মাহে রমজানে আল্লাহর অতি সন্নিকটে যাওয়ার আমল হলো ইতেকাফ। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে নিজ কুদরতি হাতে সৃষ্টি করা বান্দার প্রতি ভালোবাসাস্বরূপ এমন কিছু আমল দিয়েছেন যার একটি রমজান। এই রমজানকে আল্লাহ মহিমান্বিত করে তুলেছেন বিশেষ কিছু নির্দিষ্ট দিনের মাধ্যমে। রাসুল সাঃ এই বিষয়ে এরশাদ করেন, যখন রোজাদার আল্লাহর ভয়ে সারাদিন পানাহার থেকে বিরত থাকে এবং ইফতার সামনে থাকা সত্ত্বেও সময় হওয়ার আগে মুখে দেয় না। এটি হলো তাকওয়ার সর্বোচ্চ নিদর্শন এবং মহান আল্লাহর নিকট একজন মুমিন এর বৈশিষ্ট্য। হাদীসে কুদসীতে মহান আল্লাহ তায়ালা বান্দার এ রকম আচরণ দেখে আসমানে ফেরাশতাদের সামনে গর্ব করে বলেন, তোমরা নিষেধ করছো, আজ দেখ আমার বান্দা আমাকে কী রকম ভালোবাসে ও কী রকম ভয় করে’। আসুন জেনে আসি মাহে রমজানের সে মহিমান্বিত দিনগুলো সম্পর্কে। বিশেষত ইতিকাফ নিয়ে।
পবিত্র রমজানের শেষ ১০ দিনের (২০ রমজান সূর্যাস্তের পর থেকে) ইতেকাফ হলো নাজাত বা মুক্তি লাভের শ্রেষ্ঠ সময়, যা সুন্নতে মুয়াক্কাদায়ে কেফায়া। এটি মূলত পবিত্র লাইলাতুল কদর তালাশ এবং মহান আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্য লাভের জন্য মসজিদে অবস্থান করা। এই ইবাদত রমজানের শেষ দিন বা শাওয়ালের চাঁদ দেখা পর্যন্ত চলমান থাকে এটি বিশেষ করে রমজানের শেষ দশকে করা সুন্নাত।
ইতেকাফ শব্দের আভিধানিক অর্থ অবস্থান করা বা আবদ্ধ থাকা। পরিভাষিক অর্থ: ইসলামী পরিভাষায় মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ইবাদতের উদ্দেশ্যে জাগতিক সব ব্যস্ততা ত্যাগ করে নির্দিষ্ট সময়ে মসজিদে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলে।
রমজানের শেষ দশ দিন পালন করা সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ কিফায়াহ। অর্থাৎ, গ্রামের বা মহল্লার অন্তত একজন ব্যক্তি এই ইতেকাফ পালন করলে সবার পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যায়, অন্যথায় পুরো মহল্লার সবাই সুন্নাত তরকের (পরিত্যাগের) দায়ে দায়ী থাকবে। তবে মানত করলে ওয়াজিব হয়।
ইতেকাফের প্রকারভেদ: সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ কিফায়াহ: রমজানের ২০তারিখ সূর্যাস্তের পূর্ব থেকে ঈদের চাঁদ দেখা পর্যন্ত মসজিদে ইতেকাফ করা। ওয়াজিব ইতেকাফ: মানত বা কসম করলে (যেমন:আমার কাজটা হলে ১০ দিন ইতেকাফ করব) সেই ইতেকাফ করা ওয়াজিব। নফল ইতেকাফ: রমজান ছাড়া অন্য সময়ে বা রমজানের শেষ দশকের কম সময়ে ইতেকাফ করা । ইতেকাফ বিষয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা বর্ণনা করেন যে, ‘আর যতক্ষণ তোমরা ইতিকাফ অবস্থায় মসজিদ সমূহে অবস্থান কর ততক্ষণ পর্যন্ত স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা কর না…’ সুরা বাকারাহ আয়াত নং ১৮৭
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রতি রমজানে দশ দিন ইতিকাফ করতেন। কিন্তু যে বছর তিনি ইন্তেকাল করেন, সে বছর তিনি বিশ দিন ইতিকাফ করেছিলেন-(বোখারী, হাদীস নং২০২৬)। নবী (সা.) আমৃত্যু রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন। স্থান: পুরুষদের জন্য মসজিদ এবং নারীদের জন্য ঘরের নির্দিষ্ট স্থানে।
নামাযের মতো ইতেকাফ এরও কাজা আছে। কাজা কেমনে করবে? রাসুল (সা🙂 কোনো কারণে ইতেকাফ করতে না পারলে পরবর্তী বছর ২০ দিন ইতেকাফ করে তা পূরণ করতেন। (সুনান আবু দাউদ হাদিস নং ২৪৬৮)
লক্ষ্য: ইতেকাফের মূল উদ্দেশ্য হলো দুনিয়ার সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হওয়া এবং লাইলাতুল কদরের ফজিলত অর্জন করা। ফজিলত: রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রতি রমজানে শেষ দশকে ইতেকাফ করতেন । এটি রমজানের শেষ ১০ দিনের ইবাদতের একটি অন্যতম আমল, যা নাজাতের মাধ্যম।
হুকুম: এটি একটি সুন্নতে মুয়াক্কাদায়ে কেফায়া আমল, অর্থাৎ এলাকার পক্ষ থেকে কেউ করলে সবার দায়িত্ব আদায় হয়ে যায়, আর কেউ না করলে সবাই গুনাহগার হবে।
আমল: ইতেকাফ অবস্থায় কুরআন তেলাওয়াত, জিকির, দোয়া ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইতে হয়।
সর্বোপরি, রমজানের নাজাতের এই দিনগুলোতে আল্লাহর সান্নিধ্য পেতে ইতেকাফের বিকল্প নেই।
লেখক: প্রধান শিক্ষক, কদম মোবারক মুসলিম এতিম খানা হেফজ বিভাগ।












