বিংশ শতাব্দীতে নারীর উন্নয়নকে মূলত মানবাধিকার বা সামাজিক ন্যায়বিচারের মাপকাঠিতে দেখা হতো। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক ও জাতীয় বাস্তবতায় এটি এখন কেবল একটি সামাজিক এজেন্ডা নয়,বরং একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক কৌশল। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী, সেখানে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা বা সীমিত রাখা একটি বড় ধরনের ‘অর্থনৈতিক অপচয়’।
বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণকে টেকসই প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। নারীর উন্নয়নকে এখন আর কেবল আবেগনির্ভর সামাজিক প্রতিশ্রুতি বা সহানুভূতির নীতিতে দেখার মোটেই সুযোগ নেই, এটি একটি নিরেট অর্থনৈতিক বাস্তবতা। বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ–এর একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, শ্রমবাজারে নারী ও পুরুষের অংশগ্রহণ সমান করা গেলে বৈশ্বিক জিডিপি প্রায় ২৮ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে পোশাক শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ আমাদের অর্থনীতিকে যে শক্ত ভিত্তি দিয়েছে, তা আজ প্রমাণিত। তবে অর্থনীতির উচ্চতর ধাপে পৌঁছাতে হলে এই অংশগ্রহণকে কেবল নিম্ন–মজুরি খাতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন মানেই উচ্চতর ক্রয়ক্ষমতা, যা অভ্যন্তরীণ বাজারকে শক্তিশালী করে এবং জাতীয় রাজস্ব বৃদ্ধিতে সরাসরি অবদান রাখে।
বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও আইএলও–এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ পুরুষের সমপর্যায়ে আনতে পারলে দেশের জিডিপি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায় এবং দারিদ্র্য বিমোচন ত্বরান্বিত হয়। অথচ বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী হওয়া সত্ত্বেও তাদের একটি বড় অংশ এখনো অপ্রাতিষ্ঠানিক ও স্বল্প মজুরির খাতে সীমাবদ্ধ। এই ‘লুকানো ক্ষতি’ কাটিয়ে উঠতে না পারলে রাষ্ট্র তার মানবসম্পদের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারবে না।
গার্মেন্টস শিল্প, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা SME খাতে নারীরা দেশের রপ্তানি আয় ও খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। তবে এই অবদান কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বিস্তৃত হচ্ছে না মূলত ঋণ প্রাপ্তিতে জটিলতা, প্রযুক্তির অভাব এবং বাজার সংযোগের সীমাবদ্ধতার কারণে।
এছাড়া সমান কাজের জন্য অসম মজুরি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাব, যাতায়াত সুবিধার সংকট এবং ডে–কেয়ার ব্যবস্থার অনুপস্থিতি নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণকে কাঠামোগতভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে নারীদের ডিজিটাল দক্ষতা নিশ্চিত করতে না পারলে জাতীয় প্রবৃদ্ধি একপাক্ষিক ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব করপোরেট বোর্ড বা সরকারি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে, সেখানে বিনিয়োগের সিদ্ধান্তগুলো বেশি বাস্তবসম্মত ও ঝুঁকি–সহনশীল হয়। নারীরা সাধারণত শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয়ের পক্ষপাতী, যা একটি দেশের ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল’ বা মানবপুঁজি গঠনে সরাসরি ভূমিকা রাখে। নারীর নেতৃত্ব মানেই অধিকতর স্বচ্ছতা ও মানবিক উন্নয়ন দর্শনের প্রতিফলন।
নারীর ক্ষমতায়ন কেবল একটি নৈতিক দায় নয় বরং এটি একটি কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কৌশল। কারণ বৈচিত্র্যপূর্ণ নেতৃত্ব থেকে আসা সিদ্ধান্তগুলো অধিক বাস্তবসম্মত ও মানবিক হয়, যা সরাসরি অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।
ভবিষ্যৎ রোডম্যাপ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, মানে কেবল কিছু সুযোগ–সুবিধা প্রদান নয়, বরং এটি ভোক্তা বাজার সমপ্রসারণ এবং সামাজিক ব্যয় কমানোর একটি পরীক্ষিত কৌশল। রাষ্ট্রকে শিক্ষা বাজেটে লিঙ্গভিত্তিক সমতা, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ নিশ্চিত করতে হবে।
উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে একে বিশেষ কোনো দিবস বা প্রকল্পের ফ্রেমে আটকে না রেখে জাতীয় অর্থনৈতিক নীতির মূল ধারায় সম্পৃক্ত করা জরুরি। বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তারা প্রতিকূল পরিবেশেও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন। কিন্তু ব্যাংকিং সেক্টরে ঋণ প্রাপ্তির জটিলতা এবং প্রথাগত জামানত ব্যবস্থার কারণে তারা বড় পুঁজিতে প্রবেশ করতে পারছেন না। যদি প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সরাসরি সংযোগ নিশ্চিত করা যায়, তবে এই নারী উদ্যোক্তারাই হতে পারেন বাংলাদেশের অর্থনীতির আগামীর ‘গেম চেঞ্জার’।
নারীর উন্নয়নকে এখন আর দয়া বা সহানুভূতির চশমায় দেখার কোন অবকাশ নেই। নারীর উন্নয়ন মানে একটি পরিবারের উন্নয়ন, একটি প্রজন্মের দারিদ্র্যমুক্তি এবং শেষ পর্যন্ত একটি শক্তিশালী সার্বভৌম অর্থনীতির নিশ্চয়তা। যে রাষ্ট্র তার জনসংখ্যার অর্ধেককে পেছনে ফেলে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখে, সেই উন্নয়ন কখনোই টেকসই হতে পারে না।
সময়ের দাবি হলো, জাতীয় বাজেট থেকে শুরু করে করপোরেট পলিসি পর্যন্ত সবখানে নারীর উন্নয়নকে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা। নারীর হাতে অর্থনৈতিক ক্ষমতা তুলে দেওয়ার অর্থ হলো একটি সমৃদ্ধ ও ভবিষ্যৎ–নিরাপদ রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করা।
নারীকে পেছনে রেখে যে উন্নয়ন, তা বাহ্যিক আড়ম্বরে বড় মনে হলেও অভ্যন্তরীণভাবে ভঙ্গুর। তাই নারীর উন্নয়নকে সহানুভূতির ভাষা থেকে বের করে অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের ভাষায় অনুবাদ করাই সময়ের অনিবার্য দাবি। নারীর শ্রম ও নেতৃত্বকে পূর্ণ স্বীকৃতি দিলেই জাতীয় অর্থনীতি কেবল সংখ্যায় নয়, গুণগত ও টেকসইভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠবে। কারণ নারীর অগ্রগতি থেমে থাকা মানেই দেশের সামগ্রিক অগ্রগতির পথে অন্তরায়।












