পঁচিশের আলো-আঁধারিতে নারীদের অবস্থান ও অধিকার

নানজিয়া খায়ের পিয়া | শনিবার , ৩ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৬:০৫ পূর্বাহ্ণ

২০২৫ সাল বাংলাদেশের নারী অধিকার আন্দোলন ও নারীর সামাজিক অবস্থানের জন্য ছিল একদিকে অগ্রগতির, অন্যদিকে গভীর উদ্বেগের বছর। বছরটি বাংলাদেশের ইতিহাসে নারীর অবস্থান নিয়ে এক গভীর দ্বন্দ্বের বছর হিসেবেও চিহ্নিত হয়ে থাকবে। জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত খবর, সম্পাদকীয় ও বিশ্লেষণী প্রবন্ধে বারবার উঠে এসেছে নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে অগ্রযাত্রার পাশাপাশি সহিংসতা, বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতার চিত্র। আলোচিত হয় নারীর কমিশনের সুপারিশ, হেনস্তা করা হয় কমিশনের সদস্যদের। এই বছর একদিকে যেমন নারীর প্রতি সহিংসতা, নিপীড়ন ও বিদ্বেষের ভয়াবহ রূপ সামনে এসেছে, অন্যদিকে নারীর দৃশ্যমান উপস্থিতি, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধও নতুন মাত্রা পেয়েছে। রাষ্ট্র, সমাজ, ধর্ম ও রাজনীতির নানা স্তরে নারীর প্রশ্নটি বছর জুড়েই ছিল উত্তপ্ত আলোচনার কেন্দ্রে। এই দ্বিমুখী বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, ২০২৬ সালে আমরা কোন পথে হাঁটতে চাই এবং সেই পথে পৌঁছাতে কী কী করণীয় নির্ধারণ করা জরুরি।

২০২৫ সালে সংবাদপত্রের পাতায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল নারীর প্রতি সহিংসতা। ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা, অনলাইন হয়রানি এবং কর্মক্ষেত্রে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় উদ্বেগজনক ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা গেছে। অনেক ঘটনায় বিচারহীনতা ও দীর্ঘসূত্রতা নারীদের ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থাকে আরও দুর্বল করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধ বাড়ার পেছনে প্রধান কারণ বিচারহীনতার দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি। গবেষণায় দেখা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় বিচারের হার শূন্য দশমিক ৪২ শতাংশ, যা ভয়াবহ রকমের কম। তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, ডিএনএ প্রতিবেদনে বিলম্ব এবং গুরুতর অপরাধেও আসামির জামিন, সব মিলিয়ে অপরাধীরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অন্ততবর্তী সরকার ধর্ষণ মামলায় তদন্ত ও বিচার সময় কমানোর ঘোষণা দিলেও, বাস্তবে আইন প্রয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। গতবছর নারীর পোশাক ও ঘরের বাইরে তাদের উপস্থিতি ঘিরে একাধিক ঘটনা সমাজের রক্ষণশীল মানসিকতাকে নগ্নভাবে সামনে আনে। অক্টোবরে ‘ওড়না কোথায়’ প্রশ্ন তুলে প্রকাশ্যে নারী হেনস্তার ঘটনা, বাসের হেলপারের দ্বারা পোশাক নিয়ে অপমান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দ্বারা ছাত্রীর পোশাক নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যএসব ঘটনায় প্রতীয়মান হয় যে, নারীর শরীরই এখনো লক্ষ্যবস্তু, কমেনি নারীর প্রতি সামাজিক নিয়ন্ত্রণের বিদ্বেষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে নারী প্রতিকৃতিতে জুতাপেটা ও অশালীন আচরণের ভিডিও ভাইরাল হওয়া ছিল এ বছরের সবচেয়ে প্রতীকী ও বেদনাদায়ক ঘটনাযা নারীর প্রতি বিদ্বেষের রাজনৈতিক রূপকেই প্রকাশ করে। নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন বাতিলের দাবিতে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশের ঘোষণা প্রমাণ করে, নারীর অধিকার প্রশ্নটি শুধু সামাজিক নয়, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষমতার লড়াইয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। গাইবান্ধায় সাঁওতাল নারীর ওপর হামলা, খাগড়াছড়িতে মারমা কিশোরী ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ও প্রাণহানি বুঝিয়েছে, প্রান্তিক ও আদিবাসী নারীরা সহিংসতার দ্বিগুণ ঝুঁকিতে রয়েছে। এখানে লিঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাতিগত ও রাজনৈতিক বৈষম্য।

তবে একই সঙ্গে গেল বছর কিছু সাহসী নারী ভুক্তভোগীর প্রতিবাদ, আইনি লড়াই ও সামাজিক আন্দোলন জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের প্রথম ও প্রধান করণীয় হওয়া উচিত, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং বিচার প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও সংবেদনশীল করা।

২০২৫ কেবল হতাশার গল্প নয়। বিভিন্ন পত্রিকায় উঠে এসেছে নারীদের উল্লেখযোগ্য সাফল্যের কথাও। শিক্ষাক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ ও সাফল্য অব্যাহতভাবে বাড়ছে। উচ্চশিক্ষা, বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও চিকিৎসা শিক্ষায় নারীর উপস্থিতি আগের তুলনায় বেশি দৃশ্যমান। উদ্যোক্তা হিসেবে নারীদের সাফল্য, গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অবদান এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে নারীর নেতৃত্ব সংবাদমাধ্যমে আশাব্যঞ্জকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এই অগ্রযাত্রাকে ২০২৬ সালে আরও সুসংহত করতে হলে নারীবান্ধব অর্থনৈতিক নীতি, সহজ ঋণপ্রাপ্তি ও বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।

২০২৫ সালে রাজনীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে সংবাদপত্রে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। যদিও জাতীয় পর্যায়ে নারীর প্রতিনিধিত্ব তুলনামূলকভাবে দৃশ্যমান, স্থানীয় সরকার ও দলীয় কাঠামোয় নারীদের কার্যকর অংশগ্রহণ এখনও সীমিত। অনেক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নারীরা নির্বাচিত হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রকৃত ক্ষমতা পুরুষ সহকর্মীদের হাতে রয়ে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ হতে পারে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে কেবল সংখ্যায় নয়, বাস্তব ক্ষমতায়নের মাধ্যমে নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নারীদের জন্য অর্থবহ নেতৃত্বের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং নির্বাচনি ইশতেহারে নারী অধিকারকে স্পষ্ট অগ্রাধিকার দেওয়া।

ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পথে ২০২৫ সালে নারীরা যেমন নতুন সুযোগ পেয়েছে, তেমনি নতুন ঝুঁকির মুখেও পড়েছে। অনলাইন সহিংসতা, সাইবার বুলিং ও ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার নিয়ে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয়েছে, বিদ্যমান আইন ও সচেতনতা এই নতুন ধরনের সহিংসতা মোকাবিলায় যথেষ্ট নয়। তাই ২০২৬ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তার প্রশ্নে লিঙ্গসংবেদনশীল নীতি গ্রহণ এবং নারী ও কিশোরীদের ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

শ্রমবাজারে নারীর অবস্থানও ২০২৫ সালে সংবাদমাধ্যমে গুরত্ব পেয়েছে। গার্মেন্টস শিল্পে নারীরা দেশের অর্থনীতির মেরুদন্ড হলেও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি ও মাতৃত্বকালীন সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। একই সঙ্গে গৃহকর্মী ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত নারীদের অধিকার প্রায় অনালোচিতই থেকে গেছে। ২০২৬ সালে শ্রমনীতিতে নারীর অধিকারকে কেন্দ্রীয় বিবেচনায় আনা এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের নারীদের সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।

২০২৫ সালে নারীবাদী আন্দোলন ও নাগরিক উদ্যোগগুলোও বেশ দৃশ্যমান ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজপথ পর্যন্ত নারীরা নিজেদের অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন। এই আন্দোলনগুলোতে নারীদের যুক্ততা প্রমাণ করে যে, পরিবর্তনের শক্তি সমাজের ভেতরেই রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগকে টেকসই করতে হলে রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের মধ্যে সমন্বয় অপরিহার্য। তাই নতুন বছরে গণমাধ্যমের ভূমিকা আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন বলেই মনে করি। সংবেদনশীল ভাষা ব্যবহার, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক প্রতিবেদন এবং নারীর সাফল্যকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরার মাধ্যমে জনমত গঠনে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সবশেষে এটুকু বলা যায় যে, ২০২৫ সালে নারীর অধিকার ও উন্নয়নের চিত্র আমাদের একটি স্পষ্ট বার্তাই দেয় যে অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু তা এখনো ভঙ্গুর। তাই ২০২৬ সালের জন্য করণীয় নির্ধারণে আমাদের সাহসী ও দূরদর্শী হতে হবে। আইনের কার্যকর প্রয়োগ, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, ডিজিটাল ও সামাজিক নিরাপত্তা এবং গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা, এই সবকিছুর সমন্বয়েই কেবল একটি ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক সমাজ গড়া সম্ভব। নারীর অধিকার নিশ্চিত করা কোনো একক গোষ্ঠীর দাবি নয়; এটি গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও মানবিক মর্যাদার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২০২৬ সাল হোক সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের বছর।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসীতাকুণ্ডে ইত্তিহাদ ফাউন্ডেশনের মেধা বৃত্তি পরীক্ষার পুরস্কার বিতরণ
পরবর্তী নিবন্ধনির্বাচনী ইশতেহারে নারী ও শিশুর অধিকার