নির্বাচনী ইশতেহারে নারী ও শিশুর অধিকার

২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এক অপরিহার্য অগ্রাধিকার

উম্মে সালমা | শনিবার , ৩ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৬:০৬ পূর্বাহ্ণ

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তা, উন্নয়ন দর্শন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের দিকনির্দেশ নির্ধারণের সুযোগ। এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহারে নারী ও শিশুর অধিকারকে অগ্রাধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান সময়োপযোগী ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

সমপ্রতি এক উচ্চপর্যায়ের সংলাপে সাতটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা একযোগে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে নারী ও শিশু অধিকারভিত্তিক একটি ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করেছে। এই উদ্যোগ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে উন্নয়নের পরিমাপক কেবল অবকাঠামো, প্রবৃদ্ধি বা পরিসংখ্যান নয় বরং একটি রাষ্ট্র কতটা সফলভাবে তার নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, কল্যাণ ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পারে, সেটিই প্রকৃত উন্নয়নের মানদণ্ড।

বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষা, মা ও শিশু স্বাস্থ্য, দারিদ্র্যতা হ্রাস এবং নারীর অংশগ্রহণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে এই অর্জনগুলো এখনো টেকসই হয়নি। বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, বাল্যবিবাহ, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম, অপুষ্টি, ডিজিটাল হয়রানি এবং জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতিএই চ্যালেঞ্জগুলো আজও নারী ও শিশুর জীবনকে অনিশ্চিত করে তুলছে। এসব সমস্যার মূলে রয়েছে দুর্বল রাজনৈতিক অঙ্গীকার, জবাবদিহিতার অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ঘাটতি।

নির্বাচনি ইশতেহার একটি দলের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির লিখিত দলিল। এটি কেবল ভোটার আকর্ষণের কৌশল নয়; বরং সরকার গঠনের পর রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক ও নীতিগত ভিত্তি। ফলে নারী ও শিশুর অধিকার যদি ইশতেহারে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত না হয়, তবে বাস্তব নীতিমালায় তার প্রতিফলন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তাই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, বিচারব্যবস্থা, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং জলবায়ু অভিযোজনসব ক্ষেত্রেই নারী ও শিশুবান্ধব সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা ইশতেহারে থাকা জরুরি।

বিশেষ করে, লিঙ্গ সমতাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করা, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া রোধে সামাজিক সহায়তা জোরদার করা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইন প্রয়োগ ও সামাজিক আন্দোলন জোরদার করা এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলা রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে থাকা উচিত। একই সঙ্গে ডিজিটাল পরিসরে শিশু ও নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বাস্তুচ্যুত নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

২০২৬ সালের নির্বাচন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি সুযোগনারী ও শিশুর অধিকারকে আর প্রান্তিক ইস্যু হিসেবে না দেখে জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে স্থাপন করার। এই অগ্রাধিকার কেবল নৈতিক দায় নয়; এটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত। কারণ সুস্থ, শিক্ষিত ও নিরাপদ নারী ও শিশু ছাড়া কোনো রাষ্ট্রই টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে পারে না।

সবশেষে বলা যায়, নারী ও শিশুর অধিকারকে নির্বাচনী ইশতেহারে অগ্রাধিকার দেওয়া মানে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের ভিত্তিকে মজবুত করা। রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও নাগরিকদের সম্মিলিত চাপ ও সচেতনতার মাধ্যমে এই অঙ্গীকার বাস্তবে রূপ নিতে পারে। নারী ও শিশুর কল্যাণ, নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়ন কখনোই রাজনৈতিক আলোচনার প্রান্তে থাকার বিষয় নয় এটি হওয়া উচিত রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপঁচিশের আলো-আঁধারিতে নারীদের অবস্থান ও অধিকার
পরবর্তী নিবন্ধনিষ্পাপ সমন্বিত স্কুলে বই বিতরণ