নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে জমিদার বাড়ির ‘তেরজুরি’

রশীদ এনাম | সোমবার , ৯ মার্চ, ২০২৬ at ৯:২৩ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বচন আছে ‘তেরজুরি বাই যারগুই’ ‘তোঁয়ার বদ্দিনিয়া তেরজুরি কামাই আছে নে’ লোকগীতি আছে ‘ও হায়রে হায়! তেরজুরি মারি যার গৈ রেঙ্গুইন্নার ছিপাই’। তেরজুরি মালিক ছিলেন প্রাচীনকালের জমিদার আলী আকবার চৌধুরী। একদা আরকানি আমলে বার্মার ডাকাতদল তেরজুরি লুণ্ঠন করেছিল।

তেরজুরি’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ধনভান্ডার, কোষাগার, খাজাঞ্চিখানা, রাজকোষ ইংরেজি ট্রেজারি। ‘তিজোরি’ শব্দটি উৎপত্তি হয়েছে ফারসি শব্দ পারসিয়ান ভাষা থেকে ফারসি শব্দtijori/tazira থেকে। হিন্দিতে এর অর্থ সিন্দুক যেখানে মূল্যবান জিনিস রাখা হয়। লেখক ও অধ্যাপক ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, ইংরেজরা উপমহাদেশে আইন প্রণয়ন করেছিল ফারসি, ইংরেজি, হিন্দুস্থানি ও বাংলা এই চারটি ভাষায়। আইনের অনেক টার্ম বাংলায় ভাবানুবাদ করা হয়েছিল, কিছু টার্মের তদ্ভব রূপও সৃষ্টি হয়েছিল, যেমন, লাট (লর্ড) আর্দালি (অর্ডার্লি) তেরজুরি (ট্রেজারি) ইত্যাদি। মূলত Treasury ইংরেজি শব্দটি চাটগাঁইয়া আঞ্চলিক ভার্সন তেরজুরি। আদিকালের জমিদারদের ব্যাংক বলা যায়। যেখানে জমিদারদের ধাতব মুদ্রা, পয়সা, সোনাদানা, ধনসম্পদ নজরানা, জমিদারদের উপঢৌকন, মূল্যবান জিনিসপত্র গচ্ছিত রাখা হতো। জমিদারদের মূল্যবান সম্পদ নিরাপত্তার কথা ভেবে তেরজুরি স্থাপন করা হয় জমিদার বাড়িতে।

অনেকটা বর্তমান সময়ের ব্যাংকিং ব্যবস্থার কিছুটা সাদৃশ্য প্রমাণ মেলে আধুনিক ব্যাংকে। যেমন ক্যাশ ভোল্টে টাকা সংরক্ষিত থাকে কিংবা ব্যাংকের লকারে স্বর্ণালংকার, জমির দলিলপত্রাদি জমা রাখার মতো। জমিদাররা তেরজুরি নির্মাণের জন্য নির্জন এবং দুর্গম জায়গা সুদৃঢ় কক্ষ বেছে নিতেন যাতে দূর থেকে দেখা না যায়। বাহির থেকে কেউ প্রবেশ করতে না পারে। তেরজুরির চতুর্দিকে সীমানা প্রাচীর থাকত যাতে কেউ প্রবেশ করতে না পারে। তেরজুরির ভেতরে তালাচাবি দিয়ে আটকানো থাকত নিরাপত্তার জন্য। সাধারণ লোকজন তেরজুরির কাছে যেতে পারত না কেননা এটি ছিল জমিদারদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি সুরক্ষা ব্যবস্থা যা আর্থিক সুরক্ষা ব্যতীত জমিদারদের নিজস্ব সম্পত্তির সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করত।

প্রাচীনকালের জমিদাররা ছিল প্রতাপশালী। জমিদারদের আর্থিক ও রাজনৈতি ক্ষমতা অনেকাংশে নির্ভর করত তেরজুরিতে সঞ্চিত অর্থের ওপর। তখনকার দিনে জমিদারদের অর্থ সম্পত্তি নিরাপদ রাখতে তেরজুরি ছিল অপরিহার্য।

প্রায় চারশত বছরের পুরানো ‘তেরজুরির’ ধ্বংসাবশেষ সন্ধান পাওয়া গেছে পটিয়া আজিমপুর গ্রামের প্রাচীন জমিদার আলী আকবর চৌধুরী বাড়িতে।

আলী আকবর চৌধুরী পরিবারের ইতিহাস থেকে জানা যায়, লোককবি আস্কর আলী পণ্ডিতের ফারসি থেকে অনুবাদক (তারিখি সৈয়দ আলী আকবর চৌধুরী) গ্রন্থে মূলত ইরান থেকে ১৪৬০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার সুলতানি আমলে সুলতান রুকুনউদ্দিন বারবাক শাহের আমলে নৌপথে হজরত সৈয়দ মুহাম্মদ সাদী আল কোমী আল মাশহাদী চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানার জোবরা গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। তিনি ছিলেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশধর ইমাম হুসাইন (রা.) ও ইমাম জয়নুল আবেদীন (.)-এর বংশধর। তখন চট্টগ্রামের শাসক ছিলেন রাস্তি খান তিনি সৈয়দ মুহাম্মদ সাদী আল কোমী মাশহাদীকে রুকুনউদ্দীন বারবাক শাহের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। পরবর্তীতে যখন আলাউদ্দীন হোসেন শাহ ক্ষমতা গ্রহণ করেন তখন সৈয়দ মুহাম্মদ আল কোমী আল মাশহাদীকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পদে নিয়োগ দেন। সেসময় থেকে সৈয়দ সাদী পরিবারের সাথে রাস্তি খানের পরিবারের সাথে আত্মীয়তার বন্ধন শুরু হয়, অনেকটা দু’পরিবারের সাথে বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে। ১৬ শতাব্দীর দিকে হাটহাজারী থেকে সৈয়দ মুহাম্মদ সাদী আল কোমী মাশহাদী (.)-এর পরবর্তী প্রজন্ম ইসলামি দাঈ শাহসুফি হজরত সৈয়দ মুহাম্মদ আজিম শাহ (.) দক্ষিণ চট্টগ্রামের চক্রশালা বা চাষখোলায় বসতি স্থাপন করেন। সেই থেকে আজিমপুর গ্রামের নামকরণ। সুফি বংশধর সৈয়দ মুহাম্মদ আজিম শাহর উত্তরসূরি আলী আকবর চৌধুরী।

পটিয়া সদর থেকে কচুয়াই হয়ে বাইপাস পেরিয়ে অলিহাট। অলিহাট পেরিয়ে গেলে আজিমপুর গ্রাম। সারি সারি তালগাছ, সুপারি, নারিকেল গাছ। মেঠো পথের দু’পাশে দূর্বা ঘাস। সবুজ ফসলি জমি নানা রকমের শস্যখেত, অপরূপ বাঁশবাগান, মটরশুঁটি, ফেরু, ফেলং, শিম, কচু, টমেটো, মরিচ, ধানিজমি। ছোটো ছোটো পুকুর। গাছে নানা রকমের বিহঙ্গের অভয়ারণ্য। পুকুরের পশ্চিম পাশে কালের সাক্ষী চৌধুরী বাড়ি। একটু সামনে গেলে ‘আলী আকবর চৌধুরী দিঘি’। অপর পাশে একটু দক্ষিণে ‘কালা চৌধুরী দিঘি’। বাড়ির আঙিনায় গাছে সবুজ পেয়ারা ঝুলে আছে। মুকুলে ভরা আম গাছ, পাশে গাব গাছ, বকুল ফুল গাছ। দুএকটা কাঠবিড়ালী পেয়ারা খেতে ব্যস্ত। আলী আকবর চৌধুরী জমিরদার বাড়িটি বর্তমান আজিমপুর গ্রামে অবস্থিত। জমিদার বাড়ির আয়তন কত সঠিকভাবে জানা যায়নি তবে লোকমুখে বলতে শুনা যায়, জমিদারদের কর্ণফুলির উত্তরপূর্ব থেকে শঙ্খ নদীর দক্ষিণ কূল পর্যন্ত তৎকালীন পুরানো জমিদারদের ছিল। আলী আকবর চৌধুরী বাড়ির প্রাচীনকালের শতবর্ষী মসজিদ,কবরস্থান, সমাধিগুলো অনেক পুরানো, দেখে চোখ জুড়িয়ে যাবে। ১৯৯৩ সালে কাদেরীয়া তরিকতের তাহের শাহ ছাহেব ‘তৈয়বিয়া আকবারিয়া ছুন্নিয়া মাদ্রাসার’ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করার জন্য। কবরস্থানের পাশে পাথরের খোদাই করা এপিটাফে মরহুম আতর আলি চৌধুরী, মরহুম জান আলি চৌধুরী, মরহুম চুন্নু মিঞা চৌধুরী, মরহুম মোজাফফর আহম্মদ চৌধুরী, মরহুম আবজল আহম্মদ চৌধুরী, মরহুম একে এম ফজলুল কবির চৌধুরী, মরহুম আলমগীর চৌধুরী, মরহুমা মজলিশ খাতুন, মরহুমা রশিদানেছা, মরহুমা লায়লা বেগম।

অলি হাটের দক্ষিণপূর্বে বিশাল দুটি দিঘি, আলী আকবর চৌধুরী দিঘি অপরটি কালা চৌধুরী দিঘি। দিঘি নিয়ে রূপকথার গল্পও আছে, আগেকার দিনে বিয়েশাদি তথা নানান আচার অনুষ্ঠানে দিঘি থেকে তামাপিতলের তৈরি হাঁড়িপাতিল ভেসে উঠত। অনুষ্ঠান শেষে আবার হাঁড়িপাতিলগুলো দিঘিতে ভাসিয়ে দেওয়া মাত্রই হাঁড়িপাতিলগুলো চোখের পলকে দিঘিতে অদৃশ্য হয়ে যেত। কোনো একসময় গ্রামের কেউ একজন একটি পাত্র চুরি করে রেখে দেয় সেই থেকে আর ভেসে ওঠেনি। কালা চৌধুরীর দিঘিতে জমিদার পরিবার থেকে পূর্বসূত্রে পাওয়া একটা মূল্যবান সিন্দুক ছিল, সিন্দুকটি শিকল দিয়ে বাঁধা থাকত। সিন্দুকের ভেতর ধাতব মুদ্রা স্বর্ণালংকারও ছিল। কোনো ভাইদের মধ্যে সম্পদ নিয়ে হিসাবের গরমিলের কারণে ভুল বোঝাবুঝি হয় সেদিন সিন্দুকটি শিকল ছিঁড়ে কালা চৌধুরী দিঘিতে অলৌকিকভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়।

আলী আকবর চৌধুরী পরিবারের উত্তরসূরি রসায়নবিদ গোলাম মওলা চৌধুরীর পাকা বাংলো বাড়ি। উঠোনে টিনের তৈরি ধানের গোলা, বাড়ির চারদিকে সবুজে ঘেরা, নানা রকমের ফুলফলের গাছ, আমজাম, বকুল পেয়ারা গাছ। আমগাছে মুকুল এসেছে। মুকুলের মম গন্ধে মৌমাছিরা আমের মুকুলের চারপাশে মধু সংগ্রহের জন্য দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। উঠোনে ঝরে পড়া শুকনো পাতার স্তূপ। পায়ের পাতা পড়াতে শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনি কানে এলো। নিরিবিলি সুনসান ছবির মতো বাড়িটির এক এক কোণে ‘তেরজুরির ধ্বংসাবশেষ’ চোখে পড়ল। এটি পটিয়ার সবচেয়ে পুরানো স্থাপত্য আকবর আলী চৌধুরী জমিদার বাড়ির ‘তেরজুরি’। টালি ইট দিয়ে তৈরি শ্যাওলা ও আগাছায় ভরতি দেওয়াল। তেরজুরি কুঁড়েঘরের মাঝখানে গর্ত। তেরজুরির চতুর্দিকে বিশাল জায়গাজুড়ে একসময় সীমানা প্রাচীর ছিল। যাতে তেরজুরি কেউ ডাকাতি করতে না পারে। সীমানা প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ আছে। বাড়ি থেকে একটু সামনে গেলে প্রাচীন মসজিদ, শাঁনবাধানো ইটের তৈরি দিঘি। কবরস্থান, কিছু পুরানো সমাধি।

কালের সাক্ষী পটিয়া আজিমপুর গ্রামের আকবর আলী চৌধুরী তেরজুরি বা ট্রেজারি ছিল মূলত প্রাচীন জমিদারদের টাকাপয়সা, প্রাচীন মুদ্রা, স্বর্ণালংকার, ধনদৌলত জমা রাখার সংরক্ষিত একটা কক্ষ। যা অনেকটা ব্যাংকিং ব্যবস্থার মতো, তৎকালীন জমিদারদের মূল্যবান সম্পদ ও আর্থিক নিরাপত্তা এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করেছিল। কালের বিবর্তনে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর বর্তমান সময়ের ব্যাংকিং ব্যবস্থার উন্নতির সাথে তেরজুরি অনেকটা নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। কিন্তু রয়ে গেছে ‘তেরজুরির’ ধ্বংসাবশেষ যা প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর ও আগামীর স্থাপত্যশিল্পের গবেষণার জন্য শেষ স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংসাবশেষটি যা সংরক্ষণ করা জরুরি।

তথ্যঋণ : রসায়নবিদ গোলাম মওলা চৌধুরী, লেখক ও গবেষক আয়তুল্লাহ সোলায়মান চৌধুরী আজিমপুরী

পূর্ববর্তী নিবন্ধরাশেদ রউফ-এর অন্ত্যমিল
পরবর্তী নিবন্ধপারাজানভ : সিনেমার যাদুকর ও এক অবিনশ্বর শিল্পসত্তা