সন্তান আল্লাহর সবচেয়ে বড় নিয়ামত। আল্লাহ যাকে চান তাকেই সন্তান দান করেন। আল্লাহ ছাড়া কেউ সন্তান দিতে পারে না। তাই আল্লাহর কাছেই চাইতে হবে। আল্লাহ কোরআনে বলেন তিনি যাকে চান কন্যা দেন ও যাকে চান পুত্র দেন। অথবা পুত্র ও কন্যা উভয় মিলিয়ে দেন। আবার যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান। সন্তান প্রতিটি বাবা–মায়ের জীবনের পরম আশীর্বাদ। তবে শুধু সন্তান পেলেই দায়িত্ব শেষ হয় না বরং সন্তান যেন হয় আদর্শ, চরিত্রবান ও আল্লাহভীরু সেটাই প্রকৃত সফলতা। সন্তান ধর্মপরায়ণ হলে পরিবারে আসে শান্তি আর সন্তান অবাধ্য হলে মাটি হয়ে যায় বাবা–মায়ের স্বপ্ন। তাই ইসলাম শুরু থেকেই আদর্শ সন্তান লাভের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়ার শিক্ষা দেয়। এমনকি আল্লাহর প্রিয় নবীরাও আদর্শ সন্তান পেতে তাঁর কাছে দোয়া করেছেন কোরআনে সেসব দোয়ার সুন্দর নমুনাও রয়েছে। আল্লাহর নবী হজরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর কাছে আদর্শ সন্তান লাভের জন্য দোয়া করেছিলেন। আল্লাহতাআলা তাঁর দোয়া কবুলও করেছিলেন। তিনি দোয়া করেছিলেন এভাবে ‘রাব্বি হাবলি মিনাস সলিহিন।’ অর্থ : হে আমার রব আমাকে এক সুপুত্র দান করুন। (সুরা সাফফাত : ১০০) হজরত জাকারিয়া (আ.) ছিলেন নি:সন্তান। কিন্তু তাঁর মনে সন্তান লাভের আকাঙ্ক্ষা ছিল প্রবল। তিনি আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন ‘রাব্বি হাবলি মিল্লাদুনকা জুররিইয়াতান তাইয়িবাহ ইন্নাকা সামিউদ দুআ’। অর্থ : হে রব, আপনার পক্ষ থেকে আমাকে পবিত্র সন্তান দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি দোয়া কবুলকারী। (সুরা আলে ইমরান : ৩৮)
মা–বাবার মৃত্যুর পর কবরের পাশে গিয়ে বা দূর থেকে দোয়া করবে–এমন সন্তান দুনিয়ায় রেখে যেতে চাইলে সর্বপ্রথম মা–বাবাকে হতে হবে একজন আদর্শবান ও আল্লাহ ভীরু। সন্তানকে দিতে হবে ধর্মীয় শিক্ষা ও উত্তম আদর্শ। তা হলেই সে মা–বাবার মৃত্যুর পর দোয়া করবে। কবর জিয়ারত করবে। সুসন্তান বলতে শুধু লেখাপড়ায় ভালো তা নয় বরং যার ইমান–আমল ঠিক আছে যে শরিয়তের বিধান বর্তমান ফেতনার যুগেও সাধ্যমতো মেনে চলার চেষ্টা করে তাকে বোঝায়। যারা পিতা–মাতা বেঁচে থাকতেও অনুগত ছিল তাদের মৃত্যুর পরেও আল্লাহর কাছে তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে। মৃত্যুর পর মা–বাবার জন্য সন্তানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান হলো তাদের জন্য বেশি বেশি দোয়া করা, তাদের মাগফেরাত কামনা করা, তাদের পক্ষ থেকে সদকা করা, তাদের ঋণ থাকলে তা পরিশোধ করা এবং তাদের কবর জিয়ারত করা। এছাড়া তাদের রেখে যাওয়া ভালো কাজগুলো আঞ্জাম দেওয়া ও তাদের স্মৃতিকে সম্মান করা সন্তানের দায়িত্ব। মা–বাবা আল্লাহর অমূল্য এক নিয়ামত। আল্লাহ তাআলা শিখিয়ে দিয়েছেন কীভাবে আমরা আমাদের মা–বাবার জন্য দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করব। আল্লাহতাআলা মাতা–পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার ও কর্তব্য পালনের আদেশ শুধু তাঁদের জীবিত অবস্থায়ই নয় মৃত্যুর পরও। রাসুল (সা.) বলেন সবচেয়ে উত্তম সওয়াবের কাজ হলো সন্তানের পক্ষে পিতার বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা। রাসুল (সা.) বলেন মানুষ মারা গেলে তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায় তিনটি ছাড়া সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যা দ্বারা উপকার পাওয়া যায় অথবা এক ধার্মিক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।
একজন মুমিন বান্দা হিসেবে আমাদেরও পরম চাওয়া চরিত্রবান ও আল্লাহভীরু সন্তান। এর জন্য আল্লাহর কাছে কীভাবে দোয়া করতে হবে তা বর্ণিত হয়েছে পবিত্র কোরআনে। দোয়াটি হলো ‘রাব্বানা হাবলানা মিন্ আজওয়াজিনা ওয়া জুররিইয়াতিনা কুররাতা আইয়ুন ওয়া জাআল্না লিল মুত্তাকিনা ইমামা’। অথর্ : হে আমাদের রব আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং সন্তানদের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের আল্লাহভীরুদের জন্য আদর্শ বানান। (সুরা ফুরকান : ৭৪) আদর্শ সন্তান পাওয়া যেমন আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত তেমনি তা একটি পরিবার সমাজ ও জাতির জন্য আখিরাতমুখী সঞ্চয়ও। তাই সন্তান জন্মের আগে পরে ও প্রতিদিনই নেক সন্তান লাভ এবং তাদের হিদায়াতের জন্য দোয়া করা একজন মুমিন পিতা–মাতার দায়িত্ব। সন্তান–সন্ততি পার্থিব জীবনের শোভা এবং সুসন্তান পরকালের পাথেয়। তাই দোয়া করতে হবে সন্তান যেন পার্থিব জীবনে শোভা হয় এবং পরকালে পাথেয় হয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে সম্পদ ও সন্তান–সন্ততি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য, স্থায়ী সৎ কাজ, তোমার প্রতিপালকের কাছে পুরস্কারপ্রাপ্তির জন্য শ্রেষ্ঠ এবং কাঙ্ক্ষিত হিসেবেও শ্রেষ্ঠতর। (সুরা : কাহফ : আয়াত : ৪৬)। মা–বাবা সন্তানের সব ধরনের অকল্যাণ দূরীভূত করার দোয়া করবে। সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ নেয়ামত। পিতামাতার কর্তব্য হলো ইসলামের নির্দেশনার আলোকে সন্তানের প্রতি যত্নবান থাকা, তাদের দেখাশোনা করা। তাদের প্রতি ভালোবাসা সুন্দর ব্যবহার ও তাদের সন্তুষ্টির দিকেও মনোযোগী হতে হবে। এরপরও সন্তানের আচরণে কখনো কষ্ট পেলে তাঁর জন্য বদ দোয়া করতে আল্লাহর রাসুল (সা.) নিষেধ করেছেন। কেননা তাৎক্ষণিক ক্ষুব্ধতার মধ্য দিয়ে হলেও পিতা–মাতার দোয়া আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে যায় এবং পরিণতিতে তা সন্তানের ইহকাল ও পরকাল বরবাদ করে দিতে পারে। আবু হোরায়রা (রা.)বর্ণিত একটি হাদিসে আছে– রাসুল (সা.) বলেছেন, কোন সন্দেহ নেই তিন ব্যক্তির দোয়া কবুল করা হয় : ১. পিতা–মাতার দোয়া ২. মুসাফিরের দোয়া ও ৩. অত্যাচারিতের দোয়া। নবীজি (সা.) বলেছেন, প্রতিটি সন্তান ইসলামের প্রকৃতির ওপর জন্মগ্রহণ করে। মা–বাবাই তাকে ইহুদি, খ্রিষ্টান ও অগ্নিপূজক বানায়। হাদিসে স্পষ্টভাবে সন্তানের ধর্ম ও চরিত্র গ্রহণের ওপর মাতা–পিতার প্রভাবের কথা বলা হয়েছে। সুতরাং সন্তান যদি বখে যায় তাতে পিতা–মাতা তাদের দায় এড়াতে পারেন না। তাই তাদের এমনভাবে লালন–পালন করা জরুরি যেন সে আল্লাহ প্রদত্ত স্বভাবের সঙ্গে বেড়ে ওঠে এবং শয়তান তাকে দীন থেকে বিমুখ করতে না পারে। এরপরও সন্তানের আচরণে কখনো কষ্ট পেলে তাঁর জন্য বদ দোয়া করতে আল্লাহর রাসুল (সা.) নিষেধ করেছেন। কেননা তাৎক্ষণিক ক্ষুব্ধতার মধ্য দিয়ে হলেও পিতা–মাতার দোয়া আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে যায় এবং পরিণতিতে তা সন্তানের ইহকাল ও পরকাল বরবাদ করে দিতে পারে। আবু হোরায়রা (রা.)বর্ণিত একটি হাদিসে আছে রাসুল (সা.)বলেছেন কোন সন্দেহ নেই তিন ব্যক্তির দোয়া কবুল করা হয় : ১. পিতা–মাতার দোয়া, ২. মুসাফিরের দোয়া ও ৩. অত্যাচারিতের দোয়া। রাসুল (সা.)তাই নিজের জন্য ও সন্তানদের জন্য বদ দোয়া করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন তোমরা নিজের বিরুদ্ধে বদদোয়া করো না সন্তানের বিরুদ্ধে হাত তুলো না এবং সম্পদের বিরুদ্ধে প্রার্থনা করো না। হতে পারে এমন মুহূর্তে বদ দোয়া করেছ যখন কবুল হওয়ার সময়। আর আল্লাহ তা কবুল করে ফেলেছেন। রাসুল (সা.) তাই নিজের জন্য ও সন্তানদের জন্য বদ দোয়া করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন তোমরা নিজের বিরুদ্ধে বদদোয়া করো না সন্তানের বিরুদ্ধে হাত তুলো না এবং সম্পদের বিরুদ্ধে প্রার্থনা করো না। আমাদের দেশে অনেকেই না জেনে–বুঝে সন্তানসন্ততি আল্লাহর কাছে না চেয়ে বিভিন্ন মাজার, দরগাহ কিংবা পীরের কাছে প্রার্থনা করে। নানা ধরনের মানত করে সন্তান লাভের জন্য বিভিন্ন ধরনের উদ্ভট নিয়মকানুন পদ্ধতি ও রীতি–রেওয়াজ পালন করে। এগুলোর কোনোটাই ইসলাম সমর্থন করে না। আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ সন্তান–সন্ততি দিতে পারে এমন বিশ্বাস করা শিরক। আর শিরক হচ্ছে ভয়াবহ গোনাহ। মা–বাবার জন্য করণীয় : দান–সাদকাহ করা, নফল রোজা রাখা, তাদের প্রতি সওয়াব পৌঁছানোর জন্য হজ–ওমরাহ ও কোরবানি করা, তাদের ওছিয়ত পূরণ করা, তাদের বন্ধু–বান্ধবীদের সম্মান ও আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা, ঋণ পরিশোধ করা, কাফফারা আদায় করা, তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা, তাদের কবর জিয়ারত করা, কোনো গোনাহের কাজ করে গেলে তা বন্ধ করে দেয়া। সুসন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ নেয়ামত কখনো সন্তানকে বদ দোয়া করবেন না। মহান আল্লাহ আমাদের সন্তান লালন–পালন করার ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়ার তওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট।














