পদ্মার ভাণ্ডারে কয়েক হাজার অবিক্রিত গ্যাস ভর্তি সিলিন্ডার

কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির ষড়যন্ত্র কিনা খতিয়ে দেখার দাবি । ডিলাররা না কিনলে আমরা বিক্রি করবো কীভাবে : কোম্পানির ডিজিএম

হাসান আকবর | বৃহস্পতিবার , ২৯ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৬:২৩ পূর্বাহ্ণ

এলপি গ্যাসের জন্য দেশব্যাপী সংকট এবং একটি সিলিন্ডার যেখানে সোনার হরিণের মতো দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে সেখানে চট্টগ্রামের পদ্মা অয়েল কোম্পানির ভাণ্ডারে কয়েক হাজার গ্যাস ভর্তি সিলিন্ডার পড়ে রয়েছে। পদ্মা অয়েল কোম্পানি বলেছে, নতুন সিলিন্ডার হওয়ায় এগুলোর দাম বেশি, তাই ডিলারেরা কিনতে আগ্রহী নয়। অবশ্য শহর এবং গ্রামের একাধিক ডিলার বলেছেন, তারা বহু আকুতি মিনতি এবং মাথার ঘাম পায়ে ফেললেও পদ্মা অয়েল কোম্পানি এলপিজি সরবরাহ দেয়নি। বিষয়টিতে এলপি গ্যাসের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সরকারকে বেকায়দা কিংবা বেসরকারি গ্যাস কোম্পানির কদর বাড়ানোর কোনো ষড়যন্ত্র আছে কিনা তা খতিয়ে দেখারও দাবি জানানো হয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে বছরে বারো লাখ টনেরও বেশি এলপিজির চাহিদা রয়েছে। এই বিপুল চাহিদা মেটানো হয় আমদানি করে। এলপিজি সেক্টরের প্রায় পুরোটার নিয়ন্ত্রণই বেসরকারি খাতের অপারেটরদের দখলে। দেশের জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এই বাজারে সামান্য একটি অংশের যোগান দিয়ে থাকে। বিপিসির আমদানিকৃত ক্রুড অয়েল ইস্টার্ণ রিফাইনারিতে (ইআরএল) পরিশোধনকালে বাই প্রোডাক্ট হিসেবে এলপিজি উৎপাদিত হয়। যা দিয়ে বিপিসি দেশের চাহিদার কেবলমাত্র ১.৩৩ শতাংশ পূরণ করে থাকে। বিপিসি পদ্মা অয়েল কোম্পানি, যমুনা অয়েল কোম্পানি এবং মেঘনা পেট্রোলিয়ামের মাধ্যমে এলপিজি বাজারজাত করে। উক্ত তিনটি তেল বিপণন কোম্পানির অনুমোদিত ডিলারেরা এলপিজি সরবরাহ নিয়ে খুচরা বাজারে বিক্রি করেন।

দেশে গত বেশ কিছুদিন যাবত এলপি গ্যাসের সংকট চলছে। গ্রামেগঞ্জে মানুষ বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করতে পারলেও শহরাঞ্চলের লাখো মানুষ এলপি গ্যাসের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছে। পুরো শহর ঘুরে একটিও এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার না পাওয়ার তথ্যও ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

সারাদেশে যখন সংকট চলছে তখন বিপিসির নিয়ন্ত্রণাধীন পদ্মা অয়েল কোম্পানির ভাণ্ডারে কয়েক হাজার গ্যাস ভর্তি সিলিন্ডার পড়ে রয়েছে। বিপিসির আমদানিকৃত নতুন এলপিজি সিলিন্ডারে গ্যাস ভর্তি করে নিজেদের ভাণ্ডারে এনে রাখলেও এসব সিলিন্ডার বাজারে ছাড়া হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে যে, দশ হাজারের কাছাকাছি গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার পদ্মা অয়েল কোম্পানির ভাণ্ডারে পড়ে রয়েছে। নতুন এসব সিলিণ্ডারের দাম হিসেবে ৩ হাজার ৪শ’ টাকা এবং গ্যাসের দাম ৭৮৫ টাকা মিলে প্রতিটি সিলিন্ডার ৪ হাজার ১৮৫ টাকায় ডিলারের কাছে বিক্রি করার কথা। কিন্তু গ্যাসভর্তি সিলিন্ডারগুলো ডিলারের কাছে সরবরাহ না দিয়ে গুদামজাত করে রাখা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে গতকাল পদ্মা অয়েল কোম্পানির ডিজিএম (সেলস) মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোনে জানান, দশ হাজার নয়, তবে আমাদের কাছে কিছু সিলিন্ডার আছে। এগুলো তো আমরা আর বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে পারি না। ডিলাররা না কিনলে আমরা বিক্রি করবো কিভাবে। ডিলারেরা নতুন গ্যাস সিলিন্ডারের দামের ৩ হাজার ৪শ’ টাকা খরচ করতে রাজি না হওয়ায় এসব সিলিন্ডার নিতে আগ্রহী হয়নি। ফলে গ্যাস ভর্তি সিলিন্ডারগুলো অবিক্রিত পড়ে রয়েছে। তিনি শুধু পদ্মা অয়েল কোম্পানিতেই নয়, সব তেল কোম্পানির কাছেই এ ধরনের গ্যাসভর্তি নতুন সিলিন্ডার পড়ে রয়েছে বলে জানান।

অবশ্য, গতকাল যমুনা অয়েল কোম্পানি এবং মেঘনা পেট্রোলিয়ামের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, কোনো সিলিন্ডারই জমা নেই। ৪/৫টি সিলিন্ডার সবসময়ই জমা রাখা হয় বিশেষ প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে।

পদ্মা অয়েল কোম্পানি থেকে নতুন সিলিন্ডার না কেনা প্রসঙ্গে গতকাল নগরীর একাধিক এলপিজি ডিলারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, এটা ঠিক নয়। গ্রাহক ৩ হাজার ৪শ’ টাকা কেন, পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে হলেও এলপিজি কিনতে আগ্রহী ছিল। বহু মানুষ তিনগুণ চারগুণ দাম দিয়েও এলপিজি সিলিন্ডার কিনেছে। আমরা দিতে পারিনি। বেসরকারি অপারেটরদের এলপিজি যেমন আমরা পাইনি, তেমনি পদ্মা অয়েল কোম্পানির কাছে দফায় দফায় ধর্ণা দিয়েও আমরা গ্যাস সরবরাহ পাইনি। এতগুলো সিলিন্ডার যে গুদামজাত করে রাখা হয়েছে সেটাও ডিলারেরা জানেন না বলেও তারা জানান।

পদ্মা অয়েল কোম্পানির গুদামে কয়েক হাজার এলপিজি ভর্তি সিলিন্ডার পড়ে থাকার কথা শুনে গতকাল কয়েকজন ডিলার বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, এর পেছনে বড় ধরনের কোনো ষড়যন্ত্র আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার। সারাদেশ যখন এলপিজির ‘আগুনে’ পুড়ছে সেখানে গুদামে এতোগুলো সিলিন্ডার কেন রেখে দেয়া হলো, সেগুলো বাজারে ছাড়ার জন্য কি ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সেগুলো সরাসরি গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করার কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল কিনা বিষয়গুলো খতিয়ে না দেখলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বরাবরই প্রশ্নের মুখে থাকবে বলেও তারা মন্তব্য করেছেন। তারা বলেন, একটি নতুন সিলিন্ডারের দাম ৩ হাজার ৪শ’ টাকা। এই টাকা শহরে গ্যাসের অভাবে থাকার হাজার হাজার মানুষের কাছে কোনো ব্যাপারই নয়। তাদের কাছে এলপিজি আছে বিষয়টি প্রকাশ হলে এতোদিনে সেগুলো বিক্রি হয়ে যেতো। এতে সরকারের রাজস্ব আয়ের পাশাপাশি বাজারে স্বস্তি আসতো। বাজার অস্থিতিশীল করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে কিংবা বেসরকারি অপারেটরদের কদর বাড়াতে গ্যাস নিয়ে এই লুকোচুরি করা হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখার জন্য বিপিসির প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন তারা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদিনদিন বাড়ছে প্রার্থীদের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ
পরবর্তী নিবন্ধদ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে হবে : প্রধান উপদেষ্টা