নগরীর ঐতিহ্যবাহী ব্যবসায়িক এলাকা চকবাজারের কাপাসগোলা রোডের তেলিপট্টির মুখে প্রায় নয় দশক ধরে স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে মেসার্স ফকির কবির বেকারি। ১৯৩৬ সালে ভাড়া করা একটি ছোট ঘরে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠান আজও ঐতিহ্যবাহী ‘চাক সেমাই’ তৈরির জন্য সমাদৃত। সময় বদলেছে, বাজারে এসেছে নানা ব্র্যান্ডের সেমাই, কিন্তু মান ও স্বাদের দিক থেকে আলাদা অবস্থান ধরে রেখেছে এই বেকারি।
প্রতিষ্ঠাতা কবীর আহম্মেদ ছিলেন সুফী ঘরানার একজন আধ্যাত্মিক মানুষ এবং মাইজভান্ডার শরীফের অনুরাগী। সংশ্লিষ্টদের কাছে তিনি ‘ফইর কবীর’ নামে পরিচিত ছিলেন। ১৯৩৬ সালে ভাড়া দোকানে ব্যবসা শুরু করে ১৯৪৭ সালে দোকানের জায়গাটি কিনে নেন তিনি। তার সময়েই চাক সেমাইয়ের সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে রয়েছেন আবু আহম্মেদ। তিনি জানান, আধুনিক যুগে অনেক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের সেমাই তৈরি করলেও তারা এখনো গুণগত মান অক্ষুণ্ন রেখে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে সেমাই উৎপাদন করে যাচ্ছেন।
একসময় ঈদ মৌসুমে চাক সেমাই সংগ্রহ করতে ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন ছিল নিয়মিত দৃশ্য। এখনো রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে বিক্রি বেড়ে যায় উল্লেখযোগ্যভাবে। এ সময় প্রতিদিন প্রায় ২০০ কেজি সেমাই বিক্রি হয়, প্রতি কেজির মূল্য ২৪০ টাকা। শুধু চট্টগ্রামেই নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও বিদেশেও এ সেমাই পৌঁছে যাচ্ছে।
কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, পরিচ্ছন্ন পরিবেশে পুরোনো নিয়মেই চলছে প্রস্তুত প্রক্রিয়া। উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয় শুধু ময়দা ও ফুটন্ত গরম পানি, কোনো লবণ, চিনি বা কৃত্রিম রং যোগ করা হয় না। বড় কড়াইয়ে কাঠের কাঠি দিয়ে ময়দা ও গরম পানি মিশিয়ে খামি তৈরি করা হয়। এরপর সেই খামি ধান মাড়াই মেশিনের মতো দেখতে একটি যন্ত্রের ফানেলে ঢালা হয়। মেশিনের সঙ্গে আড়াআড়িভাবে বাঁধা লম্বা কাঠ বা বাঁশ ধরে দুজন লোক ঘোরাতে থাকেন, ফলে খামির উপর চাপ পড়ে। ডাইসের ভেতর দিয়ে চাপপ্রাপ্ত খামি নিচে সূতার মতো সেমাই হয়ে ঝরে পড়ে।
পড়ন্ত সেমাই বাঁশের ডালায় চাক আকৃতিতে সাজানো হয়। পরে রোদে ভালোভাবে শুকিয়ে তন্দুরিতে দেওয়া হয়। আগুনের আঁচে সেমাই লালচে বর্ণ ধারণ করে। ঠান্ডা হওয়ার পর ডালা থেকে টুকরিতে তুলে বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখা হয়। ব্যবস্থাপক দিলীপ কুমার, যিনি ১৯৮১ সাল থেকে এখানে কর্মরত, জানান্তআগে পাইকারি বিক্রি বেশি হলেও এখন খুচরা ক্রেতার চাপই বেশি। নিম্নমানের সেমাই বাজারে এলেও নিয়মিত ক্রেতারা সরাসরি কারখানা থেকে সংগ্রহ করেন। তার মতে, রোদে সঠিকভাবে শুকানোই এই সেমাইয়ের আসল মান নিশ্চিত করে। শুরুতে যে ডাইস ব্যবহার হতো, এখনো সেই ডাইসেই তৈরি হচ্ছে সেমাই।









