পত্র মিতালী বা পেন ফ্রেন্ড কথাটি ক্রমশ আমাদের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এক সময় বাজারে দেশ–বিদেশের ছেলে মেয়েদের ঠিকানা সম্বলিত গাইড বই পাওয়া যেতো। ঠিকানা নিয়ে চিঠি লিখতে হতো। চিঠির ইতিবাচক উত্তর এলে ধরে নেয়া হতো মিতালী বা বন্ধুত্ব হয়েছে। পত্র মিতালীর মাধ্যমে বন্ধুত্ব ছাড়াও বিয়ে পর্যন্ত সম্পর্ক গড়াতো। ভিন্ন দেশের বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করতে হলে ইংরেজিতে দক্ষতা প্রয়োজন ছিল। সেজন্য এই মাধ্যমে দক্ষতা প্রদর্শনে ইংরেজি শেখার বাধ্যবাধকতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞানচর্চার সুযোগও এনে দিত। সেই ধারণাটিকে সম্বল করে আজকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক। ফেসবুকের একটি অপশন ম্যাসেঞ্জারে যেন হারিয়ে গিয়েছে পত্র মিতালী।
‘বন্ধুত্বের একাল–সেকাল’ ধরি তাহলে আগে বন্ধু যদি বাড়িতে আসতো, সব কিছু বন্ধ রেখে বন্ধুর আদর–যত্নে নিয়োজিত হতো বাড়ির সবাই। আর আজ কৃত্রিমতায় ভরপুর এই সমাজে বন্ধুর সাথে দেখা হলেও নানা বাহানা ও মিথ্যাচার করে তাকে এড়িয়ে যাওয়াই যেন আমাদের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। বন্ধুত্বের সেই জায়গাটিকে ফিরিয়ে আনা দরকার। ফেসবুকের কল্যাণে আমরা জানতে পেরেছি, ১০ লক্ষ বন্ধু তৈরি করা কোন অলৌকিক ঘটনা নয়, অলৌকিক ঘটনা হলো ১ জন বন্ধু তৈরি করা, যে ১০ লক্ষের মোকাবেলায় তোমার পাশে এসে দাঁড়াবে। এমন বন্ধুত্ব এখনও হারিয়ে যায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রবীণ শিক্ষক প্রফেসর ড. মো. নুরুল ইসলাম বলেন, তার প্রতি তার এক বন্ধুর অবদানের কথা। বললেন– ফাইনাল পরীক্ষার দিন মা মারা গেলেও সেকথা বন্ধু তাকে জানায়নি। পরীক্ষার পর জানিয়েছে। কারণ, বন্ধুর স্বপ্ন ছিল আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হব। সে বুঝতে পেরেছিল, দুঃসংবাদটি পেলে আমি আর পরীক্ষায় অংশগ্রহণই করতাম না। এমন বন্ধু খুঁজলে আরও অনেক পাওয়া যাবে। এমন বন্ধুত্বের মধ্যে কার্লমার্কস’র বন্ধু ফ্রেডারিক এঙ্গেলস্ এর নাম উল্লেখ করা যায়। জীবদ্দশায় যথেষ্ট সহযোগিতার পরও কার্লমার্কস’র মৃত্যুর পর তাকে ও তার লেখনীকে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করতে লাশের সামনে দাঁড়িয়ে উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে এঙ্গেলস্ বলেন, পৃথিবীর এই বিশাল জনরাশি থেকে একটি মাত্র প্রাণ হারিয়ে গেল, যে কিনা ছিল বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা মানুষ। এই কথাগুলোই কার্লমার্কস্কে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি এনে দেয়। কৌতূহল সৃষ্টি হয় তার লেখা বই পড়তে। কেউ কেউ বন্ধুর কল্যাণে সীমাহীন আত্মত্যাগের উদাহরণ রেখে গিয়েছেন জগৎবাসীর জন্য। এমনকি কেউ কেউ বন্ধুকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে বিপদ–আপদ নিজে বরণ করতেন হাসি মুখে। আগামী দিনে সুন্দর পৃথিবীর জন্য এমন নিবেদিত কিছু বন্ধু চাই। পত্র মিতালী হারিয়ে গিয়েছে, যাক। যেন অকৃত্রিম বন্ধুত্ব হারিয়ে না যায়।
পত্রমিতালীর মত এই বন্ধুত্বের বাহন ছিল ডাক বিভাগ। জেলা থেকে জেলায়, কখনো ভিন দেশেও বন্ধুত্বের বার্তা নিয়ে যেত ডাক হরকরারা। প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষকে এগিয়ে দিয়েছে এক দ্রুতগামী জীবনে, যেখানে হৃদয়ের উষ্ণ আবেগ নিয়ে আসা একেকটি চিঠি এখন কেবলই এক নস্টালজিয়া।












