নয়মাসের মুক্তিযুদ্ধ এবং কিছু স্মৃতি

মো. আসহাব উদ্দিন | সোমবার , ২ জানুয়ারি, ২০২৩ at ৪:০৭ পূর্বাহ্ণ

আমার বর্তমান বয়স ৭৪ বৎসর। জীবন সন্ধিক্ষণে এসে মুক্তিযুদ্ধে আমার অংশগ্রহণের ইতিবৃত্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জানানোর প্রচণ্ড তাগিদ অনুভব করছি। আমরা থাকবো না, কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে জানতে পারে, একটি দেশ স্বাধীন হওয়ার পেছনে কত লোকের ত্যাগতিতিক্ষা ও রক্তের প্রয়োজন হয়েছিল। এতে তারা উৎসাহ অনুভব করবে, দেশকে নিয়ে গর্ব করবে এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হবে। সুদীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর পর, আজ লিখতে বসেছি। তবে ইতিপূর্বেও লেখার তাগিদ অনুভব করিনি তা নয় কিন্তু চাকরির ব্যস্ততা তথা সময়ের স্বল্পতার কারণে লেখা হয়ে উঠেনি। ত্রিশ লক্ষ বাঙালির রক্ত ও দুই লক্ষ মাবোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি এই স্বাধীনতা।

বাবার অনুপ্রেরণায় মূলতঃ আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। তিনি ছিলেন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক, বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ ভক্ত এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ সমর্থক। আব্বা প্রায়ই বঙ্গবন্ধুর দেশপ্রেমের কথা বলতেন। সেই কথাগুলোর অনুপ্রেরণাই আমার মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার আগ্রহ আরো বাড়িয়ে দেয়। সবার উপরে দেশ, তার উপরে কিছু নেই, এই সত্যই ছিল তখন আমার কাছে সবচেয়ে বড়। আমি ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মগ্ন ছিলাম, তাই কোন রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলাম না, কিন্তু নিজের ভিতরে দেশপ্রেম ছিল সবসময় অক্ষুণ্ন। ২৫শে মার্চ রাতে যখন পাকিস্তানিরা গণহত্যা চালায়, নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে বাঙালিদের, আমি তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের ছাত্র। চট্টগ্রাম শহরের আসকার দিঘির পাড় একটা মেসে, আমার বড় বোনের স্বামী আহমদ সবুরের সাথে থাকতাম। ভয় আর আতঙ্কে ঐ রাত নির্ঘুম ছিলাম, চারদিকে গুলির আওয়াজ শুনেছি, কারণ আমাদের কাছাকাছিই ছিল চট্টগ্রাম সেনানিবাস। ২৬শে মার্চ দেখলাম, আশেপাশের মানুষসহ সমগ্র দেশের মানুষ যে যেভাবে পারে শহর ছেড়ে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে যাচ্ছে।

২৭ শে মার্চ আমি ভয় আর আতঙ্কে চলে গেলাম, আমার গ্রামের বাড়ি চন্দনাইশ হাছনদণ্ডী গ্রামে। খবর নিয়ে জানলাম, বাঙালিরা ইতোমধ্যে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেছে। আরো জানতে পারি, অনেক যুবকও প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠেছে এবং চট্টগ্রাম সেনানিবাসে বিদ্রোহী ও পাকিস্তানিদের প্রতিরোধকারী বাঙালি সৈন্যদের খাদ্যশস্য সরবরাহসহ অন্যান্য সাহায্য সহযোগিতা করছে। আমিও তাদের সঙ্গে যুক্ত হই। চট্টগ্রাম শহর পাকিস্তানি সৈন্যদের দখলে যাওয়ায় বিদ্রোহী বাঙালি সৈনিক ও ছাত্রজনতা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে এবং অনেকে ভারতে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সংগ্রহের জন্য চলে যায়। তখন আমাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল, দেশকে শত্রুমুক্ত ও স্বাধীন করা। কয়েকদিনের মধ্যে পাকিস্তানিরা কিছু কিছু গ্রামে প্রবেশ করে এবং স্বাধীনতাকামী বাঙালি, সংখ্যালুগুদের হত্যা, নির্যাতন ও লুটপাট শুরু করে। পাকিস্তানিরা স্থানীয় মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবিরের লোকদের নিয়ে রাজাকার, আলবদর ইত্যাদি সৃষ্টি করে এবং তাদের সহযোগিতায় বাঙালিদের উপর অন্যায়ভাবে অত্যাচার, নির্যাতন চালায়।

আমার জন্ম ১৯৪৮ সাল। মুক্তিযুদ্ধকালীন আমার বয়স ছিল ২১/২২ বছর। আমি তখন পুরোপুরি টগবগে এক যুবক, অন্যায়ের প্রতিবাদের জন্য এই বয়স পুরোপুরি মানানসই। নিজের অভ্যন্তরাভিমুখে, নিজরেই প্রেরণা অনুভব করলাম, আমার দেশকে মুক্ত করতে হবে। আমি যখন ছোট তখন আমার মা মারা যায়। বাবাই ছিল আমার অনুপ্রেরণার বাতিঘর। আমি চিন্তা করি, এভাবে অত্যাচারিত, নির্যাতিত হয়ে বেঁচে থাকার মানে হয় না বরং শত্রুদের বিরুদ্ধে দেশ স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধ করে মরে যাওয়াই শ্রেয়। তারপর বাবার অনুপ্রেরণায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিই। বিভিন্ন জায়গায় খবরাখবর নিয়ে জানলাম, বিভিন্ন দলের ছাত্রজনতা বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে, নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে, প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আরো জানতে পারলাম, চন্দনাইশ থানার ধোপাছড়ি পাহাড়ি এলাকায় বেশ কয়েকটি গ্রুপ প্রতিরোধের জন্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে এবং রাজাকার, আলবদরদের প্রতিরোধের চেষ্টা করছে ।

আমার দুলাভাই আহমদ নবী ছিলেন হাশিমপুর ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের নেতা। আমি উনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করি এবং ধোপাছড়িতে গিয়ে সেখানে থাকা সশস্ত্র গ্রুপের সঙ্গে প্রতিরোধ সংগ্রামে উনিসহ অংশগ্রহণ করি। সেখানে গিয়ে শুনলাম, আবু তাহের খান, জাফর আলী হিরুদের যে গ্রুপটি ছিল তারা ভারতে চলে গেছে। আরো একটি গ্রুপ যেখানে আমার স্কুল জীবনের সহপাঠী বন্ধু রবিউল ইসলাম খাঁনসহ ১০১২ জনের একটি গ্রুপ ধোপাছড়ি পাহাড়ের পাদদেশে একটি ছোট্ট ঘরে অবস্থান করছে। আমরা সেখানে তাদের সঙ্গে যুক্ত হই। ঐ দলের নেতৃত্বে ছিল নকশালপন্থী ডা. তুহিন, রবিউল ইসলাম খান, মামুন, জাহেদ। তাদের কাছে অস্ত্রের মধ্যে ছিল একটি এল.এম.জি, সাত/আটটি রাইফেল, কিছু গ্রেনেড এবং কিছু গুলি। সেখানে আমরা নিজেদের মধ্যে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি এবং রাজাকার ও স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রতিরোধ সংগ্রামে লিপ্ত হই। উল্লেখ্য যে, ১৯৬৫ সালে পাকভারত যুদ্ধের সময় আমি কলেজের ছাত্র। কলেজের ছাত্র থাকাকালীন, আমাদের চট্টগ্রাম স্টেডিয়াম এবং চট্টগ্রাম সেনানিবাসে পাঞ্জাব রেজিমেন্টের অধীনে হোমগার্ড ট্রেনিং ও চন্দনপুরা ফায়ার ব্রিগ্রেডে অগ্নিনির্বাপকের ট্রেনিং দেওয়া হয়। এছাড়াও কলেজ জীবনে আমি ইউ.টি.সি র সাথে যুক্ত ছিলাম। আমি মুক্তিযুদ্ধে, ডা. তুহিনের গ্রুপে যোগদান করলাম কারণ ইত্যবসরে কিছু গ্রুপ প্রশিক্ষণের জন্য এবং অস্ত্র সংগ্রহের জন্য ভারতে চলে গিয়েছে। ডা. তুহিন আমাকে মাও সেতুং এর একটা বই দিয়ে বললেন, এটা পড়। এভাবেই আস্তে আস্তে নিজেকে জড়িয়ে ফেলি মুক্তিযুদ্ধে।

আমাদের কাছে যে সামান্য অস্ত্র ছিল, তা দিয়ে আমরা রাজাকারদের বিরুদ্ধে ছোট ছোট অপারেশনে অংশগ্রহণ করি। তন্মধ্যে, বান্দরবান থেকে ধোপাছড়ির দিকে অগ্রসররত রাজাকারের একটি দলকে ধোপাছড়ির বাজারের পূর্বদিকে আমরা প্রতিরোধ করলে তারা ফিরে যেতে বাধ্য হয়। এর কয়েকদিন পর, পাকিস্তানি সৈন্যরা নৌপথে রাজাকারদের সহায়তায় ধোপাছড়ি আসে। আমাদের অস্ত্রসন্ত্রের স্বল্পতার কারণে, আমরা প্রতিরোধ না করে, ধোপাছড়ি বাজারের পশ্চিমে পাহাড়ি এলাকার দিকে সরে যাই। পাকিস্তানি সৈন্য ও রাজাকারেরা ধোপাছড়ি বাজারে অগ্নিসংযোগ করে কিছু ঘরবাড়ি ও দোকানপাট লুন্ঠন করে এবং তা জ্বালিয়ে দিয়ে ফিরে যায়।

ইতোমধ্যে, বিভিন্ন কারণে আমাদের গ্রুপে মতপার্থক্য দেখা দেওয়ায় ডা. তুহিন ও তার অনুসারী কয়েকজন স্থানীয় শরণার্থীসহ ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং তারা কিছুদিন পর শরণার্থীদের নিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়। কিন্তু তারা ভারতে না ঢুকে শরণার্থীদের বর্ডার পার করে দিয়ে ফিরে আসে। তাদের সঙ্গে থাকা শুধুমাত্র, রবিউল ইসলাম খান বর্ডার পার হয়ে ভারতে চলে যায়। আমি আর আহমদ নবী ধোপাছড়িতে থেকে যাই এবং নতুন দল গঠন করার লক্ষ্যে চন্দনাইশ থানার বদুরপাড়ার ই.পি.আর হাবিলদার আসহাব মিয়া এবং সাতবাড়িয়া ইউনিয়ন হতে ই.পি.আর হাবিলদার সুরুজ মিয়াকে ধোপাছড়িতে নিয়ে আসি এবং সেখানে আরো কিছু যুবককে নিয়ে প্রশিক্ষণ শুরু করি।

এরমধ্যে, বৈলতলির সিরাজুল ইসলাম ও ন্যাপের আব্দুল হামিদ আমাদের সাথে যোগ দেয়। একদিন আমার দুলাভাই আমাকে বললেন, অনেকে তো অস্ত্র ও প্রশিক্ষণের জন্য ভারত চলে যাচ্ছে। ঐখান থেকে অস্ত্র নিয়ে আসি, কারণ শত্রুর মোকাবেলা করার জন্য আমাদের কাছে যথেষ্ট অস্ত্র নেই। তারপর আমার দুলাভাই আহমাদ নবীসহ গ্রুপের অধিকাংশ সদস্য অস্ত্র সংগ্রহ ও উন্নত ট্রেনিং এর জন্য ভারত চলে যায়। কারণ আমাদের কাছে যে অস্ত্র আছে তা দিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করা প্রায় অসম্ভব ছিল।

আমি ধোপাছড়িতে অবস্থান করছি জেনে, বরকল শাহজাহান গ্রুপের প্রধান শাহজাহান ইসলামাবাদী, মুক্তিযোদ্ধা হাফেজ আহমুদুল হককে দিয়ে আমার কাছে একটি চিঠি পাঠালেন। হাফেজ আহমুদুল হক এর কিছুদিন আগেই ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছে। তিনি চিঠিতে তাঁদের গ্রুপে জয়েন করার জন্য অনুরোধ করেন এবং জানান তাঁদের গ্রুপে প্রয়োজনীয় অস্ত্রসস্ত্র আছে। আমি তখন ধোপাছড়ি থেকে এসে শাহজাহান ইসলামাবাদীর গ্রুপে যোগদান করি। সেখানে সার্জেন্ট মহি আলম, ফেরদৌস ইসলাম খান, আনোয়ার, দীলিপ, আব্দুল মজিদ, আব্দুস সবুর, মুরিদুল আলম, গউস মুহাম্মদ, আব্দুস সাত্তার, মহসীন খান, ইদ্রিস, আহমুদুর রহমান, হুলাইনের আসলাম এবং অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধার সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। আমি তাদের সাথে যুক্ত থেকে বিভিন্ন অপারেশনে অংশগ্রহণ করি।

উল্লেখ্য যে, বরকল হাইস্কুল মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং ক্যাম্প ছিল এবং মুক্তিযোদ্ধাদের স্থানীয়ভাবে সেখানে ট্রেনিং দেওয়া হতো। আমাদের বিভিন্ন অপারেশনের সঙ্গে পটিয়ার মহসিন খাঁন গ্রুপসহ, ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসা বিভিন্ন গ্রুপ অংশ নিতেন। আমি শাহজাহান ইসলামাবাদী গ্রুপের সাথে যুক্ত থাকাকালীন, আমার নিজ এলাকা সাতবাড়ীয়ায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা নুরুস ছফা, জালাল আহমদ, আমানুল হক, স্বাদল বড়ুয়া, আসহাব উদ্দীন আহমদ, আহমদ উল্লাহ, দেলোয়ারসহ অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নিয়ে বরমা ইউনিয়নে পোড়াবাড়ির ভিটায় ৩০/৩৫ জন যুবককে নিয়ে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প চালু করি।

আমাদের বিভিন্ন অপারেশনের মধ্যে ছিল চুন্নু রাজাকারের বাড়ি অপারেশন। বলাবাহুল্য, যুদ্ধের সময় এই রাজাকারেরাই পাঞ্জাবিদের সহায়তায় নির্দয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে এবং বাঙালিদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিত, নারী নির্যাতন, সংখ্যালুগুদের হত্যা করতে সহযোগিতা করত।

চুন্নু রাজাকারের বাড়িতে আমরা যখন অপারেশন পরিচালনা করি তখন রাত ১২ টা থেকে ১ টার মধ্যে হবে। অপারেশন কমান্ডার ছিল বীর মুক্তিযোদ্ধা আহমাদুর রহমান, সংখ্যায় আমরা প্রায় ২০/২৫ জন অংশগ্রহণ করি। আমার হাতে ছিল ৩০৩ রাইফেল এবং আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় সম্মুখ ঘরের প্রধান দরজায়। অপারেশন কমান্ডারের সংকেতে, রাইফেল থেকে গুলি ছুঁড়তেই একটি কুকুর আমার পাশে লাপিয়ে পড়ে। অপরপক্ষ থেকে কোনও গুলি না আসাতে দরজা ভেঙে আমরা তার বাড়িতে প্রবেশ করি এবং তল্লাসিপূর্বক তার তিন ছেলেসহ তাকে ধরে ফেলি। পরবর্তীতে চুন্নু রাজাকারকে মেরে ফেলা হয় এবং তার ছেলেদের বিরুদ্ধে কোনও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না পাওয়ায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

প্রথমবার আনোয়ারা থানা অপারেশন হয়, সম্ভবত সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে। এই অপারেশনে শাহজাহান গ্রুপসহ অন্য আরো দুটি গ্রুপ অংশগ্রহণ করে। এই অপারেশনের অপারেশন কমান্ডার ছিল সার্জেন্ট মহি আলম। আমরা তৈলারদ্বীপ লতিফের বাড়িতে শেল্টার নিয়ে তিনটি গ্রুপে ভাগ হয়ে, অপারেশন পরিচালনা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করি। আমাদেরকে অপারেশন কমান্ডার তিনটি গ্রুপ ভাগ করলেন এবং বললেন, তিনদিক থেকেই আক্রমণ হবে। পূর্বে, সম্পন্নকৃত রেকির ভিত্তিতে আগ থেকেই আনোয়ারা থানা অপারেশনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। লতিফের শেল্টার থেকে, আনোয়ারা থানার উদ্দেশ্যে, আমরা রাত প্রায় ১২ টার দিকে রওনা হই এবং রাত অনুমান ৩ টার দিকে আনোয়ারা থানা সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছি। থানার পূর্ব দিকের পুকুর পাড়ের উত্তর কোণায় এল এম জি বসানো হয়। যেন, থানা ও সিও অফিস একই সাথে ব্রাশ করা যায়। দ্বিতীয় গ্রুপটি, থানার সোজা এমবুশ নেয়। তৃতীয় গ্রুপ, ধানক্ষেতে অবস্থান নেয় যেন সিও অফিসে আক্রমণ করা যায়। ভোর প্রায় ৫ টার দিকে আমরা আক্রমণ শুরু করি। এল এম জি ব্রাশ ফায়ার করা হয় থানার বেড়ার ঘরটিতে এবং সিও অফিসে। ততক্ষণে, অন্যগ্রুপ গুলিও ফায়ার আরম্ভ করে। আমাদের কিছু মুক্তিযোদ্ধা ও হাবিলদার আবু, ক্রোলিং করে চাইনিজ স্টেনে ব্রাশ ফায়ার করতে করতে, কিছু হ্যান্ড গ্রেনেড নিয়ে বেড়ার ঘর ও থানায় আক্রমণ করে। এতে বেড়ার ঘর থেকে আমাদের দিকে যে ফায়ার আসছিল তা বন্ধ হয়ে যায়। আমাদের আক্রমণে প্রতিপক্ষ নীরব হয়ে যাওয়ায়, আমরা ভড়িৎগতিতে থানার বেড়ার ঘরটি ও সিও অফিস দখল করে নিই। বেড়ার ঘর থেকে একটি গুলির আঘাতে, হাবিলদার আবু আঘাত প্রাপ্ত হয়। আমাদের আক্রমণে, কিছু রাজাকার নিহত হয়। কিছু রাজাকার পশ্চিম দিকের বিলের মধ্য দিয়ে পালিয়ে যায়। আর কিছু রাজাকার আমাদের হাতে ধরা পরলে তাদের পুকুর পাড়ের বেড়ার ঘরের সামনে মেরে ফেলা হয়। উক্ত অপারেশনে ৮৮টি ৩০৩ রাইফেল ও প্রায় ১০,০০০ রাউন্ড ৩০৩ রাইফেলের গুলি পাওয়া যায়। এরপর, আমরা আরো কয়েকটি অপারেশনে অংশগ্রহণ করি। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, পটিয়ার কালারপুল ব্রীজ অপারেশন। এই অপারেশন আমরা মহসিন খানের সাথে করি এবং অপারেশনের জন্য আমি দুই রাত মহসিন খানের বাড়িতে অবস্থান করি। সাতবাড়ীয়া ইউনিয়নে, হাজিরপাড়া এক রাজাকারের বাড়িও অপারেশন করা হয়। কিন্তু ঐ রাজাকারেরা অপারেশনের খবর শুনে পূর্বেই পালাতে সক্ষম হয়। (চলবে)

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসাহিত্যিক মাহবুব উল আলমকে মনে পড়ে
পরবর্তী নিবন্ধসিএসইতে লেনদেন ১০.৪২ কোটি টাকা