নিঃসঙ্গ এবং নির্জনতার শিল্পী জীবনানন্দ দাশ

অরূপ পালিত | শুক্রবার , ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৭:৩০ পূর্বাহ্ণ

সহজ লোকের মতো কে চলিতে পারে।

কে থামিতে পারে এই আলোয় আঁধারে

সহজ লোকের মতো; তাদের মতন ভাষা কথা

কে বলিতে পারে আর; কোনো নিশ্চয়তা

কে জানিতে পারে আর ?…/বোধ

বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক অনুপম নাম জীবনানন্দ দাশ। নিসর্গের নিঃশব্দতা, সময়ের অনিশ্চয়তা, প্রেমের অতল টানাপড়েন এবং জীবনের অন্তরতম বোধকে এক অনন্য প্রতীকী ভাষায় তিনি যেভাবে উপস্থাপন করেছেন তা বাংলা সাহিত্যকে এনে দিয়েছে এক নতুন মাত্রা। তিনি নিছক কবি নন, এক নির্জনতার শিল্পী এবং অন্তর্জগতের নির্মাতা।

একান্তমনা,অন্তর্মুখী ও আত্মমগ্ন কবি জীবনানন্দ দাশ জন্মগ্রহণ করেন ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশালে। ইংরেজি, বাংলা ও রসায়নের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করলেও তাঁর আকর্ষণের কেন্দ্রে ছিল সাহিত্য।

তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে বিভিন্ন কলেজে অধ্যাপনা করেছেন।

তাঁর পঠনপাঠনে ছিল পাশ্চাত্য কাব্যচেতনার প্রভাব, কিন্তু অন্তরাত্মা ছিল নিবিড়ভাবে বাংলার রূপ, গন্ধ ও নিঃসঙ্গতার প্রতি আকৃষ্ট। এই দুই জগতের সংমিশ্রণেই গড়ে ওঠে জীবনানন্দের অনন্য আধুনিক কাব্যভুবন।

মাত্র ষোলো বছর বয়সে জীবনানন্দ দাশ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে প্রথম কবিতা পাঠান। রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রতিভা স্বীকার করলেও ভাষার জটিলতা নিয়ে করেছিলেন সমালোচনা

তোমার কবিত্বশক্তি আছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

কিন্তু ভাষা প্রকৃতি নিয়ে এত জবরদস্তি কর কেন বুঝতে পারিনে”

এই মন্তব্য জীবনানন্দের পথচলায় ছন্দপতন আনেনি। বরং তিনি নিজের পথেই নির্মাণ করেন এক ভিন্নতর কাব্যভাষা যেখানে নেই অতিরঞ্জিত অলংকার, বরং আছে নিসর্গ, নিঃসঙ্গতা, সময় ও মৃত্যুচেতনার সংবেদনশীল উপস্থাপন।

১৯৩০এর দশকে যখন বাংলা কবিতায় ইউরোপীয় আধুনিকতাবাদের ছোঁয়া লাগে, জীবনানন্দ তখন কেবল নিজের অন্তর্জগৎ, স্মৃতি ও কল্পনার বিস্তারেই গড়ে তোলেন এক স্বতন্ত্র কাব্যভাষা।

কবিতা’ ও ‘পূর্বাশা’ পত্রিকার মাধ্যমে তাঁর কবিতা পৌঁছে যায় পাঠকের মনে। বিমূর্ততা, প্রতীক, চিত্রকল্পের সৌন্দর্য আর গদ্যকবিতার ছন্দমুক্ত আঙ্গিকে তিনি বাংলা কবিতাকে দেন এক মৌলিক দিশা।

প্রকৃতি ও নৈঃসঙ্গ্যের কবি জীবনানন্দের কবিতায় প্রকৃতি কোনো পটভূমি নয়, গ্রামবংলার ঐতিহ্যবাহী নিসর্গ ও প্রকৃতির এক জীবন্ত সত্তা এবং এক নীরব চরিত্র। নদী, শালিক, সন্ধ্যা, ধানক্ষেত, পতঙ্গসবই যেন তাঁর কবিতায় হয়ে ওঠে এক আত্মীয়স্বরূপ।

আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরেএই বাংলায়

হয়তো মানুষ নয়হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে;

হয়তো ভোরের কাক হ’য়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে

কুয়াশার বুক ভেসে একদিন আসিব এ কাঁঠালছায়ায়;…/আবার আসিব ফিরে।

এই আত্মীয়তার মধ্য দিয়েই কবি প্রবেশ করেন অস্তিত্বের গভীরে, যেখানে সময় কুয়াশার মতো অনিশ্চিত, আর স্মৃতি হয়ে ওঠে জীবনের অন্তরালের ছায়া।

জীবনানন্দ দাশের কাব্যভুবনের এক অনবদ্য সৃষ্টি “বনলতা সেন” তাঁর এই কবিতায় প্রেম যেমন রোমান্টিক, তেমনি মায়াময় ও বিমূর্ত। বনলতা একজন নারী, আবার নয়। তিনি সময়, স্মৃতি ও চিরন্তন এক মায়ার প্রতীক।

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে

সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে…”/বনলতা সেন

এটি নিছক একটি প্রেমের কবিতা নয়এ এক ক্লান্ত অভিযাত্রীর স্বস্তির মুহূর্ত। সমাজ, ইতিহাস, নগর, সময়ের ঘূর্ণিপাকে ক্লান্ত কবি অবশেষে খুঁজে পান এক শান্ত আশ্রয় বনলতা সেনের মুখ।

সব পাখি ঘরে আসেসব নদীফুরায় এ জীবনের

সব লেনদেন;

থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।”

বনলতা শুধু নারী নন। তিনি এক মায়া, যার থেকে ফেরার উপায় নেই।

আমার নিজস্ব উপলব্ধি থেকে বলছি, প্রেমে পড়লে ফেরা যায়, কিন্তু মায়ায় পড়লে মানুষ আজীবন তার সঙ্গী হয়ে যায়।

আমার কাছে মনে হয়েছে কবি বনলতার মায়ায় পড়েছিলেন। তাঁর অস্তিত্ব জুড়ে রয়েছে বনলতার জন্য মায়া। বনলতার মুখটি যেন কোনো দূর অতীতের ধূলিমলিন স্মৃতির আকাশে হঠাৎ জ্বলে ওঠা একটি শান্ত তারা। তার মুখে নেই অস্থিরতার কোন ছায়া, নেই জাঁকজমকের কৃত্রিমতা। আছে এক অনির্বচনীয় কোমলতা, এক অব্যক্ত আকর্ষণযা চোখে নয়, হৃদয়ে ধরা দেয়। বনলতার লাবণ্যময় মুখশ্রীতে এমন এক নিস্পাপ প্রশান্তি, যেন সে কোনও সংসারের নয়, বরং কোনো শাশ্বত কাব্যের নায়িকা, যার দৃষ্টি একবার পড়লে আত্মাও কেঁপে ওঠে। চোখে রয়েছে এক ধূসর স্বপ্নের জগৎ, যেন কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া কোনো প্রেয়সীর মৃদু আর্তি। তার ঠোঁটের কোণে জমে থাকা সেই মৃদু হাসিটিএ যেন জীবনের শত যন্ত্রণার পরেও রয়ে যাওয়া কোমল মমতার এক চিহ্ন।

গভীর অন্ধকারের ঘুম থেকে নদীর চ্ছল চ্ছল শব্দে

জেগে উঠলাম আবার;

তাকিয়ে দেখলাম পান্ডুর চাঁদ বৈতরণীর থেকে তার অর্ধেক ছায়া

গুটিয়ে নিয়েছে যেন কীর্তিনাশার দিকে।…/অন্ধকার।

জীবনানন্দ দাশের এই ‘অন্ধকার’ কবিতাটি কেবল একটি মৃত্যুবিলাসী কবিতা নয়। এটি এক আত্মদর্শনের মহাকাব্যিক প্রকাশ। কবিতায় অন্ধকার কেবল রাত নয় এ জীবনের আত্মশূন্যতা, আধুনিক সমাজের অন্তঃস্থ ক্লান্তি। চারপাশের প্রগতি, সভ্যতা সবই যেন কবির কাছে এক ভ্রান্ত আলোকচ্ছটা। কবি অন্ধকারে মৃত্যুর শান্তি খুঁজেছেন, যেখানে পৃথিবীর অসীম যন্ত্রণা এবং সংঘর্ষ থেকে মুক্তি পাবেন। এই কবিতায় জীবনের প্রতি যেমন বিতৃষ্ণা আছে, তেমনি আছে এক ধরনের নৈঃশব্দ্যপ্রীতি।

মানুষের মৃত্যু হ’লে তবুও মানব থেকে যায়;

অতীতের থেকে উঠে আজকের মানুষের কাছে

প্রথমত চেতনার পরিমাপ নিতে আসে।…/মানুষের মৃত্যু হ’লে।

মানুষের দেহগত মৃত্যু ঘটলেও তার চেতনা, আদর্শ ও অনুভব সমাজে থেকে যায়। অতীতের কিছু স্মৃতি জ্ঞান বর্তমান মানুষের মাঝে জীবন্ত হয়ে উঠে। মৃত্যুতে কোন কিছু শেষ হয় না। বরং মানবিক চেতনাকে ভবিষ্যতের আশায় জ্বালিয়ে রাখে।

নিঃশব্দ জীবনানন্দ দাশ কখনো সরব ছিলেন না, কিন্তু তাঁর কবিতা যেন এক নীরব চিৎকার। সমাজের যান্ত্রিকতা, মানুষের ক্লান্তি ও অন্তর্জগতের শূন্যতার বিরুদ্ধে এক নিঃশব্দ প্রতিবাদ।

তিনি ছিলেন না আন্দোলনের কবি, ছিলেন না উচ্চকণ্ঠ ঘোষণার মুখপাত্র। কিন্তু তাঁর কবিতার প্রতিটি পঙ্‌ক্তি,একটি সমাজমনস্ক আত্মার আত্মজিজ্ঞাসা। প্রকৃতি, প্রেম, সময়, মৃত্যু, মায়াএসবের অন্তরাল থেকেই তিনি নির্মাণ করেছেন এক অনুপম কবিতাজগৎ।

জীবনানন্দ দাশ আধুনিক বাংলা কবিতার সেই অনন্য কবি, যিনি নিঃসঙ্গতাকে রূপ দিয়েছেন সৌন্দর্যে। স্মৃতিকে রূপ দিয়েছেন কাব্যে, এবং মায়াকে রূপ দিয়েছেন এক চিরন্তন প্রার্থনায়।

তিনি শুধু একজন কবি ননএক অনুভব, এক সময়বিহীন আলো।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপাহাড়ি-বাঙালির স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট
পরবর্তী নিবন্ধসৈয়দ মুজতবা আলী বাংলাসাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র