পটিয়ায় মারছা ও দুইটি ঈগল পরিবহনের বাসের মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষে এক যাত্রী নিহত ও অন্তত ১৫ জন যাত্রী আহত হয়েছেন। সাতকানিয়ায় যাত্রীবাহী বাস চাপায় এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়ায় মহাসড়ক পার হতে গিয়ে ইজিবাইকের (টমটম) ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারিয়েছেন এক ব্যবসায়ী। টেকনাফে গতকাল সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে মহেশখালীতে সিএনজি চাপায় পা বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রাণ হারিয়েছে এক শিশু।
পটিয়া : গতকাল বুধবার সকাল ১০টায় চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের পটিয়ার জলুয়ার দিঘী পাড় এলাকায় তিন বাসের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে বাঁশি মোহন দাশ (৫০) নামে ঈগল পরিবহনের এক যাত্রী নিহত এবং বাস তিনটির চালকসহ অন্তত ১৫ জন যাত্রী আহত হন। আহতদের মধ্যে গুরুতর ৪ জনকে চমেক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। দুর্ঘটনার পর মহাসড়কে দুই ঘণ্টা তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। হাইওয়ে ও পটিয়া থানা পুলিশ যানজট নিয়ন্ত্রণে কাজ করে।
জানা যায়, নিহত বাঁশি মোহন দাশ লোহাগাড়া উপজেলার পুটিবিলা ইউনিয়নের হিন্দু পাড়ার বাসিন্দা। তিনি পেশায় একজন ভ্রাম্যমাণ পান ব্যবসায়ী। পরিবার সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম শহরে এক আত্মীয়ের বিয়ের দাওয়াত খেয়ে ঈগল পরিবহনের একটি বাসে করে তিনি লোহাগাড়ার পুটিবিলা নিজ বাড়িতে ফিরছিলেন।
স্থানীয়, হাইওয়ে পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামমুখী মারছা পরিবহনের একটি বাস জলুয়ার দিঘী পাড় এলাকায় বিপরীত দিক থেকে আসা ঈগল পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় ঈগল পরিবহনের আরেকটি বাস এসে মারছা বাসটিকে ধাক্কা দেয়। এতে তিনটি বাসের চালক ও যাত্রীসহ অন্তত ১৫ জন আহত হন। দুর্ঘটনার পর স্থানীয় ও দুর্ঘটনা কবলিত গাড়ির যাত্রীরা জানান, মহাসড়কের পাশে গরু বহনকারী ট্রাক আনলোড করতে সেখানে বিশালাকৃতির একটি খড়ের স্তূপ রাখা হয়। ওই খড়ের স্তূপে ভোরে কে বা কারা আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে কুণ্ডলী পাকিয়ে ওই স্তূপ থেকে ধোঁয়া উড়তে থাকে এবং রাস্তাঘাট অনেকটা ধোয়াচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। যার ফলে ভালোভাবে সড়ক দেখতে না পেয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে বাস তিনটি। ঘটনার পর আহত ৯ জনকে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে বাঁশি মোহন দাশ নামে ঈগল পরিবহনের এক যাত্রীকে মৃত ঘোষণা করা হয়। আহতদের মধ্যে মোহাম্মদ (৫), জয়নাল (৩০), মিন্টু দাশ (১৯), আনোয়ার (৩৮), নুরুল আজাদ (২৯), তাহের (৪৬), টিপু চৌধুরী (৩৬) ও শিরীন আক্তার (৪৭) প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। তবে চারজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. সামিয়া রওশন নিশ্চিত করেছেন।
মারছা পরিবহনের যাত্রী মোহাম্মদ বাহার বলেন, জলুয়ার দিঘী পাড় এলাকায় খড়ের স্তূপ থেকে অনবরত ধোঁয়া বের হচ্ছিল। ধোঁয়ার কারণে সামনে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। এতে মারছা পরিবহনের বাসের চালক হঠাৎ ব্রেক করলে বিপরীত দিক থেকে আসা ঈগল পরিবহনের বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। মূলত ধোঁয়ার কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটে।
পটিয়া ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার রাশেষ বড়ুয়া জানান, খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে বাস থেকে আহত যাত্রীদের উদ্ধার করা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে পানি দিয়ে খড়ের স্তূপের ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণ করা হয়। অতিরিক্ত ধোঁয়ার কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
পটিয়া হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির এসআই মোস্তাফিজুর রহমান জানান, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে বাসগুলো জব্দ করা হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ উদঘাটনে কাজ চলছে। এতে একজন নিহত ও অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন।
সাতকানিয়া : সাতকানিয়ায় যাত্রীবাহী বাস চাপায় এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। নিহতের নাম অনিল রুদ্র (৫০)। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের সাতকানিয়া রাস্তার মাথার দক্ষিণ পার্শ্বে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত অনিল রুদ্র বাঁশখালী উপজেলার কালিপুর এলাকার মৃত দেবন্দ্র রুদ্রের ছেলে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অনিল রুদ্র ও সজীব রুদ্র বাঁশখালী থেকে মোটরসাইকেল যোগে সাতকানিয়ার ছদাহায় যাচ্ছিল। সন্ধ্যার দিকে তারা চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের সাতকানিয়া রাস্তার মাথার দক্ষিণ পার্শ্বে পৌঁছার পর ঈগল পরিবহনের একটি বাস মোটরসাইকেলকে চাপা দেয়। এসময় অনিল রুদ্র মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে গিয়ে ঘটনাস্থলে নিহত হয়। এসময় মোটরসাইকেলের অপর আরোহী সজীব রুদ্রও আহত হয়। স্থানীয় লোকজন আহত সজীব রুদ্রকে উদ্ধার করে কেরানীহাটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করান।
দোহাজারী হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ সালাহ উদ্দিন চৌধুরী জানান, সাতকানিয়া রাস্তার মাথার দক্ষিণ পাশে যাত্রীবাহী বাসের চাপায় এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। ঘাতক বাসটি আটক করা হয়েছে।
চকরিয়া : চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়ায় মহাসড়ক পার হতে গিয়ে ইজিবাইকের (টমটম) ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারিয়েছেন এক ব্যবসায়ী। গতকাল বুধবার সকাল ৯টার দিকে উপজেলার লক্ষ্যারচর ইউনিয়নের জিদ্দা বাজার এলাকায় নিজ দোকানের সামনে এই দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়।
নিহত ব্যবসায়ীর নাম মীর মোশাররফ হোসেন (৪৪)। তিনি চকরিয়া উপজেলার কৈয়ারবিল ইউনিয়নের হামিদুল্লাহ সিকদার পাড়ার মৃত মাহমুদুল হক চৌধুরীর ছেলে এবং কৈয়ারবিল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শাহজাহান চৌধুরীর ভাতিজা। তিনি দীর্ঘদিন ধরে চকরিয়া জিদ্দাবাজার এলাকায় তারিন এন্টারপ্রাইজ নামের একটি হার্ডওয়্যার দোকান পরিচালনা করতেন।
নিহতের বড় ভাই শওকত হোসেন বলেন, মোশাররফ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চকরিয়া পৌরসভার সবুজবাগ এলাকায় বসবাস করত। প্রতিদিনের মতো বুধবার সকালে বাসা থেকে চকরিয়ার জিদ্দাবাজারস্থ নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যায়। সকাল ৯টার দিকে গাড়ি থেকে নেমে সড়ক পার হওয়ার সময় একটি দ্রুতগতির টমটম তাকে সজোরে ধাক্কা দিলে দূরে ছিটকে পড়ে মোশাররফ। এ সময় আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করে পাশের জমজম হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
মহাসড়কের বানিয়ারছড়াস্থ চিরিঙ্গা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফুল আমিন বলেন, ঘটনাস্থল থেকে ইজিবাইকটি হাইওয়ে পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তবে চালক পালিয়ে গেছে। তার পরিচয় সনাক্তের চেষ্টা চলছে। ওসি বলেন, আইনি প্রক্রিয়া শেষে দুপুরে নিহতের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই বিষয়ে পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
টেকনাফ : বাসস জানায়, কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় নাহিদ ইসলাম (৯) নামের এক শিশু নিহত হয়েছে। গতকাল বুধবার দুপুর ১২টার দিকে কক্সবাজার–টেকনাফ মহাসড়কের হোয়াইক্যাং ঝিমংখালী এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত শিশু নাহিদ ইসলাম জেলার টেশনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের আলীআকবর পাড়া এলাকার মোহাম্মদ নুরের ছেলে। এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও চারজন।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে হোয়াইক্যং হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুল আবছার জানান, কক্সবাজার–টেকনাফ মহাসড়কের হোয়াইক্যাং ঝিমংখালী এলাকায় বাস ও অটোরিকশার মধ্যে সংঘর্ষে অটোরিকশাটি দুমড়ে–মুচড়ে যায়। এ ঘটনায় শিশুসহ কয়েকজন গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে হ্নীলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক শিশু নাহিদ ইসলামকে মৃত ঘোষণা করেন। তিনি জানান, আহতদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘাতক বাসটি জব্দ করার হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
মহেশখালী : মহেশখালীতে বেপরোয়া গতির সিএনজি টেক্সি চাপায় আয়েশা সিদ্দিকা (৬) নামের এক কন্যা শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বুধবার সকাল ৯টায় উপজেলার কালারমারছড়া ইউনিয়নের চিকনিপাড়া এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত আয়েশা সিদ্দিকা স্থানীয় দিনমজুর নুরুল হকের কন্যা।
কালারমার ছড়া ইউপি সদস্য আব্দুস সালাম জানান, সকালে আয়েশা বাজারে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটছিল। এমন সময় বেপরোয়া গতির একটি সিএনজি টেক্সি তাকে ধাক্কা দেয়। এসময় শিশুটি রাস্তায় ছিটকে পড়লে তার এক পা সিএনজির চাকায় পিষ্ট হয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তার মৃত্যু হয়।
এদিকে গত রাতে দুর্ঘটনা স্থলে স্থানীয় জনতা মানববন্ধন করে এ ঘটনায় বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।










