নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় প্রতিশ্রুতির বন্যা এবং বাস্তবতা

নেছার আহমদ | মঙ্গলবার , ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৭:৩৮ পূর্বাহ্ণ

ইতিমধ্যে দেশে নির্বাচনী প্রচারপ্রচারণা বেশ জমে উঠেছে। দেশ জুড়ে বইছে ‘নির্বাচনী হাওয়া’। ইতিমধ্যে দেশের নির্বাচনী পরিবেশ ক্রমশ তপ্ত হয়ে উঠছে। গণমাধ্যমে যেসব খবর প্রকাশিত তাতে জনগণের মনে শঙ্কা বাড়ছে। নির্বাচনে পক্ষপ্রতিপক্ষের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে কথা হবে। তাদের প্রতিশ্রুতি ভোটারদের কাছে পৌঁছে দেবেন। এটাই নীতি। কিন্তু এই কথাই যখন বাদানুবাদে পরিণত হয়, যদি থাকে আক্রমণ ও প্রতি আক্রমণের ঝাঁঝ, তাতেই বাঁধে বিপত্তি। বাদানুবাদ তখন হয়ে উঠে সংঘাতের উৎস। নির্বাচনী প্রচারে এখন প্রার্থী ও নেতাদের কথায় এই ঝাঁঝটাই প্রতিনিয়ত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেক জায়গায় সংঘাত ও প্রাণহানির খবর আসছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচনায় আসছে দেশের তরুণ সমাজ। দেশের মোট ভোটারের একটি বড় অংশ তরুণ। নতুন ভোটারদের বড় অংশই এই তরুণ প্রজন্ম থেকে আসছে। যার কারণে তরুণরা কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবে, কাকে ভোট দেবে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কীভাবে যুক্ত হবে তা কেবল নির্বাচনী ফলাফলেই নয়, বরং ভবিষ্যৎ রাজনীতির চরিত্রও নির্ধারণ করবে। নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ যথই ভাড়ছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, এ নির্বাচনের অন্যতম গতি নির্ণায়ক শক্তি দেশের তরুণ সমাজ। তরুণরা এখন আর কেবল ভোটার তালিকার একটি সংখ্যা নয়। তারা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী তরুণ ভোটার মোট ভোটারের প্রায় এক তৃতীয়াংশ। এ সংখ্যাটি রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে দেওয়ার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেটি, সেটি হলো বর্তমান সময়ের তরুণ প্রজন্মের মনমানসিকতা আগের প্রজন্মের চেয়ে একটু ভিন্ন। তারা দলীয় আনুগত্যে আটকে থাকতে চায় না। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রশ্ন করতে শিখেছে এবং নিজের ভবিষ্যতকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী।

বিগত নির্বাচন সমূহে তরুণদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম ছিল, সে সময় অনাস্থা, সহিংসতার শঙ্কা ও ভোটের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ কাজ করছে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তরুণরা সে অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছে। কারণ কর্মসংস্থান সংকট, বেকার জীবন, জীবনযাত্রায় ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা প্রভৃতি বিষয়ে তাদের বুঝতে হচ্ছে রাজনীতি সচেতনতা না থাকলে নিজেদের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত অন্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া।

বর্তমান সময় বিবেচনায় দেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার নাম হলো ‘তরুণ সমাজ।’ সম্ভাবনা যদি সঠিক সিদ্ধান্ত সচেতন অংশগ্রহণ ও নৈতিক অবস্থানের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয় তাহলে নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, দেশ গঠনের একটি শক্ত ভিত হয়ে উঠবে। বর্তমান তরুণ সমাজ আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশি সচেতন। এমন কি প্রযুক্তি নির্ভর এবং তথ্য প্রবাহের সঙ্গেও তারা ওতোপ্রোত ভাবে যুক্ত। তারা এখন আর শুধু অনুসারী হতে চায় না। তারা প্রশ্ন করতে চায়। যুক্তিজগতে এবং সিদ্ধান্তের দায় নিজের কাঁধে নিতে আগ্রহী। তারা বর্তমানে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক স্টক হোল্ডার।

এসব প্রেক্ষিতেই বলা যায়, বাংলাদেশের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন তরুণদের জন্য একটি পরীক্ষা। তারা কি কেবল দর্শক থাকবে, নাকি সক্রিয় অংশীদার হবে? তারা আবেগে সিদ্ধান্ত নেবে, নাকি যুক্তি বিবেচনায় থাকবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্র কোন পথে যাবে? তরুণরা যদি সচেতনভাবে প্রার্থী বাছাই করে, দায়িত্বশীলভাবে ভোট দেয় এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সক্রিয় থাকে, তাহলে তারা কেবল একটি সরকার নির্বাচন করবে না, তারা একটি উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি স্থাপন করবে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে জনমনে বিশেষ করে সচেতন তরুণদের মাঝে যে বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে তা হলো দ্বৈত নাগরিক সমস্যা।

রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসা আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে বৈধঅবৈধ বিতর্কে ‘দ্বৈত নাগরিকত্ব’, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এ বিতর্ক নিছক আইনি জটিলতায় সীমাবদ্ধ নেই। রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য, রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার মতো মৌলিক প্রশ্নগুলোও সামনে এনেছে। মূল প্রশ্নটি যদিও খুব সরল, যিনি আইন প্রণয়ন করবেন; রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে অংশ নেবেন, তিনি কি এককভাবে বাংলাদেশের আইন ও সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবেন নাকি অন্য কোনো রাষ্ট্রের আনুগত্য পোষণ করবেন? প্রশ্নটি এখন আরও তীব্র হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমে। উপদেষ্টা পরিষদ এবং সংস্কার কমিশনে দ্বৈত নাগরিকত্বধারী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি দেশে দ্বৈত মানদণ্ড তৈরি করেছে। যা ইচ্ছা করলে সহজেই এড়ানো যেত। একদিকে সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে দ্বৈত নাগরিকত্বকে অযোগ্যতার প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। অন্যদিকে রাষ্ট্র সংস্কারের মতো গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবসম্পন্ন প্রক্রিয়ায় দ্বৈত নাগরিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রাখা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, একটি শ্রেণি বিদেশী নাগরিকত্ব গ্রহণ করেও দেশে ক্ষমতা, সম্পদ ও প্রভাব ধরে রাখে। তাদের পরিবার, সন্তান, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ অনেক ক্ষেত্রেই বিদেশে সুরক্ষিত। ফলে ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছায় ভুল হলে বা জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হলে দেশ ত্যাগ বা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার বাস্তব সুযোগ খোলা থাকে। এই প্রবণতা বা সম্ভাবনা শাসন ব্যবস্থার ভেতরে স্থায়ী দুর্বলতা তৈরি করে। সময় এসেছে বিষয়গুলো নিয়ে স্পষ্ট বক্তব্য থাকা দরকার। রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো ‘কর্পোরেট প্রজেক্ট’ নয়। যেখানে বাইরে থেকে ‘গ্লোবাল ট্যালেন্ট’ এনে বসালেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। রাষ্ট্র চলে জবাবদিহি, রাজনৈতিক ঝুঁকি এবং পরিণতির মুখোমুখি হওয়ার সক্ষমতার ওপর। সে কারণেই একজন সংসদ সদস্য বা নীতি নির্ধারকের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা শুধু দক্ষতার সাথে সীমিত থাকে না। তাকে জনগণের নিকট জবাবদিহিতার মধ্যে থাকতে হয়।

বিশ্বের বহুদেশ বাস্তবতার প্রেক্ষিতে নাগরিকত্ব নীতিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। জাপান ও সিঙ্গাপুর দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকার করেন। ভারত বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভারতীয় নাগরিকত্ব বাতিল করে। ইউরোপের অনেক দেশে দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকলে নাগরিকত্ব পুনঃ মূল্যায়ন করা হয়। দ্বিতীয় দেশের নাগরিকত্ব কোনো সুবিধার কাজ নয় বরং এটি দ্বিতীয় দেশের প্রতি নাগরিকের দায়িত্ব। শপথ এবং আনুগত্যের সম্পর্ক যা দেশকে বিপদগ্রস্ত করতে পারে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এ বিষয়ে এখন স্পষ্ট নীতিগত ও আইনি অবস্থান জরুরি হয়ে পড়েছে। যা এখন আইনে আছে তার পরিধি বাড়িয়ে সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব, নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ সহ নীতিনির্ধারণ ও রাষ্ট্রের ভেতরের কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় সকল ক্ষেত্রে একক নাগরিকত্ব ও পুনঃ দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্তর্বর্তী সরকার দ্বৈত নাগরিকদের সংস্কার কমিশনে রেখে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তা দেশের জন্য এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংকট তৈরি করবে এবং এ বিভ্রান্ত দীর্ঘ মেয়াদি রাজনীতির ওপর তরুণদের আস্থা আরো দুর্বল করে তুলবে। তরুণ প্রজন্ম শুধু উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বা সংস্কারের ভাষণ শুনতে চায় না। তারা জবাবদিহির দায়বদ্ধতার জায়গাগুলো সুস্পষ্ট দেখতে চায়। ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে এমন সব যোগ্য লোকদের থাকা প্রয়োজন যাদের ভবিষ্যৎ এই দেশেই বাধা এবং এদেশেই যাদের একমাত্র ঠিকানা। রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তাদেরই হওয়া উচিত।

আমরা আশাকরি র্বর্ণিত বিষয়াবলী সচেতনভাবে নজরে রেখে তরুণ প্রজন্ম তাদের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এবং সুন্দর আগামী তৈরি করবেন। ব্যবস্থাপনায় সুদূঢ়প্রসারি নীতিনির্ধারণের ভূমিকা রাখবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারকেও নির্বাাচনের পূর্বশর্ত হিসেবে অবাধ উন্মুক্ত ভয়ভীতিহীন উৎসবমুখর পরিবেশ রক্ষার ব্যাপারে আরও সর্তক ও তৎপর হতে হবে। আইনরশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ রাখার দায়িত্ব মূলত সরকারের। দিন যত যাচ্ছে পরিস্থিতি আক্রমণাত্মক ও অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকাই সে ক্ষেত্রে হয়ে উঠতে পারে সুষ্ঠু, অবাধ, উৎসবমূখর নির্বাচনের পূর্বশর্ত। শূন্য সহনশীলতা না হোক নির্বাচন যাতে কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায় সে দিকে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। নির্বাচনকালীন নাগরিক সুবিধার বিষয়গুলো নিয়েও যেন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশ সৃষ্টি না হয় সে দিকে নজর রাখা প্রয়োজন।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট, সম্পাদকশিল্পশৈলী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনিসফে শাবান: ক্ষমা, আত্মশুদ্ধি ও নবজাগরণের পবিত্র রজনী
পরবর্তী নিবন্ধশবে বরাত : একটি অন্যতম মুক্তির রজনী