পনের আগস্ট : এক ভয়ানক স্তব্ধতার রাত্রি

ড. শিরীণ আখতার | মঙ্গলবার , ১৫ আগস্ট, ২০২৩ at ৯:১৬ পূর্বাহ্ণ

আগস্ট মানেই বাঙালির শোকের মাস। কান্নাভেজা অশ্রুসিক্ত রক্তাক্ত অধ্যায়ের অন্য নাম ১৫ আগস্ট। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কময় রাত এটি। ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ দুটি নাম, একটি ইতিহাস। উভয়ে যেন মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। একটি ছাড়া অন্যটি যেন মূল্যহীন। দুটি শব্দ একে অপরের পরিপূরক, যা আজ ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। যুগে যুগে কিছু মহাপুরুষ পৃথিবীতে আসেন কোনো কোনো জাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে। বঙ্গবন্ধুও তেমনি একজন। মহাপুরুষদের মধ্যে মানবিকতা ও সরলতা এ দুটি গুণ অতিমাত্রায় থাকে, যার কারণে দেশ এবং দেশের মানুষের প্রতি থাকে তাদের সীমাহীন দরদ, আস্থা ও ভালোবাসা। বঙ্গবন্ধুরও ছিল তেমনি। এই আস্থা ও ভালোবাসা যেমন জাতির জন্য মঙ্গল বয়ে এনেছিল আবার তেমনি তার নিজের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। এমন অসীম ক্ষমতার অধিকারী মানুষ বাংলাদেশে আর একজনও জন্মগ্রহণ করেননি।

বস্তুত পঁচাত্তরের পনেরই আগস্ট বাংলাদেশ নামক কল্যাণ রাষ্ট্রটির হত্যারই একটি অপচেষ্টা, ঘাতকের এটা জানা ছিল যে বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকতে সামরিক সন্ত্রাস, উগ্রমৌলবাদ আর সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যের বাংলাদেশ তৈরি সম্ভব নয়। বাংলাদেশ দশকের পর দশক ধুঁকে ধুঁকে মরেছে। আর আকাশে ধ্বনিত হয়েছে খুনিদের উল্লাস ও আস্ফালন। তাই বাঙালি জাতীয়তাবাদের মতো লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত রাষ্ট্র বাংলাদেশেরও মৃত্যুঘণ্টা বাজানোর চেষ্টা হয় ওই দিন। বাংলাদেশের ভিত্তি যে শাসনতন্ত্র তা ভূলুণ্ঠিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয় তখনই। তাই একুশ বছর হীন চক্রান্ত করে ঠেকিয়ে রাখা হয় আওয়ামী লীগকে। একাত্তরের ঘাতকদেরকে বসানো হয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতায়। তাই এই অমানবিক হত্যাকাণ্ডকে বাংলাদেশের হত্যাকাণ্ডই বলা চলে। বাংলাদেশের মূলনীতিগুলোকে হত্যা করার অপচেষ্টা। পঁচাত্তরের ঘাতকদের প্রকৃত লক্ষ্য ছিল বাঙালি ও বাংলাদেশকে অভিভাবকহীন করা।

বাংলার হাজার বছরের ইতিহাসে লাখ কোটি ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করেছেন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু এদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু ব্যতিক্রম। নিজ কর্মগুণে মহত্ত্বের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যিনি পৌঁছেছিলেন। বিশ্ব ইতিহাসে যে কজন নেতার নাম সগর্বে উচ্চারিত হয় বঙ্গবন্ধু তাদের অন্যতম। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন, চীনের মাও সেতুং, ভিয়েতনামের হো চি মিন, ভারতের মহাত্মা গান্ধী, দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা, কিউবার ফিদেল ক্যাস্ট্রো রাজনীতিক হিসেবে নিজ নিজ নেতৃত্বের ক্ষেত্রে যেমন সফল, তেমনি বঙ্গবন্ধুও নিজ নেতৃত্বগুণে বাঙালি জাতির জন্য একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সফল হয়েছেন। বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে অনেক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তবে নানা কারণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডটি ছিল বিশ্বে আলোচিত। ফিদেল কাস্ট্রো তাঁর মৃত্যুতে বলেছিলেন, শেখ মুজিবের মৃত্যুতে বিশ্বের শোষিত মানুষ হারাল তাদের একজন মহান নেতাকে, আমি হারালাম একজন অকৃত্রিম বিশাল হৃদয়ের বন্ধুকে।’ পশ্চিম জার্মানির একটি পত্রিকা লিখেছিলেন―‘শেখ মুজিবকে চতুর্দশ লুইয়ের সাথে তুলনা করা যায়। জনগণ তাঁর কাছে এত প্রিয় ছিল যে লুইয়ের মত তিনি এ দাবি করতে পারেন আমিই রাষ্ট্র।’

বঙ্গবন্ধু হচ্ছেন সেই মানুষ যাঁর জীবন ও কর্ম সফল করেছে ক্ষুদিরামপ্রীতিলতাসূর্যসেন থেকে সালামবরকতরফিক কিংবা ঊনসত্তরের শহীদ আসাদের আত্মদানকে। তিনিই একমাত্র নেতা যিনি একই সাথে বাঙালির অতীত ও ভবিষ্যতকে তাৎপর্যপূর্ণ করেছেন। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের পথিকৃত হিসেবে মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সংগ্রাম করে বাংলার মাটি ও মানুষের সাথে আজো তিনি মিশে আছেন। যতদিন বাংলার মানচিত্র থাকবে, যতদিন বাঙালির ইতিহাস থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু থাকবেন অমরঅবিনশ্বর। যে মাটিতে জাতির জনককে হত্যা করা হয়েছিল, সেই মাটিই তার দায় শোধ করেছে এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের ঐতিহাসিক বিচার সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে। তাঁকে নিয়ে যত দ্বিধাই থাকুক―জীবিত মুজিবের চেয়ে মৃত মুজিব আরো বেশি প্রেরণার উৎসে পরিণত হয়ে উঠলেন, জীবিত বঙ্গবন্ধুর চেয়ে মৃত বঙ্গবন্ধু অনেক বেশি শক্তিশালী, চিরস্থায়ী ও চিরঅম্লাান। যতদিন বাংলাদেশ টিকে থাকবে ততদিন তার নামনিশানা কেউ মুছে ফেলতে পারবে না হাজার চেষ্টাতেও। বাঙালির চেতনায়মননেজীবনে বঙ্গবন্ধু স্পন্দিত নাম। মূলতঃ তাঁর চেতনার প্রভাব শতাব্দী থেকে শতাব্দী প্রসারিত হয়েছে এবং আগামীতেও বহমান থাকবে। তাঁর কণ্ঠস্বর শাশ্বত ন্যায়ের গতিপথে বিকশিত। বঙ্গবন্ধু বাঙালির আপন ঘরের মানুষ, ভালোবাসা, শ্রদ্ধায় তিনি পুণ্যাত্মা।

ঘাতকচক্র বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেও তাঁর স্বপ্ন ও আদর্শের মৃত্যু ঘটাতে পারেনি। ক্ষুধামু্‌ক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, শান্তিপূর্ণ, সুখিসমৃদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার এ সংগ্রামে আমাদের অবশ্যই জয়ী হতে হবে। খুনিদের বিচারের মধ্যদিয়ে আমরা ইতিহাসের দায়মুক্তি পেয়েছি বটে কিন্তু এই দায়মুক্তির প্রকৃত সুফল আসবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ার মাধ্যমে। বলা বাহুল্য বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতে চায় আজকের প্রজন্ম। তাই আজকের প্রজন্ম ও ভবিয্যত প্রজন্মের কাছে তাঁকে সঠিকভাবে তুলে ধরা আমাদের সকলের দায়িত্ব ও কর্তব্য। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ হলো বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। তাঁর আদর্শ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতি হিসেবে আমরা জাতির জনকের খুনের দায় কিছুটা হলেও শোধ করতে পারব। আশার কথা, পঁচাত্তরপরবর্তী বাংলাদেশে দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্বৈরাচার বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন, সংগ্রাম, নিয়মতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও সরকার পরিচালনার কারণে জনগণের সার্বভৌমত্ব সফলভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি দেশের উন্নয়নের গতিকেও বেগবান করেছে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেতাম না। কারণ বাঙালির স্বাধিকার ও স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে নেতৃত্ব দেয়ার মতো যোগ্য লোক পূর্ববাংলায় দ্বিতীয়জন ছিলেন না। রাজনীতিতে দূরদর্শিতা ও রাষ্ট্রনায়কোচিত গুণাবলির অধিকারী না হলে কেউ সফল রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনায়ক হতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে মুজিবের ছিল বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ও দূরদর্শিতা। বাংলাদেশ আর মুজিবকে আলাদা করা যাবে না। মুজিব হচ্ছে সেই সোনার কাঠি যা বাঙালি নামক ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়েছিল। তাই বঙ্গবন্ধু হত্যা সেই জাতিকে ঘুম পাড়ানোর ঘৃণ্য অপচেষ্টা। পিতার অপূর্ণ কাজ সম্পাদন করবে সন্তান। বঙ্গবন্ধুর চেতনা কখনো ম্লান হবে না। সূর্য কখনো চিরতরে অস্ত যায় না। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা আর মুজিব আদর্শের সৈনিকেরা ধরে রাখবে বঙ্গবন্ধুর চেতনা। ব্যক্তির মৃত্যু হয় কিন্তু চেতনার মৃত্যু হয় না। তাই বঙ্গবন্ধুর দৈহিক সমাপ্তিই তাঁর মৃত্যু নয় বরং তাঁকে হত্যা করার এক অক্ষম প্রচেষ্টা মাত্র। আসুন সকলে মিলে ঐসব খুনিদের স্মরণ করিয়ে দিই বঙ্গবন্ধু হচ্ছে গ্রীক পুরাণের ফিনিক্স পাখি, যে বারবার আগুনের ভিতর থেকে জন্ম নেয়। ভস্ম হয়ে গেলেও মরে না। কেননা বাংলাদেশ নামক যে রাষ্ট্র তার ভৌগোলিক উপস্থিতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জীবনব্যাপী সাধনারই ফল। যে কারণে তিনি মহানায়ক, তিনি বঙ্গবন্ধু, আমাদের জাতির জনক। আমাদের প্রণতির প্রাত্যহিক নাম শেখ মুজিব।

লেখক : উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। কথাসাহিত্যিক ও গবেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড : বাংলাদেশ ও বাঙালির ওপর অভিঘাত
পরবর্তী নিবন্ধশোকাবহ আগস্ট