নির্বাচন নিয়ে কোনোরকম শঙ্কা নেই উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে কোনোরকম শঙ্কা নেই–এক লাইনের উত্তর। বরং ভোটাররা ভোট দিতে ভোটকেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে আছেন। অতীতে যে নেতিবাচক নজির ও ইতিহাস ছিল, সামনে তার পুনরাবৃত্তি হবে না ইনশাআল্লাহ।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে চট্টগ্রাম আইনশৃঙ্খলা সেলের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে তিনি সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। কোনো গোষ্ঠী বা দলের অপকর্ম করে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে অভিযানগুলো করবেন, তা মিডিয়ায় দিয়ে দেবেন। কোনো গোষ্ঠী বা দল যদি অপকর্ম করে পার পেয়ে যেতে চায়, তাহলে তারা যেন উৎসাহিত বোধ না করে। কারণ, তারা জানবে, অপকর্ম করলে ধরা পড়তে হবে এবং এটা জাতীয় বিষয় হয়ে যাবে। আমরা চাই, রাজনৈতিক দলগুলো আইন মেনে উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন করুক।
আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, কোথাও পক্ষপাতদুষ্টতার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে মনে রাখবেন ইলেকটোরাল ইনকোয়ারি কমিটি আছে। আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব। যেগুলো রাজনৈতিক বক্তব্য সেগুলোর বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। কিন্তু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে আমাদের কমপ্লেইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম আছে, উনারা যথাযথ পদ্ধতিতে অভিযোগ করলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়ে তিনি বলেন, ১৩ ডিসেম্বর থেকে ডেভিল হান্ট ফেইস–টু যেটা শুরু হয়েছে, সেখানে এখন পর্যন্ত দুই শতাধিক অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। আমরা এটাকে আরও জোরদার করতে চাচ্ছি। আপনারা জানেন, আমাদের যৌথবাহিনীর অভিযান চলমান আছে। সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন আছে। যৌথবাহিনীর অভিযানকে আরও গতিশীল করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছি, যেটা অতি শীঘ্রই আপনারা দেখতে পাবেন। এই সপ্তাহ থেকেই দেখতে পাবেন। বিশেষ করে ১৫ তারিখের পর থেকে এটা আরও বেড়ে যাবে। আমরা আশাবাদী যে, সেখানে সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আরও গতিশীলতা আসবে।
জুলাই অভ্যুত্থানে লুট হওয়া অস্ত্র যেগুলো উদ্ধার হয়নি তা উদ্ধার হওয়া জরুরি উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশনার বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এক ধরনের গান (অস্ত্র) রানিং হয়। অস্ত্রের একটা সঞ্চালন দেখা দেয়। সন্ত্রাসীদের কদর বেড়ে যায়। জুলাই অভ্যুত্থানের পর এখনো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। ৮৫ শতাংশের কাছাকাছি অস্ত্র উদ্ধার হলেও এখনো আনুমানিক ১৫ শতাংশ অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি। এগুলো খুঁজে পেতে হবে। শতভাগ খুঁজে পাবেন তা আশা করা যায় না। তবে যারা এগুলো নিয়েছে, তাদের চিহ্নিত করতে বা উদ্ধার করতে পারলে মানুষের মধ্যে আস্থা বাড়বে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও সীমান্ত ‘সিল’ করে দেওয়ার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক কিছু কর্মকাণ্ড নিরাপত্তা পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। কেউ যদি কোনো অস্ত্র সীমান্তের ওপার থেকে নিয়ে এসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঢুকিয়ে ফেলে, সহজে এটাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। একটা বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে, একটা গোষ্ঠী যদি অস্ত্র ব্যবহার করে নাশকতা করতে চায়, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ব্যবহার করলে তাকে ধরা খুব কঠিন। কোনো রোহিঙ্গার কাছে কোনো অস্ত্র থাকলে সেটার দাম বেড়ে যায় এবং সেটা সহজে ব্যবহার করা যায়। রোহিঙ্গাদের চলাচলে অবশ্যই আমাদের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও বর্ডারকে সিল করে দিতে হবে।
আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ভোটের সময় রোহিঙ্গারা যেন কোনোভাবেই মিছিল–মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করতে না পারে এবং অপরাধে তাদের যেন কেউ ব্যবহার করতে না পারে। এজন্য ভোটের আগে ও পরবর্তী কয়েকদিন উখিয়া–টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে সিল করে রাখতে হবে।
আঞ্চলিক এবং ভৌগলিক কারণে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিশেষত্ব তুলে ধরে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, অর্থনৈতিক কার্যক্রমও এটার সাথে রিলেটেড। এটা দিয়ে মূল বাণিজ্য সম্পাদন হয়ে থাকে। সার্বিকভাবে চট্টগ্রামের বিষয়টা লোকাল না, এটা ন্যাশনাল। তিনি বলেন, এ এলাকাকে ব্যবহার করে অস্ত্র ও মাদকের পরিবহন হয়ে থাকে। যারা কিডন্যাপিংয়ের সাথে জড়িত আছে, তারাও এ এলাকাকে ব্যবহার করে থাকে। চট্টগ্রাম এলাকার ভূমিরূপ একটা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এখানে সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন কার্যক্রম ঘটিয়ে খুব সহজেই লুকিয়ে যেতে এবং মানুষের মাঝে মিশে যেতে পারে।
নির্বাচন ঘিরে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল যেন সংখ্যালঘুদের ব্যবহার করতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এ এলাকায় (চট্টগ্রাম) সংখ্যালঘুদের আবাস আছে। নির্বাচনকে ঘিরে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল সংখ্যালঘুদের মাঝে বিভিন্ন ঘটনা ঘটানোর প্রয়াস চালাতে পারে। অতীতেও এমন ঘটনা ঘটেছে। সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
আচরণবিধি প্রতিপালন নিয়ে প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোকে ধন্যবাদ জানিয়ে নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ বলেন, দল এবং প্রার্থীদের আচরণবিধি প্রতিপালনে যা যা করা দরকার সেটা করছি। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের ধন্যবাদ দিতে পারি। সার্বিকভাবে দেশের সকল স্থানে তাদের মধ্যে আচরণবিধি প্রতিপালনের বিষয়টি দেখতে পাচ্ছি, যেটা একটা ভালো লক্ষণ। আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অন্তর্কোন্দলের বিষয়টি কম দেখতে পাচ্ছি। আমরা দেখতে চাই, নির্বাচন যত সামনে আসবে তত যেন কোন্দল না বাড়ে। আমরা যেন সত্যিকার অর্থে একটা উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচনটা করতে পারি–এটাই জাতির দাবি, সময়ের দাবি। আমরা বিশ্বাস করি, রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরা এটা অনুধাবন করেন।
গুজব–অপতথ্য রোধে গণমাধ্যমকর্মীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সঠিক তথ্য সঠিক সময়ে তুলে ধরা গণমাধ্যমের বড় দায়িত্ব। অপতথ্য ও গুজব রোধে সাংবাদিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। অপতথ্য ছড়ানো যেমন অপরাধ, তেমনি অপতথ্য শেয়ার করাও অপরাধ–এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দীন, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা, জেলা পুলিশ সুপার নাজির আহমদ খাঁন প্রমুখ।












