নির্বাচন দোরগোড়ায় নারীর ক্ষমতায়ন প্রশ্ন

ডেইজী মউদুদ | শনিবার , ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৬:৫২ পূর্বাহ্ণ

আর কয়দিন পরেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। সকলের প্রত্যাশা একটি অবাধ, নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্র ফিরে আসবে। জনগণ নিজের ভোট পছন্দের প্রার্থীকেই দেবেন। তো এবারের নির্বাচনে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং জামায়াত ছাড়া কিছু ছোট ছোট দলও অংশগ্রহণ করেছে। দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ ছাড়া এবারের নির্বাচন ব্যতিক্রমী এক নির্বাচন। দীর্ঘকাল ক্ষমতা ধরে থাকায় দেশে এক দলীয় শাসন ব্যবস্থায় গণতন্ত্র ছিল না। ভোটের যে উৎসব সেটিও ছিল না। এখন এই নির্বাচনে আসলে কি হবে, কি হতে যাচ্ছে, তাও বোঝার কোন উপায় নেই। কিন্তু নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী জামায়াতের আমীর নারীদের রাজনীতি নিয়ে যেসব নেতিবাচক কথাবার্তা বলছেন, সেগুলো এই সময়ে নারী সমাজকে হতাশায় ফেলে দিয়েছে। প্রায় ৪৭% শতাংশ ভোটার নারী। দলের প্রচার প্রচারণায়ও নারীদেরই প্রাধান্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন এমন আপত্তিকর ও অশালীন বক্তব্য ভাইরাল হচ্ছে, যা দেখলে হতাশা গ্রাস করে। এখন আসি ইসলামের কথায়। ইসলামের প্রথম শহীদ নারী সুমাইয়া (রা.) এর শাহাদাতকে আমরা ধর্মীয় আবেগের ভেতর সীমাবদ্ধ করে ফেলি। কিন্তু ইতিহাসের এই ঘটনা কেবল বিশ্বাসের নয়, এটি একটি গভীর রাজনৈতিক পাঠ। কেননা তিনি নিহত হয়েছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, ক্ষমতার বিরুদ্ধে সত্যে অটল থাকার অপরাধে। মক্কার শাসকগোষ্ঠী তখন ধর্ম, গোত্র ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বএই তিন শক্তিকে একত্র করে ভিন্নমত দমন করেছিল।

ইসলাম তাদের কাছে শুধু আধ্যাত্মিক আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামোর জন্য সরাসরি হুমকি। তাই দমন ছিল অনিবার্য। এবং সেই দমনের সবচেয়ে দুর্বল এবং দৃঢ় লক্ষ্য হয়েছিলেন সুমাইয়া (রা.)। ইতিহাসে আবু জাহেলকে আমরা একজন নিষ্ঠুর ব্যক্তি হিসেবে দেখি। কিন্তু বাস্তবে তার পাশাপাশি তিনি ছিলেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতীকএকটি ব্যবস্থার প্রতিনিধিযেখানে ভিন্নমতকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতো। এখনো যখন রাষ্ট্র নির্যাতনকে ‘শৃঙ্খলা রক্ষা’, ভিন্নমতকে ‘রাষ্ট্র বিরোধিতা’ এবং প্রশ্ন করাকে ‘অস্থিতিশীলতা’ বলে চিহ্নিত করা হয়, তখন আবু জাহেল আর অতীত থাকে না। ফিরে আসে নীতি আইন ও ভাষ্যের ভেতর দিয়ে। রাজনীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক ভ্রান্তি হলো, এই ধারণা যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা, মানেই ন্যায্যতা। মক্কায় কুরাইশরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ ও শক্তিশালী। কিন্তু নৈতিক বৈধতা ছিল সংখ্যালঘু, নির্যাতিত মুসলিমদের পাশে। সুমাইয়া (রা.) এর শাহাদাত এই সত্যই স্মরণ করিয়ে দেয়ক্ষমতা সত্য নির্ধারণ করে না, বরং সত্যই ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করে। অনেকেই ধৈর্যকে রাজনৈতিক নীরবতার সাথে গুলিয়ে ফেলেন। কিন্তু আমাদের নবীজী (.) যে ধৈর্যের শিক্ষা দিয়েছিলেন, তা আত্মসমর্পণ নয়; ছিল নৈতিক প্রতিরোধ। সুমাইয়া (রা.) কোন অস্ত্র হাতে তুলে নেননি। কিন্তু তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। এই অটল অবস্থানই রাষ্ট্রীয় জুলুমের জন্য সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রতিবাদ। নারীর উপর চালানো এই নির্যাতনের ভেতরেও এটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তাক্ষমতা সবসময় নারীর কণ্ঠ, শরীর ও সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এতোকাল পরেও বলা হচ্ছে, রাজনীতি মেয়েদের বিষয় না, চুপ থাকাই নিরাপদতখন সুমাইয়া (রা.)-র শাহাদাত এর সেই ধারণাকে ভেঙে দেয়। তিনি প্রমাণ করেছিলেন নৈতিক সাহসের কোন লিঙ্গ নেই। সমসাময়িক বাস্তবতায় সুমাইয়া (রা.)-এর শাহাদাত আমাদের জন্য এক অস্বস্তিকর অথচ জরুরি কিছু প্রশ্ন রেখে যায়। যেমন: . রাষ্ট্র কি প্রশ্নের উর্ধ্বে? . ধর্ম কি ক্ষমতার ঢাল হতে পারে? . নাগরিকদের দায়িত্ব কি কেবল মানিয়ে নেয়া? না, ইতিহাস তা বলে না। আসলে একজন সাধারণ নারীও ইতিহাসের নৈতিক ভারসাম্য বদলে দিতে পারেন যদি তিনি সত্যের জায়গা ছেড়ে না যান। সুমাইয়া (রা.) কোন রাজনৈতিক দল করেননি ঠিকই, তিনি কিন্তু রাজনীতির সীমারেখা এঁকে দিয়েছিলেন। রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি করতে পারে, কিন্তু সত্যের সামনে রাষ্ট্রও জবাবদিহিতার বাইরে নয়। সুমাইয়া (রা.) শহীদ নন। তিনি আজকের রাজনীতির বিবেক। আমাদের দলীয় প্রার্থীদের এই বিষয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী এবং নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরি জরুরি বলে মনে করছি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমসজিদ আদর্শিক সমাজ নিয়ন্ত্রণের চালিকা শক্তি
পরবর্তী নিবন্ধরান্নাঘর থেকে করপোরেট অফিস স্থানীয় নারীদের ভাষাগত ও পেশাগত উত্তরণ