জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস পালিত হলো গত ২রা ফেব্রুয়ারি। নিরাপদ খাবার যেন সোনার হরিণ। দিনদিন ভেজাল ও অনিরাপদ খাবারের মাত্রা বেড়েই চলেছে। এ বাস্তবতায় শুধু অসুস্থতা বাড়াচ্ছে না; জনগণের চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং সামাজিক ক্ষতির চাপও বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে সবশেষ ২০২২–২৩ অর্থবছরের তথ্য পাওয়া যায়। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২–২৩ অর্থবছরে ১০৭০টি খাদ্য নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। নিজস্ব ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে ওই অর্থবছরে ১৬৫টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে ১৩৬ জনকে দায়ী করে ১৩৬টি মামলা দায়ের ও ১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়া ১১ হাজার ৭৫৪টি খাদ্য স্থাপনা (হোটেল, রেস্তোরাঁ, কাঁচাবাজার, শিল্প, পাইকারি বাজার) পরিদর্শন করেছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ আইনবিধি প্রণয়ন, নজরদারি, খাদ্য ব্যবস্থা মনিটরিং, খাদ্য নমুনা পরীক্ষা করা, প্রশিক্ষণ, খাদ্যের মান নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য ঝুঁকি নির্ণয় ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার মতো নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সংস্থাটির প্রধান দায়িত্ব ও কার্যাবলি সম্পর্কে আইনে বলা হয়েছে, বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতির যথাযথ অনুশীলনের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিতকরণে খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, সরবরাহ ও বিক্রয়সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ, পরিবীক্ষণ এবং নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার কার্যাবলির সমন্বয় সাধন করা। সংস্থাটি বাজার, রেস্তোরাঁ, খাদ্য কারখানা ইত্যাদি পরিদর্শন করে থাকে। খাদ্য কীভাবে উৎপাদিত হয়, এর স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি, পুষ্টিমান ঠিক আছে কিনা–এসব দেখা হয়। এর মাধ্যমে কারখানাগুলোতে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও পরিবেশনে উৎসাহিত করে থাকে। নিয়ম না মানলে সতর্ক করা হয়। এর পরও না শুধরালে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। যদিও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করার মতো পর্যাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটও নেই সংস্থাটির।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, সাধারণত নিরাপদ খাদ্যের ঝুঁকি দুই ধরনের : ক. জীবাণু সংক্রান্ত দূষণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ কারণে দূষিত খাদ্য মানবদেহে বিভিন্ন বিরূপ উপসর্গের সৃষ্টি করে। খ. রাসায়নিক দ্রব্যাদি দ্বারা দূষণ। এর মধ্যে রয়েছে পরিবেশ দূষণ সংক্রান্ত দ্রব্যাদি, পশুর ওষুধের অবশিষ্টাংশ, ভারি ধাতু অথবা অন্যান্য অবশিষ্টাংশ, যা কারও অগোচরে খাদ্যে অনুপ্রবেশ করে। শিল্পোন্নত দেশে খাদ্যবাহিত রোগের সংখ্যা প্রতিবছর শতকরা ৩০ ভাগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনুন্নত দেশসমূহে এ সংক্রান্ত তথ্যপ্রাপ্তির দুর্বলতা থাকে। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, এসব দেশেই দূষিত খাদ্যজনিত রোগের প্রকোপ ও ব্যাপকতা তুলনামূলক বেশি। অনিরাপদ খাদ্য শুধু স্বাস্থ্যের ঝুঁকিরই কারণ নয়, দেহে রোগের বাসা বাঁধারও অন্যতম কারণ। ডায়রিয়া থেকে শুরু করে ক্যান্সার– এমন দুই শতাধিক রোগের জন্য দায়ী অনিরাপদ খাদ্য। দেশে উৎপাদিত এবং বিদেশ থেকে আমদানি করা বিভিন্ন খাদ্যে জীবাণু ও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান ঠেকানোর জন্য বিভিন্ন সময় উদ্যোগ নেয়া হলেও তা পর্যাপ্ত নয়।
তাঁরা বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের জন্য খাদ্য শৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত সবার প্রত্যক্ষ ও সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি। অর্থাৎ খাদ্য শৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত যে কেউ খাদ্যকে অনিরাপদ করতে পারেন। অনিরাপদ খাদ্য সবসময়ই শরীরের সুস্থতার জন্য হুমকিস্বরূপ। নিরাপদ খাবারের ব্যাপারে সচেতনতার বিকল্প নেই। আর এই সচেতনতা শুরু করতে হবে নিজ–নিজ ঘর থেকে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে মাত্রই আমরা কার্যক্রম শুরু করেছি, কিন্তু আমাদের যেতে হবে অনেক দূর।
দেশে যদিও খাদ্যের কোনো ঘাটতি নেই। তবে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। শুধু আইন, বিধি প্রয়োগ করে জনগণের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা যাবে না। এ জন্য ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে, সচেতন হতে হবে।
জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ জরুরি। নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য যেমন শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, উল্টো দিকে অনিরাপদ খাদ্য হৃদরোগ, ক্যান্সার, কিডনি রোগ, বিকলাঙ্গ–সহ অনেক রোগের কারণ হয়। দুঃখজনক হলেও সত্যি, এসব রোগ বাংলাদেশে মহামারীর আকার নিয়েছে। বলতে গেলে ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে এসব ঘাতক ব্যাধি। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সব শক্তি নিয়ে সরকারকে মাঠে নামতে হবে। তা না হলে খাদ্যে ভেজাল বন্ধ করা সম্ভব না।








