নুরের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিলেন প্রধান উপদেষ্টা

জড়িত কেউ রেহাই পাবে না : সরকারের বিবৃতি । বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত

| রবিবার , ৩১ আগস্ট, ২০২৫ at ৬:১০ পূর্বাহ্ণ

গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল শনিবার দুপুর ১টার দিকে তিনি নুরের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন বলে দলটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, আলাপচারিতায় নুর ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন সরকারপ্রধানের কাছে। এ সময় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ঘটনা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, প্রধান উপদেষ্টা আহত নুরুল হক নুরকে ফোন করেছিলেন। প্রথমে তার স্ত্রী ফোন রিসিভ করেন। প্রধান উপদেষ্টা নুর এবং তার সহকর্মীদের প্রতি সমবেদনা জানান, যারা এ ঘটনায় আহত হয়েছেন। তিনি সবাইকে সর্বোত্তম চিকিৎসা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছেন। খবর বাসস ও বিডিনিউজের।

সরকারের বিবৃতি : গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা নুরুল হক নুরের ওপর নৃশংস হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলেছেএই ঘটনার সাথে জড়িত কেউই ছাড় পাবে না এবং দ্রুততার সঙ্গে বিচার সম্পন্ন করা হবে। সরকারের পক্ষ থেকে হামলার নিন্দা জানিয়ে গতকাল এক বিবৃতি দেওয়া হয়। বিবৃতিতে সরকার বলছেকেবল নুরের ওপরই নয়, এই ধরনের সহিংসতা ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের ঐতিহাসিক সংগ্রামে জাতিকে একত্রিত করা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের স্পিরিটের ওপরেও আঘাত বলে মনে করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

এই নৃশংস ঘটনার একটি পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে সম্পন্ন করা হবে বলে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে দেশের জনগণকে আশ্বস্ত করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, প্রভাব বা পদমর্যাদা যাই হোক না কেন, জড়িত কোনো ব্যক্তি জবাবদিহিতা থেকে রেহাই পাবে না। স্বচ্ছতা এবং দ্রুততার সাথে এর বিচার সম্পন্ন করা হবে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, তাৎক্ষণিকভাবে নুরুল হক নুর এবং তাঁর দলের অন্যান্য আহত সদস্যদের চিকিৎসা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য একটি বিশেষায়িত মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তাঁদের সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রয়োজনে তাঁদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রাষ্ট্রীয় খরচে বিদেশে পাঠানো হবে। এই সংকটময় সময়ে নুর এবং তাঁর দলের আহত সদস্যগণ ও তাঁদের পরিবারের সঙ্গে পুরো জাতির প্রার্থনা এবং সংহতি রয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

২০১৮ সালে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে কোটা সংস্কার আন্দোলনে নুরুল হক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন উল্লেখ করে বিবৃতিতে সরকার বলেছেএকজন ছাত্রনেতা হিসেবে তিনি তরুণদের সংগঠিত করেছিলেন, বিভিন্ন মত ও কণ্ঠকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্ভীকভাবে দাঁড়িয়েছিলেন। চব্বিশের জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থান চলাকালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং হেফাজতে নিয়ে নির্মম নির্যাতন করা হয়। নুরের ভূমিকা একটি স্বাধীন, সুষ্ঠু এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্য আমাদের জনগণের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। তাঁর সাহস ও আত্মত্যাগ চিরকাল আমাদের জাতির ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে।

জনবিরোধী সকল ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সকল রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় আহ্বান জানিয়েছে সরকার। বিবৃতে বলা হয়এই সংকটকালীন সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সকল রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির প্রতি ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় আহ্বান জানায়। আমাদের সংগ্রামের অর্জন রক্ষা করতে, জনবিরোধী সকল ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে এবং গণতন্ত্রে আমাদের সফল উত্তরণ নিশ্চিত করতে সবার ঐক্যবদ্ধ হওয়া অপরিহার্য।

আগামী জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধেই অনুষ্ঠিত হবে, এমন নিশ্চয়তার কথা জানিয়েছে সরকার পক্ষ থেকে বিবৃতিতে উল্লেখ হয়, অন্তর্বর্তী সরকার দৃঢ়ভাবে নিশ্চিত করছে যে আগামী জাতীয় নির্বাচন যথাসময়ে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধেই অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশের জনগণের প্রতি এটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একনিষ্ঠ অঙ্গীকার। নির্বাচন বিলম্বিত বা বানচাল করার জন্য সকল ষড়যন্ত্র, বাধা অথবা প্রচেষ্টা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং আমাদের গণতন্ত্রপ্রেমী দেশপ্রেমিক জনগণ দৃঢ়ভাবে প্রতিহত করবে। জনগণের ইচ্ছা জয়ী হবে, কোনো অশুভ শক্তিকে গণতন্ত্রের পথে আমাদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে দেওয়া হবে না।

বিচার বিভাগীয় তদন্ত : গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের ওপর হামলার ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেছেন, কালকে যে ঘটনা ঘটলোআপনারা জানেন, গণঅধিকার পরিষদের প্রেসিডেন্ট নুরুল হক নুরের ওপরে ন্যাক্কারজনক একটা হামলা হয়। উনি অসুস্থ। উনার চিকিৎসা হচ্ছে। বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের গণঅধিকার পরিষদের ছাত্র পরিষদের নেতা নাজমুল হাসানের উপরও হামলা হয়েছে, উনিও ক্রিটিক্যালি ইনজুরড হন এবং রাশেদ খান ইনজুরড হয়েছেন। তারা বলছেন তাদের ৫০ জনের মত ইনজুরড হয়েছেন। এই ঘটনার উপরে একটি জুডিসিয়াল তদন্তের সিদ্ধান্ত হয়েছে। একজন হাই কোর্টের জাস্টিসের নেতৃত্বে তদন্ত হবে। এটার টার্মস অব রেফারেন্স এবং এটার আরো কোন মেম্বার থাকবে কি না জানিয়ে দেওয়া হবে।

গতকাল শনিবার বিকালে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার সামনে ব্রিফিংয়ে এ কথা জানান প্রেস সচিব। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে শনিবার যমুনায় অনুষ্ঠিত সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় জানিয়ে শফিকুল বলেন, বৈঠকে কয়েকজন উপদেষ্টার পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান এবং প্রধান উপদেষ্টার স্বরাষ্ট্র বিষয়ক বিশেষ সহকারী খোদা বখস চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

নুরের ওপর হামলার ঘটনায় আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের ফেসবুকে পোস্টে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এতে সরকারের দুর্বলতা প্রকাশ পাচ্ছে কি নাএমন প্রশ্নের জবাবে প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, এটা সরকারের দুর্বলতা নয়। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের পাশে ছিলেন। তিনি নুরের সঙ্গে বছরের পর বছর রাস্তায় আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি নিন্দা জানাতেই পারেন। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তিনি সবসময় সোচ্চার ছিলেন। সেই সময় নুরুল হক নুরও তার সহযোদ্ধা ছিলেন। শিক্ষার্থীদের যেকোনো আন্দোলনে আসিফ নজরুল সবসময় উপস্থিত ছিলেন। এ কারণেই ঘটনা শুনে তিনি নুরের চিকিৎসার খোঁজ নিতে ঢাকা মেডিকেলে গেছেন।

হামলা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতগণ অধিকার পরিষদের এমন দাবির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে প্রেস সচিব বলেন, তদন্ত কমিটি বিষয়টি খতিয়ে দেখবে। সাদা পোশাকের হামলাকারীর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা তদন্তাধীন। তবে আমি যা জানি, তিনি একজন পুলিশ কনস্টেবল এবং ডিউটিতে ছিলেন। বিস্তারিত জানতে পারবেন ডিএমপি থেকে।

এক সাংবাদিক বলেন, আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতাচ্যুত সরকার বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির কথা বলেছিল। এবারও প্রকাশ্য ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা না নিয়ে একইভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করছে সরকার। আদৌ কি কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে? জবাবে প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, তখনকার ঘটনা ছিল এক ধরনের নাটক। কিন্তু এখন আমাদের প্রতিটি কাজেই আন্তরিকতা রয়েছে। আমরা আমাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছি কি না, সে বিষয়ে আপনারা প্রতিবেদন করতে পারেন।

কাকরাইলের ঘটনায় জাতীয় পার্টির কোনো ভূমিকা ছিল কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রেস সচিব বলেন, তদন্ত কমিটি বিষয়টি যাচাই করবে। জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার যে দাবি উঠেছে, সে বিষয়ে সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছে কি না? জবাবে শফিকুল বলেন, এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। এক প্রশ্নের জবাবে শফিকুল আলম বলেন, আজকের মিটিংয়ে নির্বাচনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। জানানো হয়েছে যে, নির্বাচন যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ, ১৫ ফেব্রুয়ারির আগেই রোজার আগে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

পুলিশের তদন্ত কমিটি : এদিকে নুরের ওপর হামলার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এ ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত করার কথা প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে জানানোর পর ডিএমপির পক্ষ থেকে এ ঘোষণা এল।

গতকাল শনিবার বিকালে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, আগামীকাল (রোববার) ডিএমপির পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির সদস্য কতজন হবেন, সেখানে কারা থাকবেন কিংবা কত দিনের সময় কমিটিকে দেওয়া হবে, সেসব বিষয়ে রোববারই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে জানান এ পুলিশ কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, ওই ঘটনায় পুলিশের কোনো দুর্বলতা ছিল কিনা; কোনো সমস্যা বা গাফলতি ছিল কিনা, কমিটি সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনুরের জ্ঞান ফিরেছে
পরবর্তী নিবন্ধ২ নম্বর গেট মোড়ে ৩ ঘণ্টা অবরোধ, বিক্ষোভ