পবিত্র জুমার দিনের ফজিলত, মাহাত্ম্য ও বিশেষ আমল

ফখরুল ইসলাম নোমানী | শুক্রবার , ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৫:৫৯ পূর্বাহ্ণ

জুমার দিন জুমার নামাজের জন্য যে যত তাড়াতাড়ি মসজিদে আসবে সে তত বেশি সওয়াব পাবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন জুমার দিন আসে ফেরেশতারা মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে প্রথম থেকে পর্যায়ক্রমে আগন্তুকদের নাম লিখতে থাকে। যে সবার আগে আসে সে ওই ব্যক্তির মতো যে একটি উট সদকা করে। তারপর যে আসে সে ওই ব্যক্তির মতো যে একটি গাভী সদকা করে। তারপর আগমনকারী মুরগি সদকাকারীর মতো। তারপর আগমনকারী একটি ডিম সদকাকারীর মতো। এরপর যখন ইমাম খুতবা দিতে বের হন তখন ফেরেশতারা তাদের দপ্তর বন্ধ করে দেন এবং মনোযোগ দিয়ে খুতবা শুনতে থাকেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহর নিকট সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন হলো জুমা। এই মহামূল্যবান দিনের রয়েছে কিছু বিশেষ আমল যা মুসলমানের ঈমান, আত্মিক পবিত্রতা ও সামাজিক ঐক্যকে সমুন্নত করে ও ইসলামে জুমার দিনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র কোরআনে জুমার দিন দ্রুত মসজিদে গমনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে হে মুমিনরা! জুমার দিন নামাজের আজান হলে তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং বেচাবিক্রি বন্ধ করো তা তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা বুঝো। এরপর নামাজ শেষ হলে ভূপৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা) অনুসন্ধান করো এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো যাতে তোমরা সফলকাম হও। জুমার দিন দোয়া কবুল হয় জুমার দিন একটি সময় আছে যখন মানুষ আল্লাহর কাছে কোনো দোয়া করলে আল্লাহ তা কবুল করেন। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেন, জুমার দিন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে ভালো কিছুর দোয়া করলে আল্লাহ তাকে তা দেন। তোমরা সময়টি আসরের পর অনুসন্ধান করো। (সুরা : জুমা : আয়াত : ১০)। জুমার দিনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আমল তুলে ধরা হলো :

. উত্তমভাবে গোসল করা ২. সুন্দর পোশাক পরা ও সুগন্ধি ব্যবহার করা ৩. আগে আগে মসজিদে যাওয়া ৪. সূরা কাহফ তেলাওয়াত করা ৫. বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ করা এবং ৬. মনোযোগ সহকারে খুতবা শোনা ও দোয়া করা যা এই বরকতময় দিনে সওয়াব বৃদ্ধি ও গুনাহ মাফের বিশেষ সুযোগ এনে দেয়।

গোসল, সুগন্ধি ও পরিষ্কার পোশাক পরিধান : জুমার দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ হলো গোসল করা, সুন্দর পোশাক পরা ও সুগন্ধি ব্যবহার করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের জন্য জুমার দিনের গোসল করা অপরিহার্য। আরেক হাদিসে এসেছে যে ব্যক্তি জুমার দিনে গোসল করে সুগন্ধি ব্যবহার করে মসজিদে যায় এবং ইমাম খুতবা দেয়ার সময় মনোযোগ সহকারে শোনে তার গত জুমা থেকে এ জুমা পর্যন্ত গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। ইমাম নববী (রহ.) বলেন, এ হাদিস প্রমাণ করে যে জুমার গোসল ও পরিচ্ছন্নতা শুধু শরীর নয় আত্মিক প্রস্তুতিরও প্রতীক।

জুমার দিনের বিশেষ মর্যাদা: আবু লুবাবা বিন আবদুল মুনজির (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিনের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। সেগুলো হলো এক. আল্লাহতাআলা এই দিনে আদম (.) কে সৃষ্টি করেছেন। দুই. আল্লাহতাআলা এই দিনে আদম (.) কে জমিনে অবতরণ করিয়েছেন। তিন. এই দিনে আদম (.) কে মৃত্যু দিয়েছেন। চার. এই দিনে এমন একটি সময় আছে যখন বান্দা আল্লাহর কাছে যা কিছুই প্রার্থনা করবে তিনি তা দেবেন। যতক্ষণ সে হারাম কিছু প্রার্থনা করবে না। পাঁচ. এই দিনে কিয়ামত সংঘটিত হবে।

জুমার নামাজ আদায় : সালমান ফারসি থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেন যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করল সাধ্যমতো পবিত্র হলো তেল ব্যবহার করল ঘর থেকে সুগন্ধি ব্যবহার করল অতঃপর মসজিদে এলো সেখানে দুজন মুসল্লির মধ্যে ফাঁক করে সামনে এগিয়ে যায় না নির্দিষ্ট পরিমাণ নামাজ পড়ল অত:পর ইমাম কথা শুরু করলে চুপ থাকল তাহলে আল্লাহতাআলা তাঁর দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ মাফ করবেন। অন্য হাদিসে এসেছে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা এক রমজান থেকে পরবর্তী রমজান মধ্যবর্তী সময়ের পাপ মোচন করে যদি সেই ব্যক্তি সব ধরনের কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকে।

দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত : জুমার দিন দোয়া কবুল হয় জুমার দিন একটি সময় আছে যখন মানুষ আল্লাহর কাছে কোনো দোয়া করলে আল্লাহ তা কবুল করেন। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেন জুমার দিন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে ভালো কিছুর দোয়া করলে আল্লাহ তাকে তা দেন। তোমরা সময়টি আসরের পর অনুসন্ধান

করো। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেছেন জুমার দিনের বারো ঘণ্টার মধ্যে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে যদি কোনো মুসলিম এ সময় আল্লাহর কাছে কিছু প্রার্থনা করে তাহলে মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাকে দান করেন। এই মুহূর্তটি তোমরা আছরের শেষ সময়ে অনুসন্ধান করো।

সুরা কাহাফ পাঠ : জুমার অন্যতম আমল সুরা কাহাফ পাঠ করা। আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ পড়বে তা দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ে তার জন্য আলোকিত হয়ে থাকবে। আর যে ব্যক্তি এই সুরার শেষ ১০ আয়াত পাঠ করবে অত:পর দাজ্জাল বের হলে তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।

গুনাহ মাফ হয় : সালমান ফারসি থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করল সাধ্যমতো পবিত্র হলো তেল ব্যবহার করল ঘর থেকে সুগন্ধি ব্যবহার করল অত:পর মসজিদে এলো সেখানে দুজন মুসল্লির মধ্যে ফাঁক করে সামনে এগিয়ে যায় না নির্দিষ্ট পরিমাণ নামাজ পড়ল অত:পর ইমাম কথা শুরু করলে চুপ থাকল তাহলে আল্লাহতাআলা তাঁর দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ মাফ করেন।

দরুদ পাঠ : জুমার দিন নবীজি (সা.) এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা কর্তব্য। আউস বিন আবি আউস (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেছেন তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিন সর্বোত্তম। কোনো জাতি এক মজলিসে বসলো অথচ তারা সেখানে না আল্লাহর কথা আলোচনা করলো, না তারা তাদের নবির প্রতি দরূদ পড়লো। এতএব এটি হবে তাদের জন্য হতাশার কারণ আল্লাহতাআলা চাইলে তাদেরকে শাস্তি দিতে পারেন আবার দেরকে ক্ষমাও করতে পারেন। সুতরাং মুমিন মুসলমানের উচিত হাদিসের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী সপ্তাহের সেরা দিন জুমার দিন নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি বেশি বেশি দরূদ পড়া। দরূদ আমলে নিজেদের আমল ও ঈমানকে পরিপূর্ণ করা।

দোয়ায় মশগুল হওয়া : আল্লাহর দরবারে দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনায় মগ্ন হওয়া জুমার দিনের গুরুত্বপূর্ণ আমল। এ দিনের একটি বিশেষ মুহূর্তে আল্লাহ দোয়া কবুল করেন। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.)-থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.)-বলেন জুমার দিনের ১২ ঘণ্টার মধ্যে একটি বিশেষ মুহূর্ত এমন আছে যখন মুমিন আল্লাহর কাছে যে দোয়াই করবে তিনি তা কবুল করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি অবহেলার কারণে তিনটি জুমা ছেড়ে দেয় আল্লাহ তার অন্তরে সীল মেরে দেন। জুমার দিন ইসলামি জীবনব্যবস্থার এক মহিমান্বিত দিন। এটি সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন, রহমত, মাগফিরাত ও বরকতের দিন। এই দিনকে কেন্দ্র করে কোরআন ও হাদিসে বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদা ঘোষণা করা হয়েছে। জুমার দিন সপ্তাহের ঈদের দিন। ইসলামে এ দিনের মর্যাদা রয়েছে। আল্লাহতাআলা মুসলিম উম্মাহকে নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি বেশি বেশি দরূদ পড়ার তাওফিক দান করুন। যে ব্যক্তি জুমার দিন আসরের নামাজের পর ৮০ বার এ দরুদ পড়বেউচ্চারণ : আল্লাহুম্মা সাল্লি আ’লা মুহাম্মাদিনিন নাবিয়্যিল উম্মিয়্যি ওয়া আ’লা আলিহি ওয়া সাল্লিম তাসলিমা। তার ৮০ বছরের গোনাহ্‌ মাফ হবে এবং ৮০ বছর ইবাদতের সওয়াব তার আমলনামায় লেখা হবে। সুবহানাল্লাহ! আমিন! লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসুন্দর চরিত্র মানসিক শান্তির একমাত্র অবলম্বন
পরবর্তী নিবন্ধরাজনীতির বলি ক্রিকেট: বিশ্বকাপে নেই বাংলাদেশ