অগ্রগতির ভিত্তি। ব্যক্তি যদি নৈতিকভাবে শুদ্ধ না হয়, তবে সমাজ ও রাষ্ট্র কখনোই ন্যায়ভিত্তিক হতে পারে না। তাই রমজানের পরিবর্তন শুরু হয় ব্যক্তি থেকে, কিন্তু তার লক্ষ্য সমাজ।

সবশেষে বলা যায়, রমজান একটি মাস নয়, এটি নিজেকে শুদ্ধ করার, সম্পর্কগুলো সংশোধনের এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ব নতুন করে উপলব্ধি করার সুযোগ। যদি আমরা এই মাসের শিক্ষাকে শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে জীবনব্যাপী ধারণ করি, তবে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র সবাই উপকৃত হবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধতারেক রহমানের ক্যারিশমাটিক নেতৃত্বে বিএনপি’র ভূমিধস বিজয়
পরবর্তী নিবন্ধমীরসরাইয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ৮ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা