লাইটারেজ জাহাজে ডিজেল সংকটে দেশের অভ্যন্তরীণ নৌ রুটে পণ্য পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ডিজেল না পেয়ে লাইটারেজ জাহাজগুলো বহির্নোঙরে পণ্য খালাসসহ দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচল করতে পারছে না। গতকাল বহির্নোঙরে পণ্য নিয়ে ৭৬টি মাদার ভ্যাসেল অপেক্ষা করছিল। অথচ এসব জাহাজের বিপরীতে বরাদ্দকৃত লাইটারেজ জাহাজ তেলের অভাবে আউটারে যেতে পারছে না। লাইটারেজ জাহাজে জ্বালানি তেল সরবরাহের ব্যাপারে নৌ পরিবহন অধিদপ্তরে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হলেও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) নিকট সরকারি কোনো নির্দেশনা না আসায় আগের মতো রেশনিং করা হচ্ছে। তেল সংকটে জাহাজ বরাদ্দ দিলেও চলাচল না করায় বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি) প্রতিদিনের পরিবর্তে তিন–চার দিন পর পর বার্থিং মিটিং করতে বাধ্য হচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল না পাওয়ায় চট্টগ্রামে কয়েকশ লাইটারেজ জাহাজ অলস ভাসছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নদীপথে প্রতি টন পণ্য পরিবহনে গড়ে ৩.২ লিটার জ্বালানি লাগে। অপরদিকে সড়কপথে তা পরিবহন করতে গড়ে ১২ লিটার তেল লাগে। একটি লাইটারেজ জাহাজে যে পরিমাণ পণ্য পরিবহন করতে পারে তা সড়কপথে পরিবহনে অন্তত দুইশ ট্রাক লাগে। নদীপথকে গতিশীল রাখা না গেলে দেশব্যাপী পণ্য সরবরাহ নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বন্দর ও জাহাজ মালিকদের সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনে প্রায় দেড় হাজার লাইটারেজ জাহাজ রয়েছে। এসব জাহাজের স্বাভাবিক চলাচলের উপর বহির্নোঙরসহ দেশের পণ্য পরিবহন নেটওয়ার্ক পুরোপুরি নির্ভর করে। চট্টগ্রাম বন্দরে আগত বড় জাহাজগুলোর একটি বড় অংশ ড্রাফটের কারণে সরাসরি বন্দরের জেটিতে ভিড়তে পারে না। এসব জাহাজ বহির্নোঙরে অবস্থান করে। পরে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে মাদার ভ্যাসেল থেকে পণ্য খালাস করে তা বন্দরের জেটি কিংবা দেশের বিভিন্ন নদীবন্দরে পাঠানো হয়। বহির্নোঙরের কার্যক্রম পুরোপুরি লাইটারেজ জাহাজের উপর নির্ভরশীল। বহির্নোঙরের এই কার্যক্রম দেশের সমুদ্রবাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বছরে শত শত মাদার ভ্যাসেল বহির্নোঙরে অবস্থান করে পণ্য খালাস করে।
কিন্তু সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটে বিপাকে পড়েছে লাইটারেজ বহর। একটি লাইটারেজ জাহাজ প্রতিদিন পরিচালনায় গড়ে তিন হাজার থেকে দশ হাজার লিটার পর্যন্ত ডিজেল প্রয়োজন হয়। আগে ডিলারদের কাছ থেকে নিয়মিত এই জ্বালানি পাওয়া গেলেও বর্তমানে সরবরাহ কমে গেছে। তেল বিপণন কোম্পানিগুলো রেশনিং করার ফলে অনেক জাহাজ প্রয়োজনীয় তেল না পেয়ে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
লাইটারেজ জাহাজ মালিকদের অভিযোগ, জ্বালানি ডিপোগুলো আগের মতো ডিজেল দিচ্ছে না। এমনকি নদীপথে তেল সরবরাহকারী ট্যাংকার ব্যবসায়ীরাও পর্যাপ্ত জ্বালানি পাচ্ছেন না।
লাইটারেজ জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এ এন জে ট্রেডিংয়ের মালিক শেখ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বিডব্লিউটিসিসি বরাবরে প্রেরিত একটি চিঠিতে জ্বালানি তেল সংকটের চিত্র তুলে ধরেছেন। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ২ এপ্রিল থেকে গতকাল পর্যন্ত তার প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ৪৩টি লাইটারেজ জাহাজ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই জাহাজগুলো পরিচালনা করতে তার কমপক্ষে ৯৪ হাজার ৫শ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন। অথচ তিনি তেল বিপণন কোম্পানি থেকে সরবরাহ পেয়েছেন ৫০ হাজার লিটার। এতে করে তার পক্ষে লাইটারেজ জাহাজ ঠিকভাবে পণ্য খালাস বা পরিবহনে পাঠানো সম্ভব হয়নি। তার প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া অনেকগুলো জাহাজই চলাচল করতে পারছে না।
একইভাবে অপর একজন লাইটারেজ জাহাজ অপারেটর বলেন, আগে যে পরিমাণ তেল পাওয়া যেত এখন তার অর্ধেকও মিলছে না। জাহাজ বরাদ্দ পেয়েও মাদার ভ্যাসেলের কাছে যেতে পারছে না। তিনি বলেন, আমরা মজুদ বা পাচার করার জন্য তো তেল চাচ্ছি না। আমাদের জাহাজ চালানোর প্রয়োজনীয় তেল চাচ্ছি। কিন্তু সেই তেল না দিয়ে লাইটারেজ জাহাজ চলাচল কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, বহির্নোঙরে অবস্থান করা মাদার ভ্যাসেল থেকে পণ্য খালাসের জন্য ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল থেকে নিয়ম অনুযায়ী লাইটারেজ জাহাজ বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে বরাদ্দ পাওয়ার পরও অনেক জাহাজ তেলের অভাবে নির্ধারিত সময়ে যাত্রা করতে পারছে না। এতে বহির্নোঙরে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস ব্যাহত পাশাপাশি জাহাজজটেরও আশঙ্কা বাড়ছে। গতকাল ভোগ্যপণ্যসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে ৭৬টি মাদার ভ্যাসেল বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ ছিল। এসব জাহাজের বিপরীতে যে পরিমাণ জাহাজ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তার অর্ধেকও কাজে যেতে পারেনি। ফলে বহির্নোঙরে জাহাজের অবস্থানকাল এবং জট বাড়ছে।
বন্দর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন রুটের বিভিন্ন গন্তব্যে খাদ্যশস্য, সার, কয়লা, ক্লিংকার, ভোগ্যপণ্যসহ নানা পণ্য পরিবাহিত হয়। লাইটারেজ জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না থাকলে শুধু বন্দরের কার্যক্রম নয়, পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
শিপিং ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, বহির্নোঙরে জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে বিলম্ব হলে আমদানিকারকদের অতিরিক্ত ডেমারেজ বা জাহাজ ভাড়া গুণতে হবে। এতে পণ্যের আমদানি খরচ বেড়ে যেতে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজারমূল্যের উপর পড়বে। একেকটি মাদার ভ্যাসেলের বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে ২০ হাজার ডলার গচ্ছা দিতে হচ্ছে। যার যোগান দিতে হবে দেশের সাধারণ ভোক্তাদের।
নদীপথে পণ্য পরিবহন অনেক সাশ্রয়ী বলে মন্তব্য করে ব্যবসায়ীরা বলেছেন, লাইটারেজ জাহাজ যে পরিমাণ পণ্য পরিবহন করে তা সড়কপথে পরিবহন করা সম্ভব নয়। এত বিপুল পরিমাণ পণ্য সড়কপথে পাঠাতে হলে হাজার হাজার ট্রাক লাগবে। এতে করে বর্তমান জ্বালানি সংকট আরো বাড়বে।
সংকটের কথা স্বীকার করে বিডব্লিউটিসিসির আহ্বায়ক হাজী সফিক আহমেদ বলেন, লাইটারেজ জাহাজের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাচ্ছি না। রেশনিং করে আমাদেরকে যে জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে তাতে অর্ধেক জাহাজও পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে পণ্য পরিবহন খাতে সংকট তৈরি হয়েছে। বহির্নোঙরের কার্যক্রম পুরোপুরি লাইটারেজ জাহাজের উপর নির্ভরশীল। লাইটারেজ জাহাজের প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংকট ঘুচাতে ঢাকায় একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়েছিল। সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত এবং নির্দেশনা অনুসরণ না করায় পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
লাইটারেজ জাহাজে জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করা না হলে বহির্নোঙর এলাকায় পণ্য খালাস কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, এর সরাসরি প্রভাব পড়বে আমদানি বাণিজ্য ও অভ্যন্তরীণ বাজার সরবরাহ নেটওয়ার্কে। এতে আমদানি বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন এবং বাজার সরবরাহ থেকে শুরু করে সবখানে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।














