নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশের বিরুদ্ধে ‘অভিযোগের পাহাড়’

কোটি কোটি টাকার সম্পদ অর্জন, টেন্ডার জালিয়াতিসহ দুদকে নানা অভিযোগ তার দফতরের ক্যাশিয়ার রতন কুমারের রতনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার মিথ্যা অভিযোগ : পলাশ

হাসান আকবর | মঙ্গলবার , ৬ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৪:২৪ পূর্বাহ্ণ

একটি কথা প্রচলিত আছে, অসুস্থ হলে চিকিৎসাসেবা প্রদান করে স্বাস্থ্য বিভাগ, আর একজন মানুষ যাতে অসুস্থ না হয় সেই চিকিৎসা দেয় জনস্বাস্থ্য বিভাগ। দেশের গুরুত্বপূর্ণ জনসেবা প্রতিষ্ঠান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) ‘দুর্নীতির ক্যানসারে আক্রান্ত’। এই প্রতিষ্ঠানের চট্টগ্রাম অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ চন্দ্র দাশের বিরুদ্ধে উঠেছে ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার জালিয়াতি, কোটি কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, ঘুষ গ্রহণ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ। শুধু চট্টগ্রামে নয়, খাগড়াছড়ি অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকাকালে তিনি পাহাড়ি জনপদের লাখো মানুষের সুস্থ থাকার জন্য বরাদ্দ করা টাকারও অপব্যবহার করেছেন। সরকারের যাবতীয় সদিচ্ছা তার কারণে মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এসব অভিযোগ শুধু ভুক্তভোগীদের নয়, খোদ ওই নির্বাহী প্রকৌশলীর দফতরের ক্যাশিয়ার রতন কুমার দেবনাথ দুদকে লিখিতভাবে এসব অভিযোগ উত্থাপন করেছেন।

সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ চন্দ্র দাশ তিন বছরের বেশি সময় ধরে চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে তিনি দীর্ঘ সময় চট্টগ্রামের পাশাপাশি খাগড়াছড়ি অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলীর অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন। বিগত সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠ থাকায় তিনি সুবিধাজনক পোস্টিং নেয়ার পাশাপাশি ক্ষমতার অপব্যবহার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্বাহী প্রকৌশলীর পদমর্যাদা ও আওয়ামী রাজনীতির প্রভাব ব্যবহার করে তিনি চট্টগ্রাম এবং খাগড়াছড়িতে একটি সংঘবদ্ধ দুর্নীতির নেটওয়ার্ক তৈরি করেছেন, যার শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত।

অভিযোগ করা হয়েছে, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ চন্দ্র দাশের বাড়ি ফেনীতে। বিগত সরকারের ফেনীর প্রভাবশালী এক নেতার মাধ্যমে তিনি প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। এতে করে জনস্বাস্থের অনেক শীর্ষ কর্মকর্তাকেও তিনি পাত্তা না দিয়ে নিজের ইচ্ছেমতো সরকারের কোটি কোটি টাকা নয়ছয় করেছেন।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান কাজ হলো দেশের সাধারণ মানুষের কাছে নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও তদারকি করা, যার মধ্যে আর্সেনিকমুক্ত পানির উৎস তৈরি, স্যানিটারি ল্যাট্রিন স্থাপন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে কারিগরি সহায়তা প্রদান অন্তর্ভুক্ত, যাতে রোগ প্রতিরোধ ও জনস্বাস্থ্য উন্নত হয়। নিরাপদ পানীয় জলের উৎস যেমন গভীর নলকূপ স্থাপন, আর্সেনিকযুক্ত এলাকায় বিকল্প নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা এবং পানির গুণগত মান পরীক্ষা করার পাশাপাশি প্রতিটি পরিবারে স্যানিটারি ল্যাট্রিন স্থাপন নিশ্চিত করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানে পাবলিক ল্যাট্রিন নির্মাণ এবং স্যানিটেশন বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করার কাজগুলো সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে দিয়ে করায়। এছাড়া পানি ও স্যানিটেশন সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রকল্পের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ করা, বিশেষ করে দুর্যোগ বা আপৎকালীন দ্রুত সেবা প্রদানের পাশাপাশি পানি ও স্যানিটেশন সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের অন্যান্য বিভাগ, স্থানীয় সরকার এবং বেসরকারি সংস্থাকে কারিগরি সহায়তা প্রদান করে। জনগণের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে, রোগ প্রতিরোধে এবং জনস্বাস্থ্য মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানটি একটি গণমুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত।

কিন্তু চট্টগ্রাম এবং খাগড়াছড়িতে দায়িত্ব পালনকালে নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ চন্দ্র দাশ নিজের ইচ্ছেমতো সবকিছু করেছেন। গড়ে তুলেছেন একটি সংঘবদ্ধ ঠিকাদার চক্র। যাদের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার হরিলুট চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

জনস্বাস্থ্যের প্রায় প্রতিটি কাজ গুটিকয়েক ঠিকাদারের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে দিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী লাখ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন। এই ঘুষ নিতেন খাগড়াছড়ি অঞ্চলের ক্যাশিয়ার রতন কুমার দেবনাথের মাধ্যমে। সেই টাকা নানাজনের কাছে পাঠাতেন রতনের মাধ্যমে। এর একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার হতো। নিজের নামে কোনো সম্পদ না করে মামা শ্বশুরসহ নানা আত্মীয়স্বজনের নামে করেছেন। ফেনীতে করেছেন বিশালাকারের ডুপ্লেঙ বাড়ি। চট্টগ্রাম ও ঢাকায়ও তার সম্পদ রয়েছে।

তার ক্যাশিয়ার রতন কুমার দেবনাথ দুদক চেয়ারম্যান বরাবরে অভিযোগ দিয়ে পলাশ চন্দ্র দাশের ঠিকাদারি সিন্ডিকেট, নিজের হাতে লেখা ঘুষের ভাগবাটোয়ারাসহ বিস্তারিত তথ্যউপাত্ত উপস্থাপন করে নিজেই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন।

দুদক চেয়ারম্যানের কার্যালয় চিঠিটি গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছে।

পলাশ চন্দ্র দাশের দুর্নীতির কারণে সরকারের গণমুখী বহু সদিচ্ছার অপমৃত্যু ঘটেছে বলে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, কাজ না করিয়েও কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ চন্দ্র দাশ বলেন, বিষয়গুলো সত্যি নয়। ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তার বিরুদ্ধে এসব কথা বলা হয়েছে। রতন কুমার দাশের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ায় রতন মিথ্যা অভিযোগ করেছেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকৌতুক কণিকা
পরবর্তী নিবন্ধভেনেজুয়েলা ইস্যুতে বাংলাদেশের উদ্বেগ প্রকাশ